বাংলাদেশ অনলাইন ডেস্ক : | মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের মরুপ্রান্তরে এখন বইছে অন্য এক উত্তেজনার ঝড়। ওয়াশিংটন আর রিয়াদের গোপন আঁতাত আর হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে পুরো আঞ্চলিক রাজনীতির মানচিত্র। মার্কিন পরমাণু নীতিতে বড়সড় শিথিলতা এনে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব বহুচর্চিত পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে। সেকশন ১২৩ নামের এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে তৈরি হচ্ছে এক নতুন পারমাণবিক শক্তির উত্থানের পথ, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়ে গেছে তীব্র জল্পনা-কল্পনা।
মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমানের স্বাক্ষরিত এই চুক্তির নেপথ্যে রয়েছে আমেরিকার বড় স্বার্থ। এই চুক্তির ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো এখন সরাসরি সৌদির পরমাণু প্রকল্পে প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহ করার সুযোগ পাবে। তবে কাগজে-কলমে এটি কেবল শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের কথা বললেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে অন্য এক চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রায় ৯০ দিনের চূড়ান্ত পর্যালোচনার অপেক্ষায় থাকা এই চুক্তি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে দানা বাঁধছে গভীর শঙ্কা।
সবচেয়ে ভাবনার বিষয় হলো, এই চুক্তির শর্তগুলো থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বহু পুরনো কিছু কড়াকড়ি। আরব আমিরাতের সঙ্গে হওয়া চুক্তির মতো এক্ষেত্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পরমাণু জ্বালানি পুনর্ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ মান বজায় রাখা হয়নি। এমনকি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কঠোর অতিরিক্ত প্রটোকল মানার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়নি এই চুক্তিতে। ফলে সৌদি আরব যদি ভবিষ্যতে নিজেদের অজান্তেই সম্পূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি চক্রের মালিক হয়ে ওঠে, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সেই পুরনো হুংকার আজ আবারও জোরালোভাবে সামনে চলে আসছে। বছর কয়েক আগে তিনি স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছিলেন, ইরান যদি পরমাণু বোমা তৈরি করে, তবে সৌদি আরবও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না; তারা ঠিক একই পথে হাঁটবে। আর ঠিক এই জায়গাতেই মিলছে দুইয়ে দুইয়ে চার। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসনের আবহেই সৌদি আরব তাদের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছে, যা যেকোনো মুহূর্তে সামরিক মোড় নিতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন এই পদক্ষেপে বড় ধরনের দ্বিমুখী নীতির গন্ধ পাচ্ছে বিশ্ব। তেহরান যখন একই ধরনের পারমাণবিক কার্যক্রম চালাতে চেয়েছিল, তখন তাদের ওপর নেমে এসেছিল একের পর এক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক হুমকি। অথচ ওয়াশিংটন এখন নিজের ঘনিষ্ঠ মিত্র রিয়াদকে সেই একই পথে হাঁটার আইনি ভিত্তি তৈরি করে দিচ্ছে। ইসরায়েলও এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে জানিয়েছে যে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়ংকর পারমাণবিক প্রতিযোগিতার সূচনা করতে পারে।
সৌদি আরব অবশ্য এখনই সরাসরি পারমাণবিক বোমা বানানোর ঝুঁকি হয়তো নেবে না। ভিশন ২০৩০-এর আওতায় অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জল সংকট নিরসনের মতো সাধু উদ্দেশ্য এর পেছনে রয়েছে। তবে দেশের ভেতর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অবকাঠামো তৈরি হয়ে গেলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটু এদিক-সেদিক হলেই যেকোনো মুহূর্তে পাল্টে যেতে পারে পুরো খেলার নিয়ম। কৌশলগত এই অনিশ্চয়তা সৌদি আরবকে যেমন সুরক্ষা দেবে, তেমনি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য তা ডেকে আনবে মারাত্মক বিপদ।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চিরশত্রু ইসরায়েল এই পরিস্থিতি নিয়ে মারাত্মকভাবে উদ্বিগ্ন। সৌদি আরবের সঙ্গে তেল আবিবের কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো স্বাভাবিক না হলেও ওয়াশিংটন বর্তমান পরিস্থিতিতে পারমাণবিক চুক্তিকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার শর্ত থেকে আলাদা করে রেখেছে। আঞ্চলিক কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর ভয়ে ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকরা এখন নতুন করে ছক কষতে শুরু করেছেন। সৌদি আরবের হাতে পারমাণবিক প্রযুক্তির চাবিকাঠি চলে যাওয়ার অর্থ হলো পুরো অঞ্চলে এক স্থায়ী বারুদের স্তূপ তৈরি হওয়া।
সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটন এবং রিয়াদের এই পরমাণু চুক্তি বিশ্ব রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের বীজ বুনে দিল। আমেরিকার মূল উদ্দেশ্য নিজের দেশের পরমাণু শিল্পকে বাঁচানো এবং রাশিয়া কিংবা চীনের প্রভাব থেকে সৌদি আরবকে দূরে রাখা। কিন্তু এই স্বল্পমেয়াদী ভূরাজনৈতিক ফায়দা তুলতে গিয়ে আমেরিকা যে পারমাণবিক বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক নীতিকে চিরতরে বিপন্ন করে তুলল, তা বলাই বাহুল্য।
Posted ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh