রবিবার, ৭ জুন ২০২৬ | ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

দেশে বাজারের উত্তাপে মধ্যবিত্তের সংসার চালানোই দায়

বাংলাদেশ অনলাইন :   |   রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬

দেশে বাজারের উত্তাপে মধ্যবিত্তের সংসার চালানোই দায়

ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

ঢাকার মোহাম্মদপুরে বছিলায় সপরিবারে থাকেন নুর আলম। পরিবারের সদস্য চারজন। তিনি চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে গত মঙ্গলবার কারওয়ান বাজারে কিচেন মাকের্টে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি জানান, তাঁর মাসিক বেতন ৪৫ হাজার টাকা। গত দুই বছরে এক টাকাও বাড়েনি।

অথচ গত তিন মাসে বেশির ভাগ পণ্যের দাম বেড়েছে। বছিলায় তাঁর দুই রুমের ফ্ল্যাট ভাড়া ও ইউটিলিটি বিল বাবদ চলে যায় ২০ হাজার টাকা। দুই সন্তানের স্কুলের বেতন আর যাতায়াত খরচ সাত হাজার টাকা এবং তাঁর অফিসের যাতায়াত বাবদ তিন হাজার টাকা বাদ দিলে পুরো মাসের খাবার কেনার জন্য থাকে মাত্র ১৫ হাজার টাকা।

কিছুটা কম দামে পণ্য কেনার জন্য নুর আলম প্রায়ই ভোরে বছিলা থেকে চলে আসেন কারওয়ান বাজার। কিন্তু এখানে আর আগের মতো কম দামে পণ্য কিনতে পারছেন না। ঢ্যাঁড়শসহ দু-তিনটা ছাড়া বেশির ভাগ সবজির দামই ৬০ থেকে ৮০ টাকার ঘরে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, আদাসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বাড়তি। তিন মাসে কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে মোটা মসুর ডালের দাম হয়েছে ১০৫ টাকা। তুলনামূলক ভালো ডাল খেতে হলে কেজিতে খরচ হয় ১৩০ থেকে ১৮০ টাকা। এক কেজি ব্রয়লার মুরগি কিনতে গেলেই দাম পড়ছে ১৭৫ থেকে ১৯০ টাকা। মাস চারেক আগেও ব্রয়লার কেনা গেছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়। এক মাসে ভোজ্যতেলের লিটারে বেড়েছে অন্তত ১৫ টাকা। এভাবে অতি প্রয়োজনীয় ডিম, চিনি ও আদার দামও বাড়ছে।

নুর আলম জানান, চাকরির বাইরে তাঁর আর কোনো আয়ের উৎস নেই। বেতনের টাকায় এখন চারজনের ভরপেট খাওয়া সম্ভব হয় না। প্রতি মাসে তাঁর ঘাটতি থাকছে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা। গত সপ্তাহে তাঁর আট বছরের সন্তান হামে আক্রান্ত হয়। চিকিৎসা বাবদ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এই বাড়তি টাকার জোগান ছিল না। ওষুধ কিনতে গিয়ে ওই সপ্তাহে তাঁর পরিবারের খাদ্য তালিকায় কাটছাঁট করতে হয়। মাছ বা ফল কেনা তো দূরের কথা, দুধ কেনাও বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

আক্ষেপ করে নুর আলম বলেন, ‘জ্বর বা শরীর খারাপ হলে এখন আমরা ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সাহস পাই না, ফার্মেসি থেকে সস্তা প্যারাসিটামল খেয়ে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করি।’

মাসের পর মাস ঘাটতি মেটাতে গিয়ে নুর আলম গত কয়েক বছরে কষ্টে জমানো ডিপিএসের দুই লাখ টাকা ভেঙে ফেলেছেন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ বা কোনো জরুরি আপদ-বিপদের জন্য রাখা শেষ সম্বলটুকু এখন শূন্য। তিনি লোকলজ্জার ভয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের মতো টিসিবির ট্রাকের পেছনে লাইনেও দাঁড়াতে পারছেন না, আবার বাজারে গিয়ে ব্যাগভর্তি সদাই কিনতে পারছেন না। শুধু নুর আলমের নয়, তাঁর মতো মধ্য আয়ের অসংখ্য মানুষের জীবনসংগ্রামের চিত্র এটি।

বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন পার হয়েছে। এই স্বল্প সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের নানা উদ্যোগ দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা–নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নির্দিষ্ট আয়ের ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্যের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির কশাঘাত

মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে সাধারণ মানুষের এই কষ্টের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও গত ১০০ দিনে সুফল মেলেনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ হলেও পরের মাস এপ্রিলে তা আবার বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে। যদিও এই মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কিছু কারণ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং দেশে জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ১৬ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে পরিবহন, উৎপাদন, সেচ ও বিতরণ খরচ একলাফে অনেক বেড়ে গেছে–যা সরাসরি পণ্যের দামে প্রভাব ফেলেছে।

আরও চাপ বাড়াবে বিদ্যুৎ

এলপিজি সিলিন্ডারের উচ্চমূল্যের ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন করে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে শুধু ঘরের লাইট-ফ্যান নয়, বরং নাশতার টেবিল থেকে শুরু করে বাজারের ব্যাগ– সবকিছুর খরচ বাড়বে। নির্দিষ্ট আয়ের ও মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রায় অতিরিক্ত চাপ পড়বে। কারণ, এই মূল্যবৃদ্ধি একটি চেইন রিঅ্যাকশন সৃষ্টি করবে। উৎপাদকরা লোকসান কমাতে সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দাম বাড়িয়ে উশুল করবেন। ফলে চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে জামাকাপড়, সাবান– সবকিছুর দাম আরেক দফা বাড়বে। স্বল্প আয়ের লোকজন এ শঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

গত বুধবার বিকেলে আগারগাঁও কাঁচাবাজারে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী মাহবুবুল হাসানের সঙ্গে। বিদ্যুতের দাম বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ঘাড়ে খরচের চাপটা আরও বাড়ল। বাসায় বিদ্যুৎ বিল আসে দুই হাজার টাকার মতো। এখন অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি লাগবে।’ এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম বেশি। এখন ব্যবসায়ীরা আরেক দফা দাম বাড়ানোর সুযোগ নেবেন।’

বেসরকারি ব্যাংকে চাকরিরত শাহ আলম এসি কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। গত বুধবার তেজতুরি বাজারে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে অনেক গরম পড়েছে। ভেবেছিলাম আগামী মাসে বেতন পেলে বাসার জন্য একটি এসি কিনব। এখন সেই চিন্তা বাদ দিয়েছি। সামনের দিনে ফ্যানও হিসাব করে চালাতে হবে।’

বাজার সিন্ডিকেট ও চ্যালেঞ্জ

নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দ্রব্যমূল্য নাগালের মধ্যে আনা। সরকার রাষ্ট্রীয় কৌশলগত মজুত বাড়ানো, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর মতো নানামুখী উদ্যোগ নিলেও খুচরা বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব নেই। অসাধু ব্যবসায়ী, পাইকারি বাজারের মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে।

বাজার তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টাস্কফোর্স এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান চললেও তা কেবল খুচরা পর্যায়ে জরিমানা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। করপোরেট জায়ান্ট ও বড় পাইকারদের সিন্ডিকেটের মূলে হাত দিতে না পারায় বাজারে এর স্থায়ী কোনো প্রভাব পড়ছে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মহাসড়ক ও পাইকারি বাজারগুলোতে শুধু চাঁদাবাজদের হাতবদল হয়েছে কিন্তু চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে পণ্যের পরিবহন খরচ কমেনি। ডলার সংকটে অনেক ছোট আমদানিকারক সময়মতো ঋণপত্র খুলতে না পারার সুযোগ নিয়ে বড় আমদানিকারকরা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়েছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠোর হতে হবে

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভগ্ন অর্থনৈতিক কাঠামো, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রিজার্ভ সংকটের কারণে রাতারাতি বাজার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। কেবল খুচরা বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করে লাভ হবে না। কারওয়ান বাজার, খাতুনগঞ্জ বা মৌলভীবাজারের মতো বড় পাইকারি আড়ত এবং কোম্পানিগুলোর আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, টিসিবি এবং ওএমএস কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়াতে হবে। অথচ সরকার সেসব দিকে নজর না দিয়ে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়াল। কিন্তু এসব সেবার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত লুটপাট হচ্ছে, চুরি হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। সরকার সেগুলো বন্ধ না করে উল্টো পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের খরচের বোঝা আরও বড় হবে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘সরকার দেশে জ্বালানি তেলের দাম দুই দফায় বাড়িয়েছে। তিন দফায় এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানোর পর কিছুটা কমালেও তা তুলনামূলক বেশি। এখন আবার বিদ্যুতের দাম বাড়াল। এসব ইউটিলিটির দাম বাড়ার বড় প্রভাব পড়ছে জনজীবনে।’ তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট হচ্ছে। এখনও পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি রয়েছে। এসব সেবার দাম না বাড়িয়ে বরং লুটপাট, চুরি, চাঁদাবাজি বন্ধ করা দরকার।’

সফিকুজ্জামান আরও বলেন, সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বাড়াতে বিভিন্ন কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করলেও কম আয়ের মানুষের ওপর খরচের চাপ তেমন কমেনি। কারণ, দুর্বল বাজার তদারকি ব্যবস্থাপনায় নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা, বিনিময় হারের চাপ এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিয়েছে। এর ফলে বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র, ক্ষুদ্র কৃষক ও দিনমজুরদের ওপর চাপ স্পষ্ট হচ্ছে।

Posted ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

কাঁঠাল সমাচার

(2232 বার পঠিত)

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.