শুক্রবার ৪ ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

বাঙালিত্বের প্রশ্নে আপস করেননি

আসাদুজ্জামান নূর   |   রবিবার, ২১ জুন ২০২০

বাঙালিত্বের প্রশ্নে আপস করেননি

আমি ঢাকায় আসি ১৯৬৬ সালে। তখন বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তত দিনে দেশের বামপন্থী রাজনীতি মস্কোপন্থী, পিকিংপন্থী—দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। আমরা যারা ওই সময় ছাত্র ইউনিয়ন করতাম তারা মস্কোপন্থী হিসেবে চিহ্নিত। এই বিভাজনটা তখন শুধু ছাত্রদের মধ্যেই নয়, বামধারার সব সংগঠনের মধ্যেও ছিল। ওই সময়টাতেই কামাল লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। একজন ক্ষুদ্র সংস্কৃতিকর্মী হিসেবেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়টা হয়।

১৯৬৭ সালের দিকে কামাল লোহানী ক্রান্তি নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের মাধ্যমেই তিনি তাঁদের আদর্শের কথা তুলে ধরতেন। তাঁদের প্রথম একটা অনুষ্ঠান দেখি পল্টনে। তখন শুধু ঢাকায় এসেছি এবং একজন সংগঠক হিসেবেই কাজ করতাম। কোনো গান, আবৃত্তি বা অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। পল্টনে ক্রান্তির অনুষ্ঠান দেখে আমি খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। এর পরই আমরা কয়েকজন নিজেরা আলোচনা করি এর চেয়ে ভালো কিছু করা যায় কি না। তখন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠা করি। ক্যাম্পাসের নানা জায়গায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান করি। এই সূত্র ধরেই লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। আস্তে আস্তে জানতে পারি যে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী বা সাংস্কৃতিক সংগঠকই নন, একজন ভালো নৃত্যশিল্পীও ছিলেন। ভাবতে অবাক লাগত, এমন একজন গুরুগম্ভীর মানুষ, নামজাদা সাংবাদিক নাচতেও পারেন!

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লোহানী ভাই সাংবাদিকতার পাশাপাশি দেশে যে বড় ভূমিকা রাখলেন তা আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে অনেক দূর এগিয়ে নেয়।

উল্লেখযোগ্য একটা বিষয় হলো, কামাল লোহনী পিকিংপন্থী হলেও সব সময় স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। চীনপন্থীদের একটা অংশের মধ্যে আইয়ুব খানের সঙ্গে আপস করার প্রবণতা ছিল। তখন তো একটা কথা চালু ছিল যে ভাসানী সাহেব নাকি নেতাকর্মীদের বলতেন, ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুব।’ জানি না কথাটা সত্য কি না। তবে বেশ চালু ছিল। সম্ভবত কারণটা পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ভালো সম্পর্ক এবং সেই সূত্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানকে বিরক্ত না করা। আর আমরাও (মস্কোপন্থীরা) এই প্রচারটাকে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগাতাম। তখন ডাকসুর নেতৃত্বে যে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আন্দোলন করেছিল, তাতে পিকিংপন্থী অনেকেই যোগ দেন। আসলে পিকিংপন্থীদের একটা অংশ তখন ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুব’ তত্ত্ব থেকে বের হয়ে এসেছিল। তারা সর্বাত্মকভাবে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনের সামনের সারিতেই ছিলেন কামাল লোহানী।
প্রকৃতপক্ষে কামাল লোহানী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করা বা তাদের সমীহ করা—এটা তিনি জীবনে কখনোই করেননি। বাংলা, বাঙালিত্ব, বাঙালি জাতীয়তাবোধ এবং অসাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে তিনি কখনোই আপস করেননি।

আরেকটা বিষয় উল্লেখ করি, কামাল লোহানী সব সময় বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধুই বলতেন। তখনকার সময় লক্ষ করতাম, যাঁরা বামপন্থী বা বামঘেঁষা ছিলেন তাঁরা বঙ্গবন্ধু শব্দটা ব্যবহার করতে চাইতেন না। তখন জাসদের লোকেরাও বঙ্গবন্ধু বলত না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর খুব শ্রদ্ধাবোধ ছিল। বঙ্গবন্ধুও তাঁকে স্নেহ করতেন।
১৯৭৫-এ মর্মান্তিক ঘটনার পর দেশে যে সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি হচ্ছে তা কামাল লোহানী বুঝতে পেরেছিলেন। একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘এখন আমাদের ক্রাইসিস হলো আবার ঘুরেফিরে আমরা একাত্তরের ক্রাইসিসের দিকে চলে যাচ্ছি। এখনকার সংকটটা হলো, তখন চিহ্নিত শত্রু ছিল পাকিস্তানিরা, এখন নানা ধরনের শক্তি আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। আমরা বাংলা, বাঙালি জাতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক মুক্তি—যেগুলো নিয়ে আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি, যেটা নিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার যুদ্ধ, সেই স্বাধীনতাই চ্যালেঞ্জের মুখে, হুমকির মুখে পড়ে গেছে। এখানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ছাড়া অন্য কিছু ভাবার অবকাশ নাই।’ সম্ভবত ১৯৭৮ সালের দিকে তিনি কথাটা বলেছিলেন। পরে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে কামাল লোহানীর ভূমিকা তো সবাই জানেন। কামাল লোহানী অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠনে জড়িত ছিলেন। একপর্যায়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে আসেন। এরপর সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও সাংবাদিকতাকেই নিজের জায়গা বলে মনে করতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষের মুক্তি সমাজতন্ত্র ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু এর পরও আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার প্রতি তাঁর সমর্থন লক্ষণীয়। এর কারণও আছে। প্রথমত, বঙ্গবন্ধু নিজেও তাঁর মতো করে একটা সমাজতন্ত্রের কথা চিন্তা করতেন। দ্বিতীয়টা হলো, বামদের জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Facebook Comments

Posted ৫:১৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২১ জুন ২০২০

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গল্প : দুই বোন
গল্প : দুই বোন

(272 বার পঠিত)

যত সঙ্কট তত লাভ
যত সঙ্কট তত লাভ

(125 বার পঠিত)

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

85-59 168 Street, Jamaica, NY 11432

Tel: 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.