বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৮ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

কানাডায় বেগমপাড়া যুক্তরাষ্ট্রে সাহেব নগর : বাংলাদেশের অর্থে বিদেশে বিলাসী জীবন

বাংলাদেশ ডেস্ক :   |   শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০

কানাডায় বেগমপাড়া যুক্তরাষ্ট্রে সাহেব নগর : বাংলাদেশের অর্থে বিদেশে বিলাসী জীবন

বাংলাদেশের এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ আমলা, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী অবাধে লুণ্ঠন করছে দেশের অর্থ। চিহ্নিত এই সিন্ডিকেট গত এক দশকে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে বিভিন্ন সংস্থার খবরে বের হয়ে এসেছে। দেশের দরিদ্র মানুষের অর্থে তারা বিদেশে যাপন করছে বিলাসী জীবন। অর্থ পাচারকারী এসব প্রতারকের অনেকে দেশে ব্যবসা বাণিজ্য ও রাজনীতি করলেও তাদের পরিবার পাঠিয়ে দিয়েছে বিদেশে। সেখানে তারা আলিশান বাড়িতে বাস করছে। হাকাচ্ছে নামী দামী মডেলের গাড়ি।

বিদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে তাদের সন্তানরা। বাংলাদেশের এসব অর্থপাচারকারীরা কানাডায় বেগমপাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে সাহেব নগর গড়ে তুলেছে। প্রতিষ্ঠা করেছে বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্য। শুধু এ দুটি দেশ নয়- যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই, হংকং, সৌদি আরব, ভারত, অষ্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এরা একই কায়দায় অবৈধ অর্থ লগ্নি করেছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্র ড. আবদুল মোমেন দেশের অর্থ পাচারের জন্য আমলাদেরকে দায়ী করেছেন।

দেশ থেকে প্রকাশ্যে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে। অথচ পাচারকারীদের কোন শাস্তি হচ্ছে না। ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না পাচারকৃত অর্থ। পাচারকারীদের অনেকে একবারে দেশ ছেড়েছে। যখন তারা দেশে থাকে তখন তাদেরকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করার নজীর খুব কম। কিন্তু দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর সবার টনক নড়ে। ইন্টারপোল জারি করে রেড এলার্ট। পাচারকারীদের অভয়ারন্য বলে খ্যাত কানাডায় বেগমপাড়া গড়ে উঠার পর সেখানকার প্রবাসী বাংলাদেশীরা প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠেছেন। নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের এসব দুর্বৃত্ত আস্তানা গেড়েছে। অঢেল অর্থ বিনিয়োগ করছে নানা ব্যবসায়। নগদ অর্থে কিনছে বাড়ি ও তৈরি করছে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। সম্প্রতি নিউইয়র্কেও এসব অর্থ পাচারকারীদের তালাশে নেমেছেন দেশপ্রেমিক প্রবাসী বাংলাদেশীরা। এমতাবস্থায় অনেকে গা ঢাকা দিয়ে চলছে। অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে প্রবাসীরা আন্দোলনে নামবে বলে জানা গেছে।

কানাডায় বাংলাদেশের অর্থপাচারকারী বিত্তশালীদের ‘বেগমপাড়া’ আসলে কোথায়?
ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শীতে জমে যাওয়া কানাডার টরন্টোর রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে একদল বাংলাদেশি। অনেকে এসেছেন বহুদূর থেকে কয়েক ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে। তাদের প্রতিবাদ বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পালিয়ে আসা কথিত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে, যারা নাকি সেখানে পাচার করা বিপুল সম্পদ দিয়ে আয়েশি জীবন-যাপন করছেন। হঠাৎ করে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ কেবল কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নয়, শোরগোল তুলেছে বাংলাদেশেও। টরন্টোতে বাংলাদেশি ‘বেগমপাড়া’ নিয়ে গত কয়েকবছর ধরেই অনেক কথাবার্তা চলছে। বলা হয় বাংলাদেশে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া বহু ব্যবসায়ী-আমলা-রাজনীতিক তাদের স্ত্রী-সন্তানদের পাঠিয়ে দিয়েছেন কানাডায়। তাদের নিয়েই গড়ে উঠেছে এই ‘বেগমপাড়া’। কিন্তু আসলেই কি টরন্টো বা কানাডার অন্য কোন জায়গায় এরকম কোন ‘বেগমপাড়া’ আছে?
বেগমপুরা থেকে বেগমপাড়া : টরন্টোর পাশে লেক অন্টারিওর তীরে আরেকটি শহর মিসিসাগা। শহরের একটি বড় কন্ডোমিনিয়াম হঠাৎ করেই কানাডার গণমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয় বছর দশেক আগে। সেই কন্ডোমিনিয়ামে মূলত থাকেন দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা বহু অভিবাসী পরিবার। এসব পরিবারের স্বামীরা কাজ করেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। স্বামীদের অনুপস্থিতিতে স্ত্রীদের নিঃসঙ্গ জীবন এবং কঠিন জীবন সংগ্রাম নিয়ে এক ভারতীয় পরিচালক রশ্মি লাম্বা তৈরি করলেন একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম। নাম ‘বেগমপুরা।’ ‘বেগমপুরা’ ছবি নিয়ে আলোচনা শুরু হলো কানাডার গণমাধ্যমে। আর এই ছবির সূত্র ধরে সেখানকার পত্র-পত্রিকাতেও প্রকাশিত হতে থাকলো অনেক ধরনের প্রতিবেদন। টরন্টো স্টারে ২০১১ সালে প্রকাশিত এরকম একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘কলোনি অব ওয়াইভস থ্রাইভস ইন মিসিসাগা।’

বেগমপুরার আসল কাহিনি এরকম : মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে উচ্চ বেতনে কাজ করেন ভারত বা পাকিস্তানের যেসব মানুষ, যাদের বেশিরভাগই মূলতঃ প্রকৌশলী, তারা জীবনের একটা সময় সপরিবারে কানাডায় চলে আসেন অভিবাসী হয়ে। কিন্তু এরা কানাডায় তাদের পেশাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ খুঁজে না পেয়ে আবার ফিরে যান মধ্যপ্রাচ্যেই, তবে পরিবার রেখে যান কানাডায়। মধ্যপ্রাচ্যে তারা ভালোই আয় করেন। সেই অর্থ তারা কানাডায় স্ত্রীদের কাছে পাঠান পরিবারের ভরণপোষণের জন্য। মিসিসাগার কয়েকটি কন্ডোমিনিয়াম, যেখানে থাকতেন এরকম বহু পরিবার, সেগুলো পরিচিত হয়ে উঠে বেগমপুরা নামে। যেখানে স্বামীর অনুপস্থিতিতে বেগম বা স্ত্রীরাই পরিবারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন একা হাতে। কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক শওগাত আলী সাগর জানান, এই বেগমপুরার কাহিনি থেকেই মূলতঃ প্রথম বাংলাদেশি ‘বেগমপাড়া’র কথা চালু হয়।
শওগাত আলী সাগরই প্রথম ‘বেগমপাড়া’ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন টরন্টো স্টারে প্রকাশিত বেগমপুরার কাহিনি তার এক লেখায় বর্ণনা করতে গিয়ে। এরপর বাংলাদেশের অনেকেই এই ‘বেগমপাড়া’ কথাটি ব্যবহার করেছেন বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী-আমলা-রাজনীতিকদের কানাডায় পাড়ি জমিয়ে সেখানে দ্বিতীয় নিবাস স্থাপনের প্রতি ইঙ্গিত করে। শওগাত আলি সাগর বলেন, “বেগমপুরার যে বেগমরা, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কথিত বেগমপাড়ার বেগমদের অনেক তফাৎ। বেগমপুরার বেগমদের স্বামীরা পেশাজীবী, মধ্যপ্রাচ্যে কঠোর পরিশ্রম করে সেই অর্থ কানাডায় পাঠাচ্ছেন তাদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য। অন্যদিকে আমরা যে বেগমপল্লীর কথা বলি, সেটি কিন্তু একেবারেই ভিন্ন অর্থে, যেখানে দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ কানাডায় পাচার করে সেখানে আয়েশি জীবনযাপন করছে তারা সপরিবারে।”

বেগমপাড়া আসলে কোথায় : টরন্টোতে বা কানাডায় সেই অর্থে কী কোন সুনির্দিষ্ট এলাকা আছে, যেটিকে বেগমপাড়া বলা হয়? সাংবাদিক শওগাত আলী সাগর বলছেন, এই বেগমপাড়া আসলে কানাডায় পাড়ি জমানো দুর্নীতিগ্রস্তদের স্ত্রীদের দ্বিতীয় নিবাস অর্থে ব্যবহৃত হয়। বাস্তবে এমন কোন সুনির্দিষ্ট এলাকা নেই, যেটিকে ‘বেগমপাড়া’ বলা হয়। এ নিয়ে কথা হয় টরন্টোর কয়েকজন বাংলাদেশি, রিয়েল এস্টেট এজেন্ট এবং আইনজীবীর সঙ্গে। সাজ্জাদ আলি টরন্টোতে একজন রিয়েলটর (রিয়েল এস্টেট এজেন্ট) হিসেবে কাজ করছেন কয়েক বছর ধরে। তার মতে, এরকম বেগমপাড়া নামে হয়তো কোন এলাকা নেই, কিন্তু এমন জায়গা বাস্তবে রয়েছে, যেখানে এধরণের বহু বাংলাদেশি গিয়ে বসতি গেড়েছেন। “বেগমপাড়া যে শুধু কথার কথা, লোকমুখে শোনা ব্যাপার, তা নয়। আমরা দেখি এখানে বাংলাদেশিরা অনেক সংখ্যায়, এমন সব জায়গায় বাড়িঘর কিনেছেন, যেটা একটু অভিজাত এলাকা। কিন্তু তাদের জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে তাদের এই সম্পদ সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তারা এখানে তেমন কিছু করেন বলে তো আমরা দেখি না। কীভাবে তারা এক বা দুই মিলিয়ন ডলারের একটি বাড়ি কেনার ক্ষমতা রাখেন!”
কানাডার সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশিদের ধারণা, কানাডায় অর্জিত সম্পদ দিয়ে তারা এসব বাড়ি কেনেননি, এই অর্থ এসেছে বাংলাদেশ থেকে।

এরকম বাংলাদেশির সংখ্যা কতো : পুরো কানাডায় প্রায় আশি হাজার বাংলাদেশি আছেন বলে ধারণা করা হয়। এদের বেশিরভাগ থাকেন টরন্টো বা তার আশেপাশে। গত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে বহু উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী কানাডায় গেছেন অভিবাসী হয়ে। “২০০৮ হতে ২০১৪ সময়কালে বেশি গেছে ব্যবসায়ীরা। তখন ইনভেস্টমেন্ট ক্যাটাগরিতে একটি ভিসা দেয়া হতো, তখন কানাডায় একটি নির্দিষ্ট অংক বিনিয়োগ করে বা কানাডার সরকারের কাছে অর্থ জমা রেখে ইমিগ্রেশনের সুযোগ ছিল”, বলছেন সাংবাদিক শওগাত আলী সাগর।
কিন্তু ২০১৪ সালে কানাডার সরকার এটি বন্ধ করে দেয়। এর অন্যতম কারণ নাকি ছিল এই ক্যাটাগরিতে আসা অভিবাসীদের কর পরিশোধের রেকর্ড। “দেখা গেল কানাডার একেবারে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যে পরিমাণ কর দেয়, এদের দেয়া করের পরিমাণ তার চেয়েও কম। বা তারা একেবারেই কর দেয় না। তখন সরকার এই স্কিম বন্ধ করে দেয়”, জানালেন শওগাত আলী সাগর।

ব্যাপকহারে এ ধরনের লোকজনের কানাডায় অভিবাসন প্রথম শুরু হয় ২০০৭-২০০৮ সালে যখন বাংলাদেশে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। “তখন বাংলাদেশ থেকে অনেক ব্যবসায়ীর একটি দল কানাডায় যায়। টরন্টোর বেলভিউ এলাকায় কিছু হাই রাইজ কন্ডোমিনিয়াম আছে। বেশ বিলাসবহুল। ডাউনটাউন থেকে বেশি দূরে নয়। প্রথম যে ব্যবসায়ীরা এসেছিলেন, তারা ওখানে উঠেছিলেন। তারপরে ঝাঁক ধরে যারা এসেছেন, তারাও ওখানেই গিয়েছেন”- বলছিলেন বহু বছর ধরে টরন্টোতে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি।
“টরন্টোর একেবারে প্রাণকেন্দ্র সিএন টাওয়ারের পাশে আরেকটি কন্ডোমিনিয়াম আছে, সেটি অনেক বেশি বিলাসবহুল। সেখানেও অনেক বাংলাদেশি রয়েছে। অনেকের কনডো সেখানে আছে। কিনে রেখে চলে গেছে। কারোটা হয়তো খালিও পড়ে আছে” বলছেন তিনি।

“তবে এর পরে যারা এভাবে কানাডায় অভিবাসী হয়েছেন, তারা ছড়িয়ে পড়েছেন আরও বিভিন্ন জায়গায়। এদের পছন্দ ছিল এমন জায়গা, যেখানে সাধারণ বাংলাদেশিদের সঙ্গে তাদের মিশতে হবে না। এরা ছয়, সাত বা আট হাজার স্কয়ার ফিটের বড় বড় বাড়ি কিনেছে।”
রিয়েল এস্টেট এজেন্ট সাজ্জাদ আলির অনুমান, যে কথিত অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে এখন প্রতিবাদ শুরু হয়েছে, সেরকম খুবই বিত্তশালী বাংলাদেশির সংখ্যা বৃহত্তর টরন্টো এলাকাতেই দুশোর কম হবে না। কানাডায় সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়ি কেনা সেরকম কঠিন কোন কিছু নয়। পাঁচ শতাংশ ডিপেজিট দিয়েও বাড়ি কেনা সম্ভব যদি ভালো ক্রেডিট রেকর্ড এবং বাড়ির মর্টগেজ পরিশোধের সাধ্য থাকে।

“কানাডায় অভিবাসী বাংলাদেশিদের শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ হয়তো এখন বাড়ির মালিক। বাকী ৫০ ভাগও হয়তো আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তাদের পরিশ্রমের সঞ্চয় দিয়ে কত তাড়াতাড়ি একটা বাড়ি কিনতে পারেন। কিন্তু যে বাংলাদেশিদের কথা নিয়ে এত শোরগোল, তারা তো আর এই সাধারণ বাংলাদেশিদের কাতারে নন, এরা এমন সব জায়গায় বাড়ি কিনেছেন, যেখানে বাড়ির দাম অনেক বেশি এবং সেই দামে বাড়ি কেনার মতো আয়-উপার্জন তারা কানাডায় করছেন, সেটি আমরা দেখছি না।”
টরন্টো এবং নিকটবর্তী শহর রিচমন্ড হিল, মিসিসাগা এবং মার্কহামের অভিজাত এলাকায় বাংলাদেশিরা এরকম দামি বাড়ি কিনেছেন বলে জানান সাজ্জাদ আলি।

কীভাবে এই অর্থ পাচার হচ্ছে : মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কানাডার আইনকানুন যথেষ্ট কড়া। অর্থ পাচার এবং অবৈধ লেন-দেন বন্ধ করতে কানাডায় কাজ করে ফিনান্সিয়াল ট্রান্সেকশনস অ্যান্ড রিপোর্ট এনালিসিস সেন্টার অব কানাডা বা ‘ফিনট্রাক।’ এসব আইন-কানুনে কি এমন কোন ফাঁক আছে, যার সুযোগ নিচ্ছেন এই কথিত অর্থপাচারকারীরা?
কানাডায় বহু বছর ধরে ইমিগ্রেশন আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন ব্যারিস্টার রেজাউর রহমান। একসময় বাংলাদেশের ‘আইন-আদালত’ নামের এক জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন। তিনি বলছেন, যখন কেউ প্রথম কানাডায় আসেন, তখন তিনি যে কোন অংকের অর্থ নিয়ে আসতে পারেন, যেটা তার বৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বলে তিনি ঘোষণা করছেন।

“এখন বৈধভাবে যিনি আসছেন, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে নিশ্চয়ই তিনি কিছু কাগজপত্র দেখাচ্ছেন- যে আমার এই অর্থ ছিল, আমার এই সম্পদ ছিল, সেটা বিক্রি করে, সেখানে কর প্রদান করে আমি এখানে আসছি। সেক্ষেত্রে কানাডার পক্ষে দেখা কঠিন, এই টাকা সত্যি সত্যি বাংলাদেশে বৈধভাবে অর্জিত হয়েছে কীনা।”

বাংলাদেশ থেকে ব্যাংকের ঋণ খেলাপি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় বড় দুর্নীতিবাজরা যে অর্থ পাচার করে কানাডায় নিয়ে এসেছে বলে শোনা যায়, সেটা কানাডার পক্ষে বন্ধ করা কঠিন। এক্ষেত্রে বড় দায়িত্ব বাংলাদেশের, বলছেন তিনি। “কানাডা তো কানাডার দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে তারা কীভাবে বের হয়ে আসলো? এবং কারা তাদেরকে সহায়তা করলো? কীভাবে করলো? সেটা কিন্তু দেখা প্রয়োজন।”

রেজাউর রহমান জানান, পেশাগত জীবনে এমন অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে, যারা কানাডায় অভিবাসী হতে চেয়েছেন অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে। কিন্তু তিনি কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখেছেন, তারা প্রচুর মিথ্যে তথ্য দিয়ে আর জাল কাগজপত্র তৈরি করে এই সুযোগ নিতে চেয়েছেন। “আমার কাছে যখনই কেউ বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের আবেদন নিয়ে আসেন, তার কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর আজ অবধি আমি কাউকে অভিবাসন দিয়ে আনতে সহায়তা করতে পারিনি। কারণ তারা সেই যোগ্যতা অর্জন করেননি, তাদের কাগজপত্রে দারুণ ভেজাল ছিল। তবে আমি না করলেও তারা অন্য কারও কাছ থেকে এই সহায়তা পেয়েছেন। এরপর আমাকে এসে বলে গেছেন, আপনি তো করেননি, আরেকজন তো করে দিয়েছে।” রেজাউর রহমান বলেন, “যেটা আমি শুনতে পেয়েছি, বা আমাকে যেটা বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে তারা প্রথমে টাকা পাচার করে অন্যদেশে নিয়ে রাখে- যেমন মধ্যপ্রাচ্যে। এরপর সেই দেশের ব্যাংক থেকে টাকাটা ট্রান্সফার করেন কানাডায়। তারা দেখান যে, এই টাকা তারা বৈধভাবে অর্জন করেছেন। তারা যদি দেখান যে তাদের কাছে আয়কর প্রদানের কাগজ আছে, যে কাগজপত্র আসলে সম্পূর্ণ ভুয়া, তারা যদি দেখান যে তাদের সম্পত্তির মূল্য এত, যেটা আসলে সম্পূর্ণ ভুয়া, সেটা তো এখানে কারও পক্ষে যাচাই করা কঠিন।”

যেভাবে প্রতিবাদের শুরু : কানাডায় বাংলাদেশের ‘করাপ্ট এলিট’ বা দুর্নীতিগ্রস্ত বিত্তশালীদের অর্থপাচার এবং সেখানে দ্বিতীয় নিবাস গড়ে তোলা নিয়ে কানাঘুষো চলছে বহু বছর ধরেই। কিন্তু হঠাৎ করে কেন কানাডা প্রবাসী সাধারণ বাংলাদেশিরা এদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করলেন?

“এসব নিয়ে ফিসফাস কথাবার্তা বরাবরই ছিল। বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। এরা দুবাই হয়ে টাকা নিয়ে আসছে। সিঙ্গাপুর থেকে টাকা নিয়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি টরন্টোতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা এবং ঢাকার পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু খবর সবাইকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে”, বলছেন শওগাত আলী সাগর। টরন্টোতে যারা এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন, তিনি তাদের একজন। “ঢাকার কাগজে যেসব ঋণ খেলাপিদের বড় বড় কেলেংকারি নিয়ে তোলপাড় চলছে, দেখা গেল তারা সবাই এখানে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে বড় বড় সমাজসেবক, সংস্কৃতি-সেবক সেজে বসে আছেন। এরপর এখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হলো। ”তারা বলতে শুরু করলেন, বাংলাদেশের সব চোর-বাটপাররাই তো দেখছি এখানে এসে লাফালাফি করছে। একজন ঋণখেলাপি তো একদিন আমার সামনেই এখানে দম্ভ করে বলছিলেন, ‘আমি কানাডিয়ান ব্যাংকারদের ঘুষ খাওয়া শেখাবো। ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে হয় না। বাংলাদেশেও দিতে হয় না, কানাডাতেও না,” জানান শওগাত আলী সাগর। একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে এই প্রতিবাদের শুরু। তবে দিনে দিনে এটি আরও সংগঠিত হয়েছে। সেখানে তারা মানববন্ধন করেছেন। প্রতিবাদী গান আর কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান করেছেন। পরবর্তী পর্যায়ে এখন তারা বিষয়টি কানাডার রাজনীতিক, নীতিনির্ধারক এবং মূলধারার গণমাধ্যমের নজরে আনারও উদ্যোগ নিয়েছেন।

Posted ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

85-59 168 Street, Jamaica, NY 11432

Tel: 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: weeklybangladesh@yahoo.com

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.