শনিবার ২৩ অক্টোবর ২০২১ | ৭ কার্তিক ১৪২৮

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

সুজন মানুষের প্রতিচ্ছবি

ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ   |   বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১

সুজন মানুষের প্রতিচ্ছবি

জুন মাসে আমার অত্যন্ত প্রিয় এবং শ্রদ্ধাভাজন দু’জন মানুষ পরলোক গমন করেন । একজন আমার শ্বশুর জনাব হিরা মিয়া (১৯২৮ ২০২০) এবং আরেকজন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচীতে আমার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী খন্দকার মাহমুদুর রহমান (মৃত্যু জুন ৭, ২০২১)। লেখাটির কলেবর বেড়ে যাওয়ার কারণে জনাব রহমানকে নিয়ে লেখা আগামী কোন এক সংখ্যায় উপস্থাপনের আশা রাখি।

লেখাটির জন্য জুতসই একটি তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়ে ক’দিন ধরেই চিন্তাভাবনা করেছি। তেমন কোন সুবিধে করতে পারিনি। তবে, ঘাঁটাঘাঁটি করে সার্বজনীন কিছু মোদ্দা কথামালা মনে হয় দেয়া যাবে যা অনেকটা ছোটবেলায় পড়া চরিত্র গঠনে বাণীর আদলে, যেমন, ‘সদা সত্য কথা বলিবে, চুরি করা মহাপাপ’, ‘অন্যের অনিষ্ট করিওনা’ ইত্যাদির মতো।
প্রথমেই বলতে হয়, সুজন হওয়ার জন্য অবশ্যই ভাল মানুষ হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করতে হবে । এমনটি হলে জীবনের কোন এক পর্যায়ে এ বিশ্বাস আত্মস্থ হয়ে ফল্গুধারার মত বিকশিত হতে বাধ্য। মনকে, জীবনকে পরিবর্তিত করার সঙ্কল্প দৃঢ় হলে তাঁর বাস্তবায়ন যে কোন পরিবেশ, পরিস্তিতিতে সম্ভব।

আমার শ্বশুরের জন্ম একটি ছোটখাটো জমিদার পরিবারে কিন্তু বড় হয়েছেন একটি অজ পাড়াগাঁয়ে বেশ বৈরি পরিবেশে যেখানে আরাম-আয়েসের অফুরন্ত সুযোগ থাকলে ও লেখাপড়ার চল ও ছিল না। যে গ্রামে হিরা মিয়ার জন্ম সেটি ত্রিপুরা সীমান্ত ঘেঁষা ধর্মঘর এলাকার মালাঞ্ছপুর গ্রাম। মূলত একটি বৃহৎ আকারের পরিবার ও তাদের সেবা প্রদানকারী লোকজনদের নিয়েই এ গ্রাম। গ্রামটির পত্তন দেড়শত বা বড়জোর দুইশত বছরের বেশী হবে না ।

কথিত আছে আমার দাদা শ্বশুরের আব্বা কাবিল মুস্কুরি ধর্মঘর বাজারের সন্নিকটের একটি গ্রাম থেকে এসে গ্রামের পত্তন করেছিলেন। গ্রামটি উঁচু টিলা ভূমি হওয়ায় কৃষি কাজে সেচের সুবিধার জন্য একটি নালা বা পরিখা খনন করে অনেক জমি আবাদের আওতায় নিয়ে আসেন এবং আশে পাশের গ্রামের কৃষকদের কাছে পত্তন দেন। এ নালার ফলশ্রুতিতে সিঙরা বিল সৃষ্টি হয়। পরে আগরতলার মহারাজের কাছে খবর গেলে তিনি এ ভূমি নিজের বলে দাবি করেন। আমার দাদা শ্বশুর মোক্তার ছিলেন। তিনি মামলা করে এ জমির দখল প্যান। এ ভাবেই পরিবারটি ছোট্ট একটি জমিদারি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এক পর্যায়ে আগরতলার রাজা নাকি এ জমিদারিকে স্বীকৃতি ও দিয়েছিলেন। তবে রাজাকে খাজনা দিতে হতো না কারণ মামলা জিতলে সমস্ত ভূমি লাখেরাজ হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল।

জমিদারী পরিবেশে থেকে ও জমিদারীর এক শরিক জনাব সাধু মিয়ার ছেলেরা লেখাপড়াকে জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিলে ও আমার শ্বশুর ও চাচা শ্বশুর এ পথে আগুয়ান হতে পারেন নি। খেলাধুলা, মৎস্য শিকার, গানবাজমা ইত্যাদি নেশা তাঁকে ভর করে। তারই সমবয়সী চাচাতো ভাইয়ের (উপরে উল্লেখিত জনাব সাধু মিয়া যিনি ব্যবসা করার সাথে সাথে স্থানীয় সরকারে সরপঞ্চ ও পরবর্তীতে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন) বড়ো ছেলে আহমেদ জামাল কলিকাতায় উচ্চশিক্ষা নিচ্ছিলেন যখন সেই ১৯৪৬ সালে রায়টের সময় সেখামে গিয়ে আমার শ্বশুর গ্রামোফোন বা কলের গান কিনে নিয়ে আসেন। দুর্ভাগ্যবশত বাড়ী ফেরার কয়েক দিন পর তাঁর গ্রামোফোনটি চুরি হয়ে যায় । এ ঘটনার অব্যবহিত পরেই আমার দাদা শ্বশুর দেবপুর গ্রামের ডাকসাইটে স্কুল শিক্ষক জনাব সুরুজ আলির এক মাত্র কন্যা ১২ বছরের মেধাবী ছাত্রী সাজেদা বানুকে পুত্রবধূ করে নিয়ে আসেন । জনাব হিরা মিয়া এর পর থেকে খাটি রত্নে পরিণত হন ।

উল্লেখ্য যে ধর্মঘর হিন্দু প্রধান এলাকা ছিল। দুই সম্প্রদায়ের লোকেরা মিলেমিশে বসবাস করলে ও মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষার প্রসার ছিল না বল্লেই চলে । মালঞ্চপুর ও এর ব্যতিক্রম ছিলনা । সাধু মিয়া সাবের বড় ছেলে আহমেদ জামাল এম এ পাশ করার অনেকদিন পর মালঞ্চপুরে শিক্ষার শেকড় শক্ত ভাবে প্রোথিত হয়, বিশেষত নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে, (মরহুম) হিরা মিয়া ও তাঁর স্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টা ও দৃঢ়তার কারণে। তাদের সার্বক্ষণিক সয়াহতা দিয়েছিলেন আমার নানা শ্বশুর জনাব সুরুজ আলি এবং এলাকার মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এম এসসি পাশ প্রফেসর মোহাম্মদ আব্দুল হাশিম । জনাব হিরা মিয়া ও মিসেস সাজেদা বেগম রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থাকে ভ্রুকুটি দেখিয়ে তাদের বড় মেয়ে রওশনারাকে ছাত্রীনিবাসে রেখে পড়ান যা সে সময়ের জন্য যুগান্তকারী তো ছিলই, এলাকায় নারীদের উচ্চশিক্ষায় এক অনন্য উদাহরণ ও সৃষ্টি করেছিল। এ পরিবারের বড় ছেলে জনাব জিয়া উদ্দিন, আমার জানামতে, মাধবপুর উপজেলায় প্রথম মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি করাচি থেকে শ্রেষ্ঠ ক্যাডেট হিসেবে স্বর্ণপদক পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। চাকুরী জীবনে শিপিং কর্পোরেশনে চীফ ইঞ্জিনীয়ার পদে সুনামের সাথে কাজ করে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে আমেরিকায় বসবাস করছেন। যেমনটি তার বাকী পাঁচ ভাই বোন ও করছেন।

সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, যে মহিলার কারণে জনাব হিরা মিয়ার পরিবারের সকলেই আমেরিকায় স্থায়ী আবাস গড়তে পেরেছেন সেই মিসেস রওশন আরাকেই আল্লাহ ২০১৯ সালে এ দুনিয়া থেকে নিয়ে নেন । দুরারোগ্য ক্যান্সার তাকে পিতামাতা, স্বামী ফার্মাসিষ্ট রউফ, একমাত্র ছেলে রিয়াদ ও আদরের মেয়ে রোয়েনা (মিতুল), চার ভাই ও বোন আসমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। পিতা হয়ে নিজের বড় মেয়ের শয্যা পাশে থেকে তাকে চির বিদায় দেয়ার যে মর্মব্যথা সে শোকেই হবে হয়তো এই সংগ্রামী, আত্মপ্রত্যয়ী, কর্মী পুরুষটি মেয়ের ইন্তেকালের একবছরের মাথায় ৯৭ বছর বয়সে ইহকাল ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না এলাইহি রাজিউন)।

একটি পরিবারের, একজন পিতার এতসব কাহিনী বলার উদ্দেশ্য হলো একটি কথাই বাস্তব, পরিচিত উদাহরণ দিয়ে বলা যে পরিবার, সম্প্রদায় ও সমাজে নবজাগরণের আহবায়ক, কাণ্ডারি ও পরিবর্তনের রূপায়নে যারা শত বাধা বিপত্তি অবজ্ঞা করে প্রগতির স্রোতধারা প্রবহমান করতে সক্ষম হন তাঁরাই সত্যিকারের ভাল মানুষ, ব্যক্তি হিসেবে তাঁরাই সুজন। এদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন নেই তবে তারা বিভিন্ন নিরিখে স্বশিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত।

এসব সুজনরা পরিবর্তনের বীজ উপ্ত করেন যা কালক্রমে ফুলে- ফলে বিস্তৃত এলাকায় সুঘ্রাণ ছড়িয়ে দেয়; আলোকবর্তিকা হয়ে ছড়িয়ে পরে আশেপাশে, এমনকি দেশ দেশান্তরে। প্রয়াত হীরা মিয়া এমনি এক আলোকবর্তিকা ছিলেন, বিশেষত মেয়েদের শিক্ষায় আলোকিত করার সুমহান এবং গৌরবময় অথচ নাজুক ক্ষেত্রটিতে।

Posted ৭:২৭ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গল্প : দুই বোন
গল্প : দুই বোন

(1504 বার পঠিত)

স্মরণে যাতনা
স্মরণে যাতনা

(743 বার পঠিত)

মানব পাচার কেন
মানব পাচার কেন

(490 বার পঠিত)

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

85-59 168 Street, Jamaica, NY 11432

Tel: 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: weeklybangladesh@yahoo.com

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.