বাংলাদেশ অনলাইন : | শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে। ব্যবসায়ীদের আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে ডলারের দর উঠে গেছে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায়, যা দেড় মাস আগের তুলনায় প্রায় ১ টাকা ২০ পয়সা বেশি। আর ব্যাংকগুলোতে নগদ ডলারের দাম ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা ছাড়িয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ডলারের ওপর চাপ বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিময় হারে। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে। টাকার মান প্রায় ৪৫ পয়সা অবমূল্যায়ন করে গত দুই দিনে প্রায় ১২ কোটি ডলার কেনা হয়েছে। এতে বাজারে ডলারের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ধারাবাহিকভাবে বাজার থেকে ডলার কিনতে থাকে, তাহলে বাজারে ডলারের সরবরাহ আরও কমে গিয়ে দাম বাড়তে পারে। ব্যাংকাররা বলছেন, যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ডলারের দাম বেশি নিচ্ছে। আগে যেখানে প্রবাসী আয়ের ডলার প্রায় ১২২ টাকা দরে পাওয়া যেত, এখন সেটি বেড়ে ১২৩ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে আমদানি এলসি নিষ্পত্তিতেও দাম বাড়ছে।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয়ের ডলার কিনতে ব্যাংকগুলোকে বেশি দাম দিতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রবাসী আয়ের ডলার কিনতে ব্যাংকগুলোর প্রায় ১২৩ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রবাসী আয় সংগ্রহে ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত খরচের মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আমদানি এলসি নিষ্পত্তির দরে। বিভিন্ন ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত দর বলছে, গতকাল চতুর্থ প্রজন্মের এনআরবি ব্যাংক আমদানি এলসি নিষ্পত্তিতে প্রতি ডলার বিক্রি করেছে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায়। একই দিন ব্যাংকটি নগদ ডলার বিক্রি করেছে সর্বোচ্চ ১২৪ টাকা ৭৫ পয়সায়। ঢাকা ব্যাংক আমদানিতে ১২৩ টাকা ৪০ পয়সায় এবং নগদ ডলার বিক্রির দর ছিল ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা। অন্যদিকে এনআরবিসি ব্যাংক আমদানিতে ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা ডলার বিক্রি করেছে। এছাড়া ব্র্যাক, যমুনা ও স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক আমদানিতে প্রতি ডলার বিক্রি করেছে ১২৩ টাকা ২৫ পয়সায়। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, ব্যাংকগুলো যে দর প্রকাশ করছে, তার চেয়ে বেশি দামে আমদানি এলসি নিষ্পত্তি করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টানা দেড় মাস বিরতির পর আবার বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকালও চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৫ কোটি ডলার কেনা হয়। নিলাম পদ্ধতিতে (অকশন) প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। আগের দিন বুধবার একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭ কোটি ডলার কেনা হয়। ওইদিনই প্রতি ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। এর আগে গত ২ মার্চ দুইটি বাণিজ্যক ব্যাংক থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার ক্রয় করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন ডলার কেনার দর ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবেই দেড় মাসেরও কম সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে প্রায় ৪৫ পয়সা। তবে ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রি করছে প্রায় ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত, যা বাজারে চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ এক সপ্তাহ আগে গত ৮ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বিবৃতিতে বলেছিল, আমদানি ও বৈদেশিক পরিশোধ পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’। আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ নিয়মিত ও পরিকল্পিত ধারায় চলছে। মার্চ মাসে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিল বাবদ ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ সরকারি ঋণ পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে। তারপরও দেশে ৬ এপ্রিল বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে ছিল প্রায় ৩৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ডলার বাজারে মূল্যমানে কোনো চাপ নেই এবং ডলারের মূল্যমান স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমেই রক্ষিত হচ্ছে। সার্বিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও চাহিদা বর্তমানে ভারসাম্যপূর্ণ রয়েছে। রেমিটেন্স প্রবাহ শক্তিশালী, বাজারে আস্থা ও শৃঙ্খলা বিদ্যমান থাকার ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে টাকার বিনিময় হারে অবমূল্যায়নের কোনো চাপ নেই এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক ফের ডলার কিনতে শুরু করায় দর হারাচ্ছে টাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাজারে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। তবে সাম্প্রতিক দর বৃদ্ধির পেছনে ডলারের সরবরাহ কিছুটা সংকুচিত হওয়াই প্রধান কারণ। আগে ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে ডলার কেনা সম্ভব হলেও এখন তা ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় কিনতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেনা এই দরই বাজারে রেফারেন্স রেট হিসেবে কাজ করছে। এর ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো কিছুটা বেশি দামে আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রি করছে। তিনি আরও বলেন, ডলারের দর নির্দিষ্ট করে বেঁধে দেওয়া হয়নি। বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কখনও কম দামে, কখনও বেশি দামে ডলার কিনে থাকে।
জানা গেছে, চলতি মাসজুড়ে বাজার থেকে ডলার কেনার পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। সামনে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দুই মাসের আমদানি বিল পরিশোধে রিজার্ভে চাপ পড়ার আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায়, বড় অঙ্কের পেমেন্টের সময় যেন রিজার্ভ হঠাৎ কমে না যায়। সূত্র : দৈনিক আমাদের সময়
Posted ৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh