বাংলাদেশ অনলাইন : | সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫
ছবি : সংগৃহীত
দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট দেশ ব্রুনেই। আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম, মাত্র ৫ হাজার ৭৬৫ বর্গকিলোমিটার। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রুনেইয়ের জনসংখ্যা সাড়ে চার লাখের কিছু বেশি। একসময় ব্রিটেনের উপনিবেশ ছিল দেশটি। ১৯৮৪ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ব্রুনেই। স্বাধীন দেশ হিসেবে চার দশকের কম সময়ের যাত্রায় নিজেদের অর্থনীতিকে বেশ সমৃদ্ধ করেছে ব্রুনেই। জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানি দেশটির অর্থনীতির মূল ভিত্তি। দেশ ছোট হলে কী হবে, এখানেই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজপ্রাসাদ। এর বিস্তৃতি হার মানাবে বাকিংহাম প্রাসাদকেও।
ব্রুনাইয়ের সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়াহ মুইজ্জাদ্দিন ওয়াদ্দৌলাহ নিজের বসবাসের জন্য তৈরি করিয়েছেন বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ। কী নেই প্রাসাদের অন্দরে! সুলতান এই প্রাসাদের নাম দিয়েছেন ‘ইসতানা নুরুল ইমাম’।
এই প্রাসাদ যে শুধুমাত্র বসবাসের জন্যই ব্যবহার হয়, তা নয়। বিভিন্ন সরকারি কাজকর্মও হয় প্রাসাদের অভ্যন্তরে। প্রতি বছর প্রাসাদে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
সারা বছর প্রাসাদের ভিতর প্রবেশ করতে পারেন না সাধারণ মানুষ। কিন্তু যখন বার্ষিক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান চলে তখন তিন দিনের জন্য প্রাসাদের কিছু অংশ জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। আর রমজান মাসের শেষে এক উৎসব উপলক্ষে সাধারণ মানুষদের জন্য প্রাসাদের দরজা খুলে দেওয়া হয়।
প্রাসাদটি অবস্থিত ব্রুনাই নদীর তীরে, দেশের রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ানের কাছে। প্রাসাদের চারিদিক সবুজে ঘেরা।
বলকিয়াহের জন্য তৈরি করা এই প্রাসাদটি ২০ লাখ বর্গফুট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। তবে প্রাসাদটি আগাগোড়া সোনায় মোড়া নয়। প্রাসাদের চূড়া ২২ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি। পাশাপাশি কিছু সামগ্রী সোনা দিয়ে বানানো। প্রাসাদে ঘর রয়েছে ১৭৮৮টি। আর এর ভিতরে শৌচালয় রয়েছে ২৫৭টি। এই প্রাসাদের মধ্যে খাবার খাওয়ার একটি বিশাল ঘর রয়েছে। সেখানে নাকি একসঙ্গে পাঁচ হাজার অতিথি খাবার খেতে পারেন।
প্রাসাদের মধ্যেই রয়েছে মসজিদ। সেখানে একসঙ্গে দেড় হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারেন।
তথ্য বলছে, সুলতান বলকিয়াহ বিশ্বের সেরা ধনীদের মধ্যে অন্যতম। ২০০৮ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন অনুসারে তার সম্পত্তির পরিমাণ দুই হাজার কোটি ডলার। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পর তিনিই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে রাজত্ব করা সুলতান। ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর শাসনকালের ৫০ বছর পূর্তি উৎসব পালন করেন তিনি।
সুলতানের সম্পত্তির মূল উৎস খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস। তাই এ দেশের রাজার কাছে রয়েছে বিপুল টাকার সম্ভার। এর দরুন নিজের বসবাসের জন্য রাজপ্রাসাদের বেশির ভাগ অংশই সোনা দিয়ে বানিয়ে ফেলেছিলেন বলকিয়াহ।
রাজপ্রাসাদের ভিতর পোলো খেলার মাঠও রয়েছে। পোলো খেলা সুলতানের নেশা। তার রাজপ্রাসাদের ভিতর ২০০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আস্তাবল রয়েছে। প্রাসাদে ৫টি সুইমিং পুল রয়েছে। সুলতানের কাছে প্রায় ৭ হাজার গাড়ি রয়েছে। এই ৭ হাজার গাড়িই রাখা থাকে এই প্রাসাদের গ্যারাজে। মোট ১১০টি গ্যারাজ রয়েছে।
শুধু গাড়ি নয়, সুলতান হাসানাল বলকিয়াহর সংগ্রহে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির তৈরি একাধিক বিলাসবহুল ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ। এর মধ্যে ‘ফ্লায়িং প্যালেস’ নামে একটি উড়োজাহাজের কেবিন সোনায় মোড়ানো। এটি কিনতে সুলতান হাসানাল বলকিয়াহকে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার গুনতে হয়েছে। এমনকি নিজের মেয়ের জন্মদিনে তিনি একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ উপহার দিয়েছেন।
অভিজাত ও বিলাসী জীবন সুলতান হাসানাল বলকিয়াহর। একসময় পশ্চিমা রীতিনীতি মেনে চলতেন। তরুণ বয়সে তাকে ‘প্লেবয়’ ডাকতেন অনেকেই। ব্যক্তিগত জীবনে তিনজন স্ত্রী রয়েছে তার। দুজনের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে। তার পাঁচ ছেলে ও সাত মেয়ে। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে তার প্রিয় একজন নাপিত আছেন। প্রতিবার চুল কাটাতে সেই নাপিতকে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ পাঠিয়ে ব্রুনেইয়ে উড়িয়ে আনা হয়। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সুলতান হাসানাল বলকিয়াহর একবার চুল কাটাতে খরচ হয় ২০ হাজার মার্কিন ডলার। দামি চিত্রকর্ম সংগ্রহ করার ঝোঁক রয়েছে সুলতানের।
ব্রুনাইয়ের প্রাসাদের অন্দরসজ্জা একেবারে নজরকাড়া। এর নকশা বানিয়েছিলেন লিয়ান্ড্রো ভি লকসিন। ইসলাম এবং মালয় দুই রকম ঐতিহ্যের ছাপই রয়েছে এই সোনার প্রাসাদে। প্রাসাদের অভ্যন্তর সাজানো সোনা, মার্বেল এবং ঝাড়বাতিসহ বিলাসবহুল উপকরণ দিয়ে।
বলকিয়াহ রাজপরিবারে আরও একটি প্রাসাদ রয়েছে। তার নাম হাউস অব বলকিয়াহ। চতুর্দশ শতকে এই প্রাসাদ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু তখন রাজপ্রাসাদের নাম হাউস অব বলকিয়াহ ছিল না। ঠিক কবে থেকে এমন নামকরণ হয়েছে তা স্পষ্ট নয় ইতিহাসবিদদের কাছে। যদিও ইসতানা নুরুল ইমাম প্রাসাদ তৈরির পর হাউস অব বলকিয়াহের জৌলুস অনেকটাই কমে গেছে।
Posted ১১:০১ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh