বাংলাদেশ রিপোর্ট : | বৃহস্পতিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২
ভারতে চরম হিন্দুত্ববাদীরা কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের সমর্থনে কট্টর হিন্দুরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সহিংসতা, এমনকি প্রয়োজনে মুসলিম গণহত্যার আহবান জানাচ্ছে এবং মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ সম্পর্কে নীরবতা পালন করছেন। ক’দিন আগে হরিদ্বারের পুলিশ প্রশাসন একটি মন্দিরে হিন্দু পুরোহিত ও সন্যাসীদের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করতে নিষেধ করেছেন। কারণ এর আগে সন্য্যাসীরা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ভারতে হিন্দুদের অন্যতম পবিত্র শহরে তারা “মুসলমানদের মধ্যে বিশ লাখকে হত্যা” করা, অর্থ্যাৎ মুসলিম গণহত্যা পরিচালনার প্রচার করেছিল। একই সঙ্গে তারা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের জাতিগত নির্মূলের আহ্বানও জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে জাতীয় ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। গেরুয়া বস্ত্রধারীরা উল্টো প্রশ্ন তুলে কোনো অফিসার বস্তুনিষ্ঠ হতে পারেন কিনা। চরম মুসলিম বিদ্বেষী সন্যাসী ইয়াতি নরসিংহানন্দ অফিসারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন যে, তিনি আমাদের পাশে থাকবেন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারী নিউইয়র্ক টাইমসে ভারতে সাম্প্রতিক মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারণা ও কর্মকান্ডের ওপর “অ্যাজ অফিসিয়ালস লুক অ্যাওয়ে, হেট স্পিচ ইন ইন্ডিয়া নিয়ারস ডেঞ্জারাস লেভেলস” শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয় যে, বিজেপি সরকারের ইন্ধনে প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত উগ্র হিন্দু সংগঠনগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের বিদ্বেষী বার্তাকে মূলধারায় নিয়ে যাচ্ছে এবং সাংবিধানিকভাবে নিরাপদ ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে পুরোপুরি হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার জন্য সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিচ্ছে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের উন্মাদনা জাগিয়ে তোলার মধ্য দিয়েছ। ভারতের সুশীল সমাজ এবং বিশ্লেষকরা বলছেন যে তাদের এজেন্ডাকে শুধু সক্রিয় করা নয় স্বাভাবিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতা এবং আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা এ ধরনের বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা বন্ধ করা, নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে বরং প্রকারান্তরে সমর্থন দিয়ে যান। হিন্দু কট্টরপন্থী পুরোহিত ও সাধু-সন্যাসীদের দ্বারা মুসলিম নিধনে অস্ত্র তুলে ধরার আহ্বান ভাইরাল হওয়ার পরে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার দলের শীর্ষ নেতারা চুপ ছিলেন। শুধু দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট সতর্ক করেন যে, একে অপরের বিরুদ্ধে মানুষকে উস্কানি দেওয়া জাতির বিরুদ্ধে অপরাধ।
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক রোহিন্টন ফালি নরিমান সম্প্রতি বলেছেন, ‘আপনার লোকজন বিদ্বেষাত্মক বক্তৃতা দিয়ে একটি সম্প্রদায়কে গণহত্যার আহ্বান জানাচ্ছেন, আর আমরা ও্ইসব লোকদের বিচার করতে কর্তৃপক্ষের অনিচ্ছা দেখতে পাচ্ছি। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে ক্ষমতাসীন দলের পদস্থ ব্যক্তিরা ঘৃণামূলক বক্তব্যের ব্যাপারে শুধু নীরব নন, তারা এসব বক্তব্য সমর্থন করছেন।
উল্লেখ্য এক উগ্রপন্থী হিন্দু সাধু নরসিংহানন্দকে অব্যাহতভাবে মুসলিম বিরোধী সহিংসতার উস্কানি দানের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং আদালতে তার আইনজীবী উত্তম সিং চৌহান বলেছেন যে, নিরসিংহানন্দের বক্তৃতা মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের হিন্দু-বিরোধী মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ার কারণে হতে পারে। নরসিংহানন্দ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধের আহবান জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু মোদির ক্ষমতাসীন বিজেপির কাছে মন্তব্যের অনুরোধ করা হলে তারা এড়িয়ে গেছেন। ওয়ার্ল্ড হিন্দু কাউন্সিলের মুখপাত্র বিনোদ বনসাল, যিনি মূখ্যত একটি হিন্দুত্ববাদী দলের সহযোগী, তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কি প্রতিটি ছোট, তুচ্ছ বিষয় সমাধানের প্রয়োজন আছে? অভিযুক্তদের ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। যেসব দল নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ দাবী করে তারা সবসময় এ ধরনের ঘটনাগুল্ েতুলে ধরবে, কিন্তু যখন হিন্দুরা ও হিন্দু দেবদেবী আক্রমণের শিকার হয় তখন তো তারা কোনো ভূমিকা গ্রহণ করে না।
উগ্র হিন্দুদের বিদ্বেষাত্মক বক্তৃতা-বিবৃতি এমন এক দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে যেখানে সামান্য একটু খোঁচা দিলেই তা গণমৃত্যুর মতো দু:খজনক ঘটনায় পর্যবসিত হতে পারে। সাধু-সন্ন্যাসীদের বক্তব্য ইতোমধ্যে উগ্র হিন্দু গ্রুপগুলোকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্ররোচিত করেছে। তারা গরুর জবাই করার অভিযোগ তুলে মুসলমানদের হত্যা করছে, বাড়িঘরে, রেস্টুরেন্টে গিয়ে মুসলমানদের উপর হামলা চালিয়েছে এবং মুসলিম ধর্মীয় সমাবেশে চড়াও হয়েছে। এমনকি মুসলমানদের হিন্দুতে পরিণত করার মত ঘটনাও ঘটছে। এসবে বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিব মানবাধিকার সংগঠনসহ স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী, ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর সাবেক প্রধানগণ হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে এ ধরনের উগ্র সহিংস কথাবার্তা এক বিপজ্জনক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, কিন্তু তা সত্বেও সরকার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে দ্বিধা করছে। এর ফলে ভারতের স্থানীয় সমস্যা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের রূপ নিতে পারে, যা দমন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
জেনোসাইড ওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা গ্রেগরি স্ট্যানটন, যিনি ১৯৯০-এর দশকে রুয়ান্ডায় গণহত্যার আগে অনুরূপ সতর্কতা উচ্চারণ করেছিলেন, তিনি আমেরিকান কংগ্রেসের এক শুনানিতে বলেন যে ভারতে গণহত্যার রূপ নিতে পারে এমন পৈশাচিক এবং বৈষম্যমূলক প্রক্রিয়া ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন যে কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুল তথ্য এবং ঘৃণামূলক বক্তব্যের সহজ প্রচার সহিংসতার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে তার দৃষ্টান্ত মিয়ানমার। তিনি বলেন, ভারতে পার্থক্য হল যে এক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর পরিবর্তে জনতা পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এ পরিস্থিতি রোধ করা না হলে উন্মত্ত জনতা যদি একবার বেড়ে উঠার সুযোগ পায় তাহলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।
Posted ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh