বুধবার ২৫ নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মুশতাকের মন্ত্রীসভায় শপথ নেন যারা-

ডা. ওয়াজেদ খান   |   বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২০

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মুশতাকের মন্ত্রীসভায় শপথ নেন যারা-

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ নেতারাই শপথ নেন মুশতাকের মন্ত্রীসভায়। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘৭৫ এর ১৫ আগষ্ট নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। একই প্রত্যুষে হত্যার শিকার হন তার পরিবারের ১৮জন সদস্য। ইতিহাসে এটি জঘন্যতম হত্যাকান্ড হিসেবে চিহ্নিত। মেজর ফারুক ও মেজর রশীদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর কতিপয় জুনিয়র অফিসার সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করেন এ হত্যাকান্ড। দেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, রক্ষীবাহিনী, বিডিআর ও পুলিশ বাহিনীর প্রধানতো দূরের কথা একজন সেপাহিও হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি সে রাতে। বাঁচাতে পারেনি তার জীবন। ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে আইন শৃংখলা বাহিনী পূর্বাহ্নে সতর্ক করতে পারেনি রাষ্ট্রপতিকে। গুটিকয় মেজর, ক্যাপ্টেন, হাবিলদার, রিসালদারের কাছে বাহিনী গুলোর নতজানু ভূমিকা ছিলো রহস্যজনক। শুধু তাই নয় দলীয় প্রধানের সপরিবারে হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তায় নামেনি কোন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। উল্টো তাদের নেতারা হত্যা ষড়যন্ত্রের নায়ক খন্দকার মুশতাকের মন্ত্রী সভায় শপথ নিয়েছেন একই দিন বিকেলে। যখন তারা শপথ নেন বঙ্গবভনে, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সিড়িতে তখনও পড়েছিলো বঙ্গবন্ধুর লাশ। এ অনুষ্ঠানে বাহিনী প্রধানরা ব্যস্ত ছিলেন খানাপিনা-উল্লাসে।

বঙ্গভবনের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমে শপথ নেন খন্দকার মুশতাক আহমদ নিজে। এরপর শপথ নেন মোহাম্মদ উল্লাহ উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে। অত:পর শপথ নেন ১০ মন্ত্রী। মুশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগদানকারী এসব মন্ত্রীরা হলেন-(১) বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (২) ইউসুফ আলী (৩) ফনী মজুমদার (৪) সোহরাব হোসেন (৫) আব্দুল মান্নান (৬) মনোরঞ্জন ধর (৭) আব্দুল মোমিন (৮) আসাদুজ্জামান খান (৯) ডঃ আজিজুর রহমান মল্লিক (১০) ডঃ মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী।

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথকারীরা হলেন: ১. শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, ২. দেওয়ান ফরিদগাজী ৩. তাহের উদ্দিন ঠাকুর ৪. নুরুল ইসলাম চৌধুরী, ৫. নূরুল ইসলাম মঞ্জুর ৬. কে এম ওবায়দুর রহমান। শপথকারী সবাই ছিলেন আগের অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রী পরিষদের সদস্য। ছিলেন না সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী, কোরবান আলী ও কামরুজ্জামান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন তখন ছিলেন বিদেশে। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন তৎকালীন মন্ত্রীপরিষদ সচিব এইচ টি ইমাম। যিনি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম নীতি নির্ধারক ও প্রধানমন্ত্রীর প্রভাবশালী একজন উপদেষ্টা।

সেদিনের শপথ গ্রহনের প্রত্যক্ষদর্শী ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের স্টেশন কমান্ডার লেঃ কর্ণেল(অব) এম এ হামিদ, পিএসসি তার “তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা” গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন এভাবে-“সবাই বঙ্গভবনে একত্রে জুম্মার নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন। জুম্মার নামাজের পর তিন বাহিনী প্রধান, পুলিশ, বিডিআর এবং অন্যান্য সিভিল গণমান্য ব্যক্তিবর্গের সামনে খন্দকার মোশতাক আহমদ শপথ গ্রহণ করলেন। উপস্থিত সবাই ছুটে গিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাল। এরপর মোশতাক আহমদ তার নতুন মন্ত্রীসভায় সদস্যদের শপথ গ্রহণ করান। প্রায় সবাই পুরাতন মাল। তিনি নতুন বোতলে পুরাতন মদ ভরে দিলেন। পুরাতন আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভার কয়েকজন বাদে সবাইকে নিয়েই নতুন মন্ত্রীসভা গঠন করলেন। সবাই খুশী।”
মুুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানী রাষ্ট্রপতি মুশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের দিন সকাল পৌনে ১১টায় সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার, নৌবাহিনী প্রধান কমোডোর মোশারফ হোসেন খান এবং পুলিশ ও বিডিআর প্রধান এবং রক্ষীবাহিনীর অস্থায়ী পরিচালক মুশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে বেতার ভাষণ দেন। দল বেঁধে বঙ্গভবনে যান দুই দফা।

হত্যাকান্ডের এক সপ্তাহ পর ২৩ আগষ্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, আব্দুস সামাদ, তাজউদ্দিন, কোরবান আলী, শেখ আব্দুল আজিজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন এমপি, আব্দুল মান্নান এমপি সহ গ্রেফতার করা হয় ২৬ জনকে। ৭ নভেম্বর গ্রেফতার হন জিল্লুর রহমান এমপি, রক্ষীবাহিনী প্রধান তোফায়েল আহমদ, আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ। এর আগে বহাল তবিয়তেই ছিলেন এসব নেতা। মুশতাক সরকার শুধু আগের মন্ত্রী পরিষদ সদস্যদেরকেই বহাল রাখেননি। এক ঘোষণায় সামরিক আইন জারি সত্বেও বহাল রাখেন সংবিধান। অটুট রাখেন রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি-গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। জাতীয় সংসদও বিলোপ করেননি তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৬ অক্টোবর বঙ্গভবনে আওয়ামী লীগের এমপিদের সাথে টানা ৭ ঘন্টা বৈঠক করেন রাষ্ট্রপতি মুশতাক। ঐ বৈঠকে অংশ নেন ২৬০জন আওয়ামীলীগ এমপি। এভাবেই কাটে খন্দকার মুশতাকের ১১ সপ্তাহের বাদশাহী। মুশতাকের মন্ত্রী সভায় কোন সেনা অফিসার বা অন্য কোন ব্যক্তি স্থান পায়নি আওয়ামী লীগ নেতা ছাড়া। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা বঙ্গভবনে ঘুর ঘুর করলেও বঙ্গবন্ধুবিহীন আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদী নেতারাই কার্যত সেসময়টায় ছিলো ক্ষমতার বলয়ে।

১৫ আগষ্ট ঘটনাকালে জেনারেল জিয়া ছিলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান। সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল সফিউল্লাহ। যদিও তিনি ছিলেন জিয়ার চেয়ে কনিষ্ঠ। পচাত্তুরের ২৩ আগষ্ট জিয়া সফিউল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হন। সেসময় বিএনপির জন্মই হয়নি। রাজনীতিতে ছিলো না জামায়াত, মুসলীম লীগ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম। রাজনীতিতে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রধান শত্রু ছিলো জাসদ। যার সামরিক শাখা গণবাহিনী দেশজুড়ে সংঘাতে জড়ায় রক্ষীবাহিনীর সাথে। জাসদ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের শ্লোগান দিয়ে বিপথগামী করে তরুণদের। তাদের মাঝে সৃষ্টি করে মুজিব বিরোধী উত্তেজনার। অস্থিতিশীল করে তুলে দেশের রাজনীতি। সরকারের ভিত করে দেয় নড়বড়ে। মুজিব হত্যাকান্ডের প্রেক্ষাপট সৃষ্টিতে জাসদের ভূমিকা গৌণ করে দেখার সুযোগ নেই। ১৫ আগষ্ট এবং ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানের পর জাসদের যেসব নেতা ট্যাংকে উঠে উদ্দাম নৃত্য করেছেন তারাই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দীর্ঘ সাড়ে চারদশক পর বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের দায় নিতান্ত রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন ব্যক্তির উপর চাপানোর একটা প্রতিযোগিতা চলছে। তবে একথা সত্য যে ১৫ আগষ্ট প্রত্যুষে সেনাবাহিনী, রক্ষীবাহিনী সহ অন্যান্য বাহিনী আগে থেকে সতর্ক অবস্থান নিলে গুটিকয় মেজরের পক্ষে এমন হত্যাকান্ড ঘটানো ছিলো অসম্ভব। ঢাকায় না হয় তারা চাপে ছিলো কিন্তু দেশের অন্যান্য সেনানিবাস থেকে সৈন্যদেরকে ঢাকা ঘেরাওয়ের নির্দেশ দিতে পারতেন জেনারেল সফিউল্ল্যাহ। ৩২ নম্বরের বাড়ি আক্রান্ত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সফিউল্লাহকে ফোন করেন ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু কিছুই করেননি তিনি। সেনাপ্রধান মেজরদের বিপক্ষে সামান্যতম কোন অবস্থান নিয়েছেন এমন কোন সাক্ষ্য ইতিহাস দেয় না। অথচ তিনিই পরবর্তীতে হয়েছেন আওয়ামী নেতা, এমপি।

রক্ষীবাহিনীও দুঃসময়ে গুটিয়ে নেয় নিজেদেরকে। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর। অজ্ঞাত কারণে তাদের কেউ সেদিন নামেনি রাস্তায়। গড়ে তোলেনি তাৎক্ষণিক কোন প্রতিরোধ। ঝড়ের পর যেমন সবাই আম কুড়োয়, তেমনি তারা এখন সে সময়কার ঘটনা প্রবাহ নিয়ে বড় বড় কথা বলছেন। অথচ মুশতাকের জীবদ্দশায় তার আগামসি লেনের বাসায় কেউ আমের আঁটি দিয়ে ঢিল ছুড়েছে এমন কোন নজির নেই। ১৯৮১ সালে ৩০মে, চট্রগ্রামে, কতিপয় সেনা অফিসারের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়া। সেদিন ঘাতকদের পরিকল্পনা ছিলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের। কিন্তু জিয়া হত্যার প্রতিবাদে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে যায় তাৎক্ষণিকভাবে। ফলে ক্ষমতা লিপ্সুদের বন্দুকের নল ঘুরে যায় উল্টো দিকে। পাল্টে যায় ঘটনাপ্রবাহ। টিকে যায় রাজনীতি ও গণতন্ত্র। পচাত্তুরে দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা নাজুক ছিলো। অস্থিরতা ছিলো রাজনৈতিক অঙ্গণে। এসব নিয়ে চাপা ক্ষোভ ছিলো জনমনে। কিন্তু শেখ মুজিবের মতো একজন নেতাকে সপরিবারে হত্যার বিষয়টি ছিলো মানুষের কল্পনার বাইরে।এ হত্যাকান্ডে মুশতাক আহমদরা মেজরদের ব্যবহার করেছে। না মেজররা মুশতাক আহমদের ব্যবহার করেছে তা এখনও রহস্যাবৃত। পচাত্তুরের ১৫আগষ্ট যে সকল আওয়ামী লীগ নেতা মন্ত্রীত্বের শপথ নিয়েছেন তারা জেনেশুনে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে কাজটি করেছেন। এনিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। জোর করে তাদেরকে মন্ত্রী বানানো হয়েছে এক কথা ধোপে টিকে না। কথায় বলে “ঘোড়াকে টেনে পানিতে নামানো যায়-পানি খাওয়ানো যায় না।” পানি খাওয়া না খাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্নভাবে ঘোড়ার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল।

Facebook Comments

Posted ৬:৪৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২০

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

85-59 168 Street, Jamaica, NY 11432

Tel: 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.