Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

বেলজিয়ামে মুসলিম নারীদের সংগ্রামের গল্প

বাংলাদেশ ডেস্ক :   |   সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

বেলজিয়ামে মুসলিম নারীদের সংগ্রামের গল্প

হিজাব ইসলামে কেবল একটি পোশাকের নাম নয়; এটি একজন মুসলিম নারীর ইবাদত, শালীনতা, আত্মমর্যাদা ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক। পৃথিবীর অনেক দেশে মুসলিম নারীরা স্বাধীনভাবে হিজাব পরিধান করলেও ইউরোপের কিছু দেশে এ অধিকারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বিতর্ক। বেলজিয়াম তার অন্যতম উদাহরণ। সেখানে জাতীয়ভাবে হিজাব নিষিদ্ধ না হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার কারণে অনেক মুসলিম নারী বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন। তবুও তারা আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সংগ্রাম কেবল একটি পোশাকের জন্য নয়; বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমঅধিকার এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম।

বেলজিয়ামে হিজাবের বর্তমান বাস্তবতা

বেলজিয়ামে জাতীয় পর্যায়ে হিজাব নিষিদ্ধ নয়। তবে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং কিছু সরকারি দপ্তরে ‘নিরপেক্ষতা’ (Neutrality) নীতির আওতায় দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।

দেশটিতে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মুসলিম বসবাস করেন। রাজধানী ব্রাসেলসসহ বিভিন্ন শহরে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকলেও হিজাব পরিধানকারী অনেক নারী শিক্ষা, চাকরি এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।

‘নিরপেক্ষতা’ নীতি ও বিতর্ক

বেলজিয়ামের কিছু প্রতিষ্ঠান মনে করে, কর্মক্ষেত্রে দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক না থাকাই নিরপেক্ষতার পরিচয়। তাই তারা হিজাবসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করে। তবে মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশের মতে, প্রকৃত নিরপেক্ষতা মানে কোনো নাগরিককে তার ধর্মীয় পরিচয় ত্যাগে বাধ্য করা নয়; বরং সকল ধর্মাবলম্বীর প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করা। একজন নারীর হিজাব তার যোগ্যতা, দক্ষতা বা পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

আদালতের লড়াই: সমীরা আছবিতা মামলা

বেলজিয়ামে হিজাব বিতর্কের অন্যতম আলোচিত ঘটনা সমীরা আছবিতা বনাম G4S (Achbita v G4S) মামলা। হিজাব পরিধানের কারণে চাকরি হারানোর পর সমীরা আছবিতা আদালতের দ্বারস্থ হন। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় বিচার আদালতে (ECJ) গড়ায়। আদালত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরপেক্ষতা নীতিকে বৈধ বলে মত দিলেও, এই মামলা ইউরোপজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে এবং মুসলিম নারীদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে।

‘আমাকে পড়তে দাও’—শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন

২০২০ সালে বেলজিয়ামের সাংবিধানিক আদালতের এক রায়ের পর বহু মুসলিম ছাত্রী #LaisseMoiEtudier (আমাকে পড়তে দাও) হ্যাশট্যাগে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করেন। ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে শত শত শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মী অংশ নেন। একই সময়ে #HijabisFightBack প্রচারণাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এই আন্দোলনের ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতা, শিক্ষা গ্রহণের অধিকার এবং বৈষম্যবিরোধী নীতিমালা নিয়ে দেশব্যাপী নতুন আলোচনা শুরু হয়।

ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস

দীর্ঘদিনের সংলাপ, আইনি লড়াই এবং সচেতনতার ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। ব্রাসেলস, ঘেন্টসহ কয়েকটি স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি প্রতিষ্ঠান হিজাবসংক্রান্ত নীতিমালা পুনর্বিবেচনা বা শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।

হিজাব সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا

‘আর আপনি মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশ পায় তা ছাড়া।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ

‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তারা সহজে পরিচিত হবে এবং হয়রানির শিকার হবে না।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৫৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

الْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيمَانِ

‘লজ্জাশীলতা (শালীনতা) ঈমানের একটি শাখা।’ (বুখারি ৯, মুসলিম ৩৫)

সমস্যা সমাধানে করণীয়

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সমান শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা প্রণয়ন করা।
বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে শিক্ষা ও সংলাপের আয়োজন করা।
মুসলিম নারীদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তা প্রদান করা।
ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিদ্বেষ, বৈষম্য ও হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
মুসলিম সমাজের উচিত ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও আইনসম্মত উপায়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা রাখা।

বেলজিয়ামে হিজাবকে ঘিরে চলমান আলোচনা ও সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় স্বাধীনতা কেবল একটি আইনি বিষয় নয়; এটি মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারেরও অংশ। মুসলিম নারীরা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় রক্ষার যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা ধৈর্য, সচেতনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন প্রত্যেক নাগরিক ভয় বা বৈষম্য ছাড়াই নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারেন। পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়ভিত্তিক আইন এবং সহনশীল সামাজিক পরিবেশই পারে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে, যেখানে ভিন্নতা বিভেদের নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের শক্তিতে পরিণত হয়।

তথ্যসূত্র: ইউরোপীয় বিচার আদালত (ইসিজে); বেলজিয়ামের সাংবিধানিক আদালত; ইউনিয়া (বেলজিয়ামের সমঅধিকার সংস্থা); বিবিসি; আল-জাজিরা; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা

Posted ১২:৫৭ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: weeklybangladesh@yahoo.com

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.