আল–জাজিরা : | বুধবার, ২০ মে ২০২৬
বিমানবন্দরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে স্বাগত জানান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। বেইজিং, চীন; ১৯ মে ২০২৬। ছবি : এএফপি
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মঙ্গলবার রাতে বেইজিংয়ে পৌঁছান। এরপর তাঁর মূল আনুষ্ঠানিকতা হবে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ২৫ বছরের পুরোনো একটি চুক্তির স্মরণোৎসবে যোগ দেওয়া। চুক্তিটি মূলত ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’ নামে পরিচিত।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বুধবার সকালে সি–পুতিনের বৈঠকের গুরুত্ব অনেক বেশি। একই সঙ্গে এ সফরের সময়টাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। গত সপ্তাহে চীনে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প বেইজিং ছাড়ার মাত্র এক দিন পরই পুতিনের এ সফরের ঘোষণা আসে।
ট্রাম্প বৃহত্তর বাণিজ্যচুক্তির কথা ফলাও করে বললেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যুগুলোয় উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়েছে—এমন কোনো ইঙ্গিত নেই বললেই চলে। এসব বিতর্কিত ইস্যুর মধ্যে রয়েছে তাইওয়ান এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সময়টা পুতিনের জন্য বেশ সুবিধাজনক। তিনি এ আত্মবিশ্বাস নিয়েই বেইজিং সফরে যেতে পারছেন যে রাশিয়াকে পাশ কাটানোর কোনো পরিকল্পনা চীনের নেই।
অন্যদিকে বেইজিংয়ের কাছে পরপর এ সফরগুলো হলো তাদের ক্রমবর্ধমান সুবিধাজনক কূটনৈতিক অবস্থানের বড় প্রদর্শনী। এ কূটনৈতিক সুবিধা চীনকে এমন এক কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে, যেখানে সম্পূর্ণ নিজেদের মতো করে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে সক্ষম।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘বেপরোয়া’ হিসেবে দেখার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পুতিন–সি একটি দৃঢ় অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছেন। আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের এবারের সফরে এ ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ সফরের সময়কালই স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ক্রমে বিভক্ত হয়ে পড়া বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে বেইজিং কীভাবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে।
‘সির চেয়ে পুতিনের এটা বেশি প্রয়োজন’
চীনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা সত্ত্বেও পুতিনের এ সফর থেকে বড় ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আশা করা হচ্ছে না; বরং এটি তাদের কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা অধ্যয়ন বিষয়ের পোস্ট ডক্টরাল গবেষক মেরিনা মিরন আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমার মনে হয় না এখানে বড় কোনো পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।’
মেরিনা আরও বলেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামরিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান এবং এ রকম বিষয়গুলোয় তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর হতে যাচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ রাশিয়া–বিষয়ক বিশ্লেষক ওলেগ ইগনাতভও একই কথা বলছেন। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এই দুই দেশের সম্পর্ক মূলত কৌশলগত। তারা অংশীদার, কৌশলগত অংশীদার হলেও সামরিক মিত্র নয়। আর আমি মনে করি না যে তারা এর চেয়ে বেশি দূর এগোবে।’
ইগনাতভ আরও বলেন, রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক খুব স্থিতিশীল এবং দুই দেশের জন্যই তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক বিষয় নেই।
দুই দেশই যৌথ প্রকল্পগুলো, বিশেষ করে জ্বালানি খাতের কাজগুলো এগিয়ে নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
গবেষক মেরিনা মিরন বলেন, চীন রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদ ‘ছাড়ে’ পেতে চায়। অন্যদিকে রাশিয়া ড্রোন উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহারযোগ্য চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
তারপরও এ বৈঠক পুতিনের জন্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চ্যাথাম হাউসের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া কর্মসূচির ফেলো টিমোথি অ্যাশ আল–জাজিরাকে বলেন, সির চেয়ে পুতিনেরই এটা বেশি দরকার। ইউক্রেনে পুতিনের ভয়াবহ যুদ্ধের পর রাশিয়া এখন ছোট ও নির্ভরশীল অংশীদারে পরিণত হয়েছে। পুতিন হয়তো চীনের কাছ থেকে আরও বেশি সামরিক সহায়তার আশায় আছেন।
টিমোথি অ্যাশ আরও বলেন, ট্রাম্প যেমনটা কিছু পাওয়ার আশায় বেইজিংয়ে গিয়েছিলেন, পুতিনও ঠিক সে জন্যই যাবেন। সব কার্ডই এখন চীনের হাতে।
তবে ক্রাইসিস গ্রুপের ইগনাতভ এ সম্পর্ককে শুধু ক্ষমতার অবস্থানগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, দেশ দুটির এমন আচরণের মূল কারণ হলো, তারা মূলত একটি বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
ইগনাতভ বলেন, ‘উভয় পক্ষই বলে যে…তারা একটি বহুমেরুর বিশ্ব গড়তে যাচ্ছে। তাই তারা মনে করে না যে বিশ্বে এমন কোনো একক প্রভাবশালী শক্তি থাকা উচিত, যারা অন্য দেশগুলোকে কিছু করতে বাধ্য করবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি তারা এই (এক মেরুর) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না।’
যুদ্ধের পটভূমিতে ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’
তবে পরপর শীর্ষ নেতাদের এসব সফরকে যে বিষয় এত তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে, সেটা হলো এসব সফর বেইজিংয়ের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রভাবকেই তুলে ধরছে। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, চীন নিজেকে একটি ক্রমবর্ধমান বিভক্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
গবেষক মেরিনা মিরন বলেন, চীন নিজেদের একজন মধ্যস্থতাকারী এবং একধরনের নিরপেক্ষ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে এবং তা কোনো ধরনের বৈরিতা ছাড়াই। তিনি আরও বলেন, চীন রাশিয়ার অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও অন্তত প্রকাশ্যে তারা কোনো পরাশক্তির পক্ষ না নেওয়ার চেষ্টা করছে।
মেরিনা বলেন, কূটনৈতিক অঙ্গনে তারা (চীন) একধরনের ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’ হিসেবে নিজেদের নিরপেক্ষতা তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, এ সফরের ওপর ছায়া ফেলছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ। এ সংঘাত হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব রাশিয়ার চেয়ে চীনের অর্থনীতিতে অনেক বেশি।
প্রতিরক্ষাবিষয়ক এই গবেষক বলেন, উপসাগরীয় জ্বালানি প্রতিযোগীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ায় রাশিয়া স্বল্প মেয়াদে এ বিশৃঙ্খলা (জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া) থেকে লাভবান হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকেরা একমত যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা রাশিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশই এ সংঘাতের অবসান দেখতে চায়। যদিও তারা ইরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রযুক্তি বিনিময় করেছে।
চ্যাথাম হাউসের টিমোথি অ্যাশ উল্লেখ করেন, ট্রাম্প-সির বৈঠক যেটা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাতে মস্কো মনে মনে বেশ খুশিই হয়েছে। তিনি বলেন, ট্রাম্প যা চেয়েছিলেন, চীন তাকে তা দেয়নি, সেটি হলো ইরান যুদ্ধের অবসান। এ ক্ষেত্রে বেইজিং যে তেহরান বা মস্কোকে ছেড়ে যাচ্ছে না, এতেই মস্কো সন্তুষ্ট থাকবে।
এ সফরে ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়টিও প্রায় নিশ্চিতভাবে আলোচনায় আসবে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন না যে চীন এ বিষয়ে মস্কোকে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তের জন্য চাপ দেবে।
গবেষক মেরিনা মিরন বলেন, ইউক্রেন নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। চীন নিশ্চিতভাবেই বলবে যে তারা মধ্যস্থতা এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার পক্ষে। তিনি বলেন, ‘তবে চীন কোনোভাবেই চায় না রাশিয়া অপমানিত হোক। আমার মনে হয় না, চীন এ বিষয়ে রাশিয়াকে কোনো ধরনের সময়সীমা বেঁধে দেবে।’
হয়তো এ সফর থেকে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো কূটনৈতিক সাফল্য হয়তো আসবে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে, একদিন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এবং এর ঠিক পরেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে আতিথেয়তা দিয়ে বেইজিং প্রমাণ করেছে যে তাদের উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
Posted ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২০ মে ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh