শুক্রবার ২৩ জুলাই ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

নির্বাচন কমিশনের দায় কী?

ড. মাহবুব হাসান   |   বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ ২০২১

নির্বাচন কমিশনের দায় কী?

ড. মাহবুব হাসান

ভোটার দিবসে [২ মার্চ] নির্বাচন কমিশন নতুন তালিকা প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ১১ কোটি ১৭ লাখ ২০ হাজার ৬৬৯ জন ভোটার। এই বিপুল সংখ্যক ভোটার তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন কি না, অতীতেও পেরেছে কি না, সেই প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। কারণ ভোটারাধিকার প্রয়োগ নিয়েই রয়েছে দেশে ব্যাপক সমালোচনা। রয়েছে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পেপার সিল মেরে ভোট সম্পন্ন করার রাজনৈতিক ঘটনা, যা কেবল ইসিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, ক্ষমতাসীনদেরকেও জাতির সামনে নগ্ন করেছে। আর তাতে শেষ পেরেকটি ঠুকেছিলেন সিইসি নূরুল হুদা। তিনি এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমরা আর মধ্যরাতের ভোট হতে দিতে পারি না। পরোক্ষে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে ওই নির্বাচনটি ডাকাতি হয়ে গেছে সরকারের ছত্রছায়ায়।

এরপর কি আর বলার দরকার আছে বা পড়ে যে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে বা গণতন্ত্র আছে? ‘গণতন্ত্রের চর্চা হওয়া আর গণতন্ত্র আছে’ কথাটা বলা বা তার স্বরূপ চেনাবার চেষ্টা করা যে বেকুবি, সে কি সামান্য বুদ্ধি সম্পন্নও বোঝেন না? তারপরও আমরা প্রতিদিনই সংসাবপত্রে এবং ইলেকট্রনিকস মিডিয়াতে দেখতে ও শুনতে পাই দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দল এ-নিয়ে তুমুল তর্কে নামছেন। একদল বলছেন [ক্ষমতাসীন দল ]গণতন্ত্র আমরা সুপ্রতিষ্ঠিত করেছি, অন্যদল [ক্ষমতার বাইরের প্রধান দল ও অপরাপর দল] বলছেন গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়েছে। সেই কবরে কালো মাটির ঢেলা ছুঁড়ে চলেছেন বর্তমান নির্বাচন কমিশন। এ-সব রাজনৈতিক তর্ক সব সময় যুক্তিপূর্ণ হতে হয়। যারা বলছেন তারা গণতন্ত্র চর্চা করছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে, গণতন্ত্র কী তাই তারা বোঝার চেষ্টা করেন না। কারণ গণতন্ত্র কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয় নয়। এর রয়েছে ব্যাপক রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত, যা জনগণের মনে সৃষ্টি করে আস্থা, বিশ্বাস, ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ।

এই শ্রদ্ধাবোধ জন্মে রাজনৈতিক জনগণের মধ্যে, যারা রাজনৈতিক দলের সদস্য ও অনুসারী। কথাগুলো শুনতে কেমন শ্রেণিকক্ষের বক্তৃতা মনে হচ্ছে, কিন্তু গণতন্ত্রের যে স্ট্যাকচারাল ফর্ম আছে, সেখানে নির্বাচন কমিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ঠিক এ-কারণেই সংবিধানে রাষ্ট্রকাঠামোর তিনটি শাখাকে সাংবিদানিকভাবে আলাদা রাখা হয়েছে, যাতে কোনো শাখা অন্যটির ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ আর সরকার , পরস্পর সহযোগী হিসেবে, কিন্তু স্বাধীনভাবে কাজ করবে। কিন্তু সেই স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থাগুলো ক্ষমতার কোনো তারতম্য হয়নি আমাদের দেশে। যা হয়েছে, তাহলো ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত [ তারা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযোগ পান ] ব্যক্তিগণ রাজনৈতিক সরকারের অনুগত হিসেবে নিয়োগ পান। আর রাজনৈতিক সরকারের রাষ্ট্রপতি, তিনি তার সিদ্ধান্তমূলক কার্যক্রম চালান প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। যখন রাষ্ট্রপতি সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন করা হয়, তখন সংবিধানে এ-রকম ব্যবস্থাই রাখা হয়েছে। এ-জন্যে বলা হয়, আমার দেশের রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন ‘ঠুটোজগন্নাথ’–যার কোনো ক্ষমতা নেই সেই রকম এক অধিপতি বা ভগবান। এতো কথা বলার পেছনে রয়েছে বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদার কাজ দেখে।

তিনিও আরেক ‘ঠুটোজগন্নাথ’ যা নির্দেশিত হন, তিনি সেটাই করেন। আসলে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রথমদিন থেকেই এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খুঁটিগুলো একটি একটি করে খুলে নেয়া হয়েছে, যাতে ওই প্রতিষ্ঠান কাগজে কলমে চেহারা-আদলে, বাইরে থেকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানরূপে থাকলেও আসলে সে প্রতিষ্ঠান ক্ষমতাসীনদের বশংবদে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৩ সালেও আমরা দেখেছি রাজনৈতিক সরকারের লোকেরা ‘লুট করেছে’ ব্যালট বাক্স। সামরিক সরকারের আমলে হ্যা, ও না ভোট দেবার কৃতিত্ব নির্বাচনের কমিশনেরই যেমন সেরা কাজ ছিলো, তাকে টেক্কা দিয়েছে প্রথমে ১৫৪টি আসনে বিনা ভোটে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচন, দ্বিতীয়বার রাতের বেলায় ভোট কাস্ট করে নির্বাচনকে বৈধতা দিয়ে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক বা দলনিরপেক্ষ প্রার্থীবিহীন কোনো নির্বাচন হতে পারে, এমন ধারণা আমাদের নেই।

আমরা জানি না ইসির আইনে সে-রকম কোনো ধারা বা উপধারা আছে কি না যার বলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রতিদ্বন্দ্বীবিহীন ও ভোটারবিহীন ‘নির্বাচন’ হতে পারে কি না। এবং তার বৈধতা দিতে পারেন কিনা। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের এক বক্তব্য এখানে উদ্ধৃত করা যাক। গত ২রা মার্চ তিনি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে চট্টগ্রামের রাউজান পৌরসভার নির্বাচনের উদাহরণ টেনে এই সিনিয়র কমিশনার বলেছেন ‘ বাংলাদেশে সবচেয়ে চমক সৃষ্টিকারী পৌরসভা নির্বাচন হয়েছে চট্টগ্রামের রাউজানে। ২৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এখানে মেয়র ও বারোজন কাউন্সিলর বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে রাউজান থেকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও তখন তুলে নেয়া হয়েছে। ইতঃপূর্বে উপজেলা নির্বাচনেও ঠিক এভাবেই রাউজানে সবাই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে এটা ‘নির্বাচন’ না বলে ‘মনোনয়ন’ বলাই সম্ভবত অধিকতর সঙ্গত।’

সিইসি নূরুল হুদা ও ইসি মাহবুব তালুকদারের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে ভিন্নমত এতোকাল জেনে আসছিলাম আমরা, তা এখন তীব্র বিতন্ডায় রূপ নিয়েছে। এর ভেতর দিয়ে সেই অনিবার্য সত্য প্রকাশ পেয়েছে, যা জনগণের অনাকাঙ্খিত কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর আকাঙ্খারই ফল। দেশের কোনো রাজনৈতিক দলই নির্বাচন কমিশনকে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দিতে চায়নি, না এখন না অতীতে কখনো। এরই ফলে ওই প্রতিষ্ঠানের খুঁটিগুলো জীর্ণ নড়বড়ে কিংবা বলা উচিত ধসে পড়ার প্রাক-পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভোটারবিহীন নির্বাচনের ফলকে সিনিয়র ইসি মাহবুব তালুকদার কেন নির্বাচন না বলে মনোনয়ন বললেন, তা নিয়ে অনুসন্ধান করা যায়। কারণ, ওই দিন, ২রা মার্চ সিইসি নূরুল হুদা মাহবুব তালুকদারের বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক’ বলে নিন্দা করেছেন। তাহলে কি আমরা ধরে নেবো নির্বাচন কমিশন রাজনীতির বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান, যার কোনো সিদ্ধান্তই রাজনৈতিক নয়, তা কেবল ‘মাছিমারা কেরানি’র মতো? আমরা তো মনে করি রাজনৈতিক সরকারের মতোই গণতান্ত্রিক ক্ষমতার আরেক স্বাধীন অংশীদার নির্বাচন কমিশন। সরকার যেমন দেশের প্রশাসন পরিচালনার মালিক-মোক্তার, তেমনি নির্বাচন কমিশনও তার কার্যবিধির মাধ্যমে তার ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী।

সেই ক্ষমতার বলেই কি সিইসি ভোটারবিহীন নির্বাচনকে বৈধতা দিয়ে কমিশনের বারোটা বাজাচ্ছেন নাকি ইসির কার্যক্রমকে সঠিক পথে পরিচালিত হচ্ছে বলে চালিয়ে দিচ্ছেন? নির্বাচন নিয়ে ইসির দুজনের মধ্যে যে মতপার্থক্য, যাকে সিইসি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বলছেন মাহবুব তালুকদার রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে হেয়, অপদস্ত করার জন্য নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার যা করা দরকার সবই করছেন। ব্যক্তিগত স্বার্থ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কমিশনকে হেয় করে চলেছেন মাহবুব তালুকদার। তিনি সব সময় ইসিতে রাজতৈনিক বক্তব্য দিচ্ছেন। সব কর্মকান্ডের সমালোচনা করছেন। এ-গুলো তিনি ঠিক করছেন না। তবে আমরা কখনো বাধা দেইনি। কারণ সংবিধানের ১৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে।’

সিইসি যথার্থই বলেছেন যে সাংবিধানিকভাবে তার মতপ্রকাশের অধিকার আছে। এ-জন্যই তিনি এবং কমিশনের অন্যরাও তার বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে যাননি। একজন কমিশনারের মতপ্রকাশের অধিকার আছে বলে যে কথা সিইসি বলেছেন, ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকেরও রয়েছে সেই মতপ্রকাশের অধিকার। কিন্তু বাংলাদেশের গণমানুষের সেই অধিকার তারা ভোগ বা উপভোগ করতে পারছেন না, অতীতেও পারেননি। যে সব নির্বাচনের কথা আমরা উল্লেখ করেছি, সেখানে গরিষ্ঠসংখ্যক ভোটার তাদের মতপ্রকাশ করতে পারেনি। তারা ভোট দিতে না পারলেও তাদের কপালে কি করে একজন রাজনৈতিক চরিত্র তাদেরই সংসদ সদস্য, উপজেলায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং ইউনিয়ন পরিষদের মেয়র ও কাউন্সিলর ‘নির্বাচিত’ হলেন? যদি সিইসি বলেন যে, ইসি’র আইনে এই বৈধতার আইনি ভিত্তি আছে, তাহলে তো বিতর্কের কোনো অবকাশই আর থাকে না। তার মানে মাহবুব তালুকদার জানেন যে নির্বাচন কমিশনে আইনে ওই রকম বৈধতা দানের শক্তিশালী ও অ্যাবসিলুইট আইনি ভিত্তি নেই। যার জন্য তিনি তার ভিন্নমত প্রকাশ করে চলেছেন। তার মূল লক্ষ্য নির্বাচন কমিশনের হারানো গৌরব নয়, ফিরিয়ে আনতে চান নির্বচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও অধিকার, যা নানাভাবে গত ৫০ বছরে হারাতে বসেছে। তার মত হচ্ছে, তিনি প্রকাশ্যে না বললেও অনুমান করা যায় যে সিইসি নূরুল হুদার অদূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে রাজনৈতিক সরকারের প্রতি অনুগত করে তুলেছে। তিনি প্রকাশ্যে বর্তমান সরকারের পক্ষে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে একটার পর একটা ভুল করছেন, যার দায় গিয়ে পড়ছে গোটা কমিশনের ইমেজের ওপর।

আজকে, এটা প্রজ্ঞাবানেরা মানবেন যে সরকারের রাজনৈতিক দৌরাত্ম্যের কারণে রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ বিচার বিভাগের প্রধান , প্রধান বিচারপতি সিনহাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। ভেঙে পড়েছে বিচারবিভাগ। ইলেকশন কমিশনে নূরুল হুদার মতো রাজনৈতিক লেজুড়, নির্বাচন ব্যবস্থাকেও ভঙ্গুর করে দিয়েছে। যার ফলে জন্ম নিয়েছে একটি টাইরান্ট সরকার, যারা মনে করে চোখ ধাঁধানো উন্নয়নই আসল ডেভেলপমেন্ট। জনগণের প্রতিনিধিত্বহীন সরকারের রাজনৈতিক চরিত্রই হলো সত্যকে মিথ্যার ধূয়াশায় পূর্ণ করে তোলা। গত বারো বছর ধরে সেটাই পোক্ত করেছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার।

Facebook Comments Box

Posted ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ ২০২১

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গল্প : দুই বোন
গল্প : দুই বোন

(1114 বার পঠিত)

স্মরণে যাতনা
স্মরণে যাতনা

(628 বার পঠিত)

মানব পাচার কেন
মানব পাচার কেন

(374 বার পঠিত)

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

85-59 168 Street, Jamaica, NY 11432

Tel: 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: weeklybangladesh@yahoo.com

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.