বাংলাদেশ অনলাইন : | শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সম্ভাব্য মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বৃদ্ধি পাওয়ায় ৬ মার্চ ইস্তাম্বুলের একটি পেট্রোল পাম্পে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছে। ছবি: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি বাজারে, যা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে। সংঘাতের ফলে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়বে।
বর্তমানে ইরানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়।
ইরানের হামলায় কাতার ও সৌদি আরবের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। খবর আল জাজিরার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা ভোক্তা ব্যয় কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দেবে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বিশ্লেষক অ্যান-সোফি করবো বলেন, মূল প্রশ্ন হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কতদিন বন্ধ থাকবে এবং জ্বালানি অবকাঠামোর কতটা ক্ষতি হয়।
অ্যান-সোফি করবো বলেন, আপাতত বাজার স্বল্পমেয়াদি সংকট ধরে নিয়ে দাম নির্ধারণ করছে, তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে।
সংঘাত শুরুর পর এখন পর্যন্ত তেলের দাম তুলনামূলকভাবে সীমিত হারে বেড়েছে। শুক্রবার (৬ মার্চ) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮৪ ডলারে ওঠে, যা সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।
তবে অতীতের জ্বালানি সংকটের তুলনায় এই বৃদ্ধি এখনও কম। ১৯৭৩ সালের আরব তেল অবরোধের সময় মাত্র তিন মাসে তেলের দাম চার গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবুও হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।
জেপি মর্গান চেজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে উপসাগরীয় সাতটি তেল উৎপাদনকারী দেশ—বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এক মাসের কম সময়ের মধ্যেই তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা শেষ হয়ে যেতে পারে।
এ অবস্থায় উৎপাদক দেশগুলোকে তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে হবে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কয়েক সপ্তাহ ধরে সীমিত থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে কয়েক দিনের মধ্যেই আঞ্চলিক উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং তেলের দাম ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.১৫ শতাংশ কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে এশিয়ার দেশগুলোতে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই এশিয়ায় যায়। ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্যদিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ইতোমধ্যে দ্রুত বেড়েছে। ইউরোপে এলএনজির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে বলে জানিয়েছে জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা মেরিন ট্রাফিক।
বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অনিশ্চয়তা। কারণ ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা স্পষ্ট না হওয়ায় ব্যবসা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে মার্কিন নৌবাহিনী ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি জাহাজ চলাচল আংশিকভাবে স্বাভাবিক রাখা যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দা এড়াতে পারে। তবে তেল পরিবহন দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ দ্রুত বাড়বে।
Posted ১০:১২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh