বাংলাদেশ অনলাইন : | সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
হাদির মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় রাতভর বিক্ষোভ, অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ছবি : সংগৃহীত
সন্ত্রাসী হামলায় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যু এবং দেশব্যাপী আলোড়ন তোলা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে দুটি গণমাধ্যমে হামলা-ভাঙচুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। অথচ ইনকিলাব মঞ্চ বরাবরই বলে আসছে- কারও প্ররোচনায় পা দিয়ে নাশকতামূলক কোনো কর্মকাণ্ড না ঘটাতে। এর পরও সহিংসতা থামানো যায়নি। এদিকে রাজধানীতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
দেশের বেশকিছু নির্বাচন অফিসেও চলেছে হামলা-ভাঙচুর। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেক প্রার্থীই প্রচার চালাতে নিজ নির্বাচনী এলাকায় যেতে ভয় পাচ্ছেন গুপ্ত হামলার আশঙ্কায়। তাঁদের কেউ কেউ এরই মধ্যে গানম্যানও চেয়েছেন। সাধারণ ভোটারের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠেছেÑ সহিংসতার নেপথ্যে কি তবে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র চলছে?
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসবে পরিস্থিতি ততই ঘোলাটে করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। একটি গ্রুপ চাইবে নির্বাচন যেন না হয়। আরেকটি গ্রুপ জাতীয় সরকারের স্বপ্ন দেখছে। কাজেই তাদের কিছু এজেন্ডা থাকতে পারে। এ জন্য এ মুহূর্তে সরকারের উচিত বিশেষ নজরদারি বাড়ানো। নয়তো যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা জটিল হয়ে যেতে পারে।
এমতাবস্থায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট ইস্যুতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল রবিবার দুই দফা বৈঠক করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এদিন তিন বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে এক দফা বৈঠক হয়। এরপর বিকালে আবার বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করে ইসি। দুটি বৈঠকেই উঠে আসে দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টি। বৈঠকে বলা হয়Ñ কিছু ঘটনা নির্বাচন ঘিরে হলেও দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে সামনে চোরাগোপ্তা হামলার ঘটনা হতে পারে। এ জন্য সব বাহিনী ও সংস্থাকে আরও তৎপর হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বৈঠকে; প্রার্থীদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী সন্দেহজনক কাউকে দেখলে বা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহাকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লিখিতভাবে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশে থাকা মার্কিন নাগরিকদের জন্য দেশজুড়ে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। ঢাকা ও রাজশাহীতে থাকা ভারতীয় হাইকমিশন অফিস অভিমুখে লং মার্চ ডাকা হয়েছে। এসব বিষয়ও উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে প্রার্থী ও ভোটারের মধ্যে। চোরাগোপ্তা হামলার ভয় ইসিতেও ভর করেছে। তাই তারা সারা দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। এসব কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করার নির্দেশনা দিতে বলা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, অনেক প্রার্থী নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রচার চালাতে ভয় পাচ্ছেন। বিশেষ করে, জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতারা তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না, তাই তাদের চেষ্টা থাকবে নির্বাচনটা যেন ভণ্ডুল হয়ে যায়। দলটি এরই মধ্যে ঘোষণাও দিয়েছেÑ আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হবে না, হতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরু থেকেই একটা পক্ষ জাতীয় সরকারের স্বপ্ন দেখে আসছে। সেই গ্রুপও সক্রিয়। আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যদি কোনো কারণে বানচাল হয়, তাহলে সব দলের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হতে পারেÑ রাজনীতির মাঠে এমন গুঞ্জনও চাউর রয়েছে। যদিও বিএনপি এ প্রস্তাব শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে। জানিয়েছেÑ এমন কোনো ফাঁদে পা দেবে না তারা। কিন্তু অন্যান্য ছোট দল, বিশেষ করে যেসব দলের এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভবনা কম, তারা চায় জাতীয় সরকার গঠন করে অন্তত ৩ থেকে ৪ বছর দেশ পরিচালনা করা হোক। আর জাতীয় সরকার হলে একদিকে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার অন্যদিকে রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তারা মনে করছে, জাতীয় নির্বাচন হলে এবং বিএনপির হাতে দেশ পরিচালনার ভার গেলে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে পুনরায় ফিরে আসতে পারে। এ ধারণা থেকেই তারা সক্রিয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করার ক্ষেত্রে গেয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতায় ঘাটতি ছিল কি নাÑ তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ইসির গতকালের বৈঠকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং যে কোনো অনভিপ্রেত ঘটনা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সামনে কীভাবে গোয়েন্দা তৎপরতা আরও বাড়ানো যায় এবং সংস্থাগুলো কীভাবে কাজ করতে পারে, সেসব বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বৈঠকে।
সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা বলেন, সম্প্রতি দুয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যে কারণে নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যাদের ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে, তারা চাইবে নির্বাচনটা ভণ্ডুল করে দিতে অথবা পিছিয়ে দিতে। তাদের মাথা চলে গেলেও লেজটা রয়ে গেছে। আর নির্বাচনের সময় এ ধরনের ঘটনা এবারই নতুন নয়। এমন ঘটনা ঘটে থাকে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য গোয়েন্দা নজরদারি খুব বেশি দরকার। কোথা থেকে কারা এমন নাশকতা ঘটাচ্ছেÑ এগুলো চিহ্নিত করে দুয়েকটার শাস্তি দিতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছেÑ দেশে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন। তবুও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় প্রার্থীদের নিরাপত্তা শঙ্কা বাড়ছে। তাই নির্বাচন ঘিরে অজানা শঙ্কা থেকে নিরাপত্তা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে ইসি। এবার ভোটের আগে-পরে পাঁচ দিন (৯-১৩ ফেব্রুয়ারি) মাঠে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়িয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবু নিরাপত্তার নিয়ে শঙ্কা দূর হচ্ছে না।
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, অরাজক পরিস্থিতিতে নির্বাচন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। প্রার্থীরা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরাও নির্বাচনে থাকব কি না, তা পুনরায় বিবেচনা করব।
সম্প্রতি একের পর এক ঘটনায় ভোটের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কায় সাধারণ ভোটাররাও। আগারগাঁও এলাকার ভোটার শামীম শিকদার বলেন, রাজধানীতে এত নিরাপত্তা, এত তৎপরতা, এর মধ্যেও যদি একজন প্রার্থীকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যেতে পারে, তাহলে ভোটের দিন কীঘটতে পারে? তিনি বলেন, অতীতের যে কোনো নির্বাচনের তুলনায় এবার সংঘাত বেশি হবে। তাই শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে যাব কি না ভাবছি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, নিশ্চিতভাবেই নিরাপত্তা শঙ্কা রয়েছে। একটা পক্ষ চাইবে নির্বাচনটা না হোক। কারও কারও মনে জাতীয় সরকারের ভাবনাও রয়েছে। কাজেই তাদেরও কিছু এজেন্ডা থাকতে পারে। এই মুহূর্তে সরকারের উচিত গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো। এখন যদি গোয়েন্দা সংস্থা ঠিকমতো কাজ না করে, সরকারকে সঠিক তথ্য-উপাত্ত না দেয়, তাহলে ভোটের পরিবেশ জটিল হয়ে উঠবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন আগামী নির্বাচন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে দেশের পরবর্তী স্থিতিশীলতা ও গতিপথ। তাই সরকারের উচিত আইনশৃঙ্খলার প্রতি অনেক বেশি নজর দেওয়া। প্রার্থী ও ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোটের অনিশ্চয়তা বাড়বে। আর ভোট ভণ্ডুল হলে দেশের অগ্রগতি থমকে যাবে।
প্রসঙ্গত, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই দিন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
Posted ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh