বাংলাদেশ অনলাইন ডেস্ক : | রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
এআই দ্বারা নির্মিত ছবি
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা বাংলাদেশেও স্পষ্ট হচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় এবং গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানা ও সারের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন ব্যয়, কৃষি, নিত্যপণ্যের দাম ও মানুষের আয়-রোজগারে। এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষের চাকরি ঝুঁঁকিতে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে দারিদ্র্য কমানোর যে অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল, সেটাও বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। সম্প্রতি এপ্রিলের বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি এবং পরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা প্রকল্পের প্রস্তুতি-সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে এসব ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এই আশঙ্কার কিছু লক্ষণ এরই মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস-সংযোগ না পাওয়া, কোথাও কাজের সময় কমে যাওয়া এবং জ্বালানি সংকটে কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটছে।
এটিই এখন বাস্তবতা; বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন সে বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ এমন সময়ে এই সংকটের মুখে পড়েছে, যখন অর্থনীতি আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, কম বিনিয়োগ ও সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার চাপে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবেন। এখন বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, সেই সংখ্যা নেমে আসতে পারে প্রায় ৫ লাখে। অর্থাৎ আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হারাতে পারেন। মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পণ্যের দাম বাড়াও দারিদ্র্যের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। জ্বালানির বাড়তি দাম আংশিকভাবে ভোক্তার ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। এরপর পরিবহন, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ার দ্বিতীয় দফার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।
বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকির একটি জায়গা জ্বালানি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। দেশে গ্যাসের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের বেশিও আমদানি করা এলএনজি দিয়ে মেটানো হয়। সংঘাতের কারণে এলএনজি সরবরাহেও বড় বিঘ্ন ঘটেছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিতে সরবরাহকারী পক্ষ ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে।
সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও : বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর আবাদি জমিতে প্রায় ৩৯২ কেজি সার ব্যবহার হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণের বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সার সরবরাহ ও দামের অস্থিরতা বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। দেশে ইউরিয়া উৎপাদনের জন্যও নিয়মিত গ্যাস প্রয়োজন। গ্যাস সরবরাহে চাপের কারণে মার্চের শুরুতে দেশের ছয়টি বড় ইউরিয়া কারখানার মধ্যে পাঁচটির উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছিল। পরে গ্যাস পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলে কয়েকটি কারখানা আবার উৎপাদনে ফেরে।
চাপ রয়েছে স্বাস্থ্য খাতেও : বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উচ্চ ব্যয় প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬ হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের খরচ বাড়াচ্ছে। ওষুধশিল্পও এ চাপের বাইরে নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠান ওষুধ তৈরির সক্রিয় কাঁচামালসহ বিভিন্ন উপকরণের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালের ৯০ শতাংশের বেশি ব্যবহার্য চিকিৎসাসামগ্রীও আমদানি করা হয়। ফলে পরিবহন ও জ্বালানির খরচ বাড়লে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও বাড়ে।
Posted ২:৫৮ অপরাহ্ণ | রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh