বাংলাদেশ অনলাইন : | বুধবার, ২৫ জুন ২০২৫
পুরোনো ছবি
ভারতের ত্রিপুরায় আক্কাসুর রহমান প্রায় এক বছর আগে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যান। দুদিন আগে আক্কাসের পরিবারসহ ১২ রোহিঙ্গাকে মৌলভীবাজারের কুমারশাইল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশি বলে পুশইন করে ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী (বিএসএফ)। তাছাড়া চারজন বাংলাদেশিকেও একই সময় ঠেলে পাঠানো হয়। এর আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশি নাগরিক আখ্যা দিয়ে পুশইন করেছে ভারত।
গত তিন মাসে দেড় হাজারের বেশি নারী-পুরুষ ও শিশুকে পুশইন করা হয়েছে। তার মধ্যে একশর বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছে বলে পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মিয়ানমার থেকে এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা ভারতের বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে গেছে বলে তথ্য এসেছে।
জানা গেছে, পুশইন বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশের শান্ত পরিবেশকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে প্রতিবেশী দেশটি। বাংলাদেশ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, আলোচনা ছাড়া কাউকে পুশইন না করাতে। কিন্তু এসব অনুরোধ পাত্তাই দিচ্ছে না তারা। তাছাড়া উত্তপ্তের শঙ্কার পেছনে কাজ করছে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতারা। ইতিমধ্যে একটি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছে, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা বড় ধরনের নাশকতা চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি গভীর উদ্বেগের বিষয়। এটি চূড়ান্তভাবে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলছে। এভাবে চলতে থাকলে ভারত পুশইনের সুযোগ নিয়ে কোনো বড় অপরাধীকেও পাঠাতে পারে। বাংলাদেশও ভারতে পুশব্যাক করার চিন্তা করতে পারে এখন। বাংলাদেশে অনেক ভারতীয় নাগরিক আছেন, যাদের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। তাদের বিষয়ে নজরদারির আওতায় আনতে হবে দ্রুত সময়ে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার না পাঠিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো নিয়ে রহস্য সৃষ্টি হচ্ছে। এতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা থাকবেই।
বন্ধই হচ্ছে না অপতৎপরতা: সংশ্লিষ্টরা জানায়, দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইনের কারণে উদ্বেগ বেড়েই চলছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থানের পরও গভীর রাতে বিএসএফ অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে। পুশইনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশ ও বিজিবিকে। ভারত থেকে পুশব্যাক করা রোহিঙ্গা থাকায় বেশি উদ্ধেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আইনও মানছেন না তারা। পুশইন বন্ধ করতে সরকার নানা চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের সীমান্ত এলাকা দিয়ে পুশইন করা হচ্ছে। গত ৭ মে থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশের খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, কুমিল্লা, ফেনী, ঝিনাইদহ ও মেহেরপুরসহ আরও কয়েকটি জেলার সীমান্ত দিয়ে দেড় হাজারের বেশি পুশইন করা হয়েছে। এমনকি সুন্দরবনের গহিন অরণ্যের মান্দারবাড়িয়া এলাকা দিয়েও শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুকে পুশইন করা হয়েছে।
যেসব সীমান্তে পুশইন করা হয়েছে বেশি: পুলিশ ও বিজিবির তথ্যানুযায়ী, খাগড়াছড়ি সীমান্ত দিয়ে ২১২, কুড়িগ্রাম সীমান্তে ১৮৪, সিলেটে ১০৩, মৌলভীবাজারে ৪৩১, হবিগঞ্জে ৫২, সুনামগঞ্জে ৬৫, দিনাজপুরে ১২, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪২, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৯, পঞ্চগড়ে ৩২, লালমনিরহাটে ১৭৫, চুয়াডাঙ্গায় ১৯, ঝিনাইদহে ৪২, কুমিল্লায় ৩৩, ফেনীতে ৭৯, সাতক্ষীরায় ৫৩ এবং মেহেরপুরে ৩০ জনকে ঠেলে দিয়েছে বিএসএফ।
এ প্রসঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা বলেন, পতাকা বৈঠক এবং কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে বারবার প্রতিবাদ জানিয়েও লাভ হচ্ছে না। বিএসএফ এবং অন্যান্য ভারতীয় সংস্থার দ্বারা ঠেলে দেওয়ার ঘটনা দুঃখজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। পুশইনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আমরা উচ্চ সতর্কতায় আছি। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাদের মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশি নাগরিক আছে, যারা বহু বছর ধরে ভারতে বসবাস করে আসছে। ওই কর্মকর্তারা উদ্বেগ জানিয়ে আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের’ পাঠানো নিয়ে আমাদের ভয় বেশি হচ্ছে। তারা দেশের শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করার পাঁয়তারা করছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তবে এর পেছনে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের ইন্ধন আছে।
ভিনদেশিদের বিষয়ে ভারতে আইন যা বলা আছে: ভারতীয় আইন অনুযায়ী, বিদেশ থেকে কেউ যদি পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া ভারতে আসেন, তাহলে তাকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হয়। এরপর বিদেশি আইনের ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী মামলা হয়। মামলায় যদি সেই ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার সাজা হবে। সাজার শেষে আদালতের মাধ্যমেই যেই ব্যক্তি যে দেশ থেকে এসেছেন, সেখানে ফেরত পাঠানো হবে। কিন্তু এসব কিছুর তোয়াক্কা না করে পুশইনের অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেই চলেছে বিএসএফ।
হঠাৎ মৌলভীবাজারে ১২ রোহিঙ্গা: দুদিন আগে মৌলভীবাজারের বড়লেখার কুমারসাইল সীমান্ত দিয়ে ১২ রোহিঙ্গাসহ ১৬ জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দিয়েছে বিএসএফ। সীমান্তের জিরো লাইনে এনেই পুশইন করে বসে। ওইদিন সকালে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় বিজিবি তাদের আটক করে।
নদীতেও ফেলে দেওয়া হচ্ছে লোকজনকে: পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪১ বছর বয়সী সেলিনা বেগম জানান, ২২ মে খাগড়াছড়ির রামগড়ে ফেনী নদীতে ফেলে দেয় বিএসএফ। উদ্ধারের আগে তিনি এবং তার স্বামীসহ তিন মেয়ে সারারাত পানিতে ভেসেছিলেন। তাদের সঙ্গে শুধু ছিল খালি প্লাস্টিকের বোতল। এটি ধরে কোনোরকম জীবন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেছে ভারত। তারা বৈধভাবেই ভারতে গিয়েছিলেন। তারা তাদের তিন দিন ধরে খাবার ও পানি ছাড়া আটকে রেখেছিল। তারপর সীমান্তে নিয়ে যায়। সেলিনা বেগম আরও বলেন, ‘আমার বাচ্চারা জানত না কী ঘটছে। আমরা সারারাত ভেসেছিলাম। আমাদের কেউই সাঁতার জানতাম না। স্বামী উম্মেদ আলী (৪৭) এবং তিন মেয়ে রুমি খাতুন (১৬), রুম্পা খাতুন (১৫) ও সুমাইয়া খাতুনকে (৬) নিয়ে হরিয়ানা এলাকায় বসবাস করে আসছিলাম। একটি কারখানায় আমরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করি। হঠাৎ করেই ভারতের লোকজন আমাদের আটক করে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে আসে। হরিয়ানাসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে অন্তত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আছে। তারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে ভারত চলে যায়। তাদেরও ধরে ধরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। প্রায় ১০ বছর ভারতে ছিলাম।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা যা বললেন: নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেছেন, সম্পর্কে চিড় ধরায় বাংলাদেশকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে ‘পুশইন’ তৎপরতা চালাচ্ছে ভারত। এই অবস্থায় পুশইন হওয়াদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন, তাদের গ্রহণ করা ছাড়া উপায় নেই। তবে অধিকাংশের কাছে কোনো তথ্য-প্রমাণ না থাকায় একটি জটিলতা তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে যাদের পুশইন করা হয়েছে তাদের কেউ ভারতীয় নাগরিক হলে বাংলাদেশও পুশব্যাক করবে।
আওয়ামী লীগ নেতাদের ইন্ধনের তথ্য: পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারা গোপনে মিটিং ও মিছিল সমাবেশ করার পাঁয়তারা করছেন। বিশেষ করে ভারতকে দিয়ে পুশইন করাচ্ছেন তারা। এমনকি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে ভারতে যাওয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পাঁয়তারা চলছে। তাদের বিষয়ে সতর্ক না হলে সামনের দিনগুলোতে অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা আছে। প্রতিবেদনটি সরকারের হাইকমান্ডের কাছে পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুশইন বন্ধ করতে ভারতের কাছে চিঠি: পুশইন বেড়ে যাওয়ায় গত ৯ মে ভারত সরকারে কাছে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ। চিঠিতে বলা হয়, কোনো ব্যক্তির বাংলাদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর বিদ্যমান প্রক্রিয়া মেনে বাংলাদেশ তাদের ফেরত নেবে। এর ব্যত্যয় হলে দুই দেশের বোঝাপড়ার মধ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। একইভাবে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশের পরিবর্তে তাদের আদি নিবাস মিয়ানমারেই ফেরত পাঠানো উচিত ভারতের। কোনোভাবে ভারতীয় নাগরিকদের জোর করে বাংলাদেশে পুশইন করাটা উচিত হবে না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে এ ধরনের পুশইন অগ্রহণযোগ্য এবং তা পরিহার করা উচিত। সূত্র : দেশ রূপান্তর
Posted ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৫ জুন ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh