বাংলাদেশ অনলাইন : | বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ফাইল ছবি
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত বিদ্রোহ ও নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর আজ। কিন্তু দীর্ঘ এ সময়েও বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত নেপথ্যের কুশীলবদের বিচার হয়নি। এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরেই তারা। তাদের বেশিরভাগই বিদেশে আত্মগোপন করে আছেন।
পিলখানায় নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর সরকার দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। একটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় তদন্ত কমিটি, আরেকটি সেনা তদন্ত আদালতের। দুটি তদন্ত কমিটিই তখন স্বাধীনভাবে কার্যক্রম চালাতে পারেনি। তাদের তদন্তে ঘাটে ঘাটে বাধা দেয় শেখ হাসিনা সরকার। এমনকি সেনা তদন্ত আদালতের তদন্ত বাধাগ্রস্ত করা হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নির্দেশে। বাধার কারণে দুটি তদন্ত কমিটিই বারবার তদন্তের গতিপথ পরিবর্তন করে। এমনকি সেনা তদন্ত আদালতের তদন্তে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বিডিআর কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হয়। ওই ঘটনার প্রকৃতি ও স্বরূপ উদঘাটন করতে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানকে সভাপতি করে ৮ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছর ৩০ নভেম্বর কমিশন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
ওই কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে দলগতভাবে আওয়ামী লীগ জড়িত ছিল। এ ঘটনার মূল সমন্বয়কারী ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। হত্যাকাণ্ডে প্রতিবেশী দেশ ভারতের জড়িত থাকারও প্রমাণ মিলেছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতাও ছিল। আর হত্যা ষড়যন্ত্রের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
কমিশনের প্রতিবেদন বলছে, পিলখানার ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত জাতীয় কমিটি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই তাদের তদন্ত রিপোর্ট তৈরি ও দাখিল করে। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ বা প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল কমিটির ওপর। এ ছাড়া রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের নাম উঠে আসার পরও তাদের তদন্তের আওতায় এনে অপরাধ নির্ণয় করা হয়নি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করে কমিটি নিজেদের দায় এড়িয়ে যায়। পাশাপাশি তদন্ত কমিটি বিদেশি সংশ্লিষ্টতা এবং বহিরাগতদের বিষয়ে কোনো তদন্ত করেনি।
সেনা তদন্ত আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনা তদন্ত আদালত স্বাধীনভাবে তাদের তদন্ত কার্যক্রম চালাতে পারেনি। তদন্তের আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয় তদন্ত কার্যক্রম শুধু সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। ডিজিএফআই এবং এনএসআই দুই সংস্থা থেকেই বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করা হয়। কমিটিকে জানানো হয়েছিল যেহেতু জাতীয় পর্যায়ে তদন্ত কমিটি আছে সেনাবাহিনীর বাইরে যারা আছেন তারা জাতীয় কমিশনেই বক্তব্য দেবেন। কিছু কিছু বক্তব্য জাতীয় তদন্ত কমিটি থেকে সংগ্রহ করা হয়, যেখানে তদন্ত আদালতের প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না। কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে তদন্ত আদালতের আওতায় আনার অধিকার কমিটিকে দেওয়া হয়নি।
কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তদন্ত কার্যক্রম চলাকালীন সময় (প্রথম অবস্থায়) হঠাৎ সভাপতি (লে. জেনারেল অব জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী) তদন্ত আদালতকে জানান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাকিবকে তদন্ত আদালত থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও দুজন জুনিয়র অফিসারকে পরিবর্তন করা হয়। এর দুই থেকে তিনদিন পর পিএস পরিদপ্তরের পত্রের মাধ্যমে চারজন নতুন অফিসারকে তদন্ত আদালতে যুক্ত করা হয়। তদন্ত আদালতের সভাপতির সঙ্গে তদন্ত দলের যোগাযোগ কমে যায়। সেনা তদন্ত দলের সদস্য মেজর জেনারেল মতিন জবানবন্দি নিজস্ব সুবিধানুযায়ী সংশোধন করতেন; যা অনুপযুক্ত মনে করতেন তা বাদ দিতেন। এর ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে যেত। এ নিয়ে কমিটিতে বিরোধ সৃষ্টি হয়। ফলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আনোয়ার তদন্ত আদালত থেকে বাদ পড়েন। মতানৈক্যের কারণে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাবিককেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
কমিশন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জবানবন্দিগুলো মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকের কাছে নিয়ে যেতেন মেজর জেনারেল মতিন এবং মেজর জেনারেল তারিক সেগুলো পর্যালোচনা করতেন। লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম একবার মেজর জেনারেল মতিনকে বলেছিলেন, মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিক তদন্ত আদালাতের কপি চেয়েছেন, দেওয়া ঠিক হবে কি-না। উত্তরে মেজর জেনারেল মতিন জানান, উনি তো অফিসিয়ালি পাবেন আমরা কেন দেব। তদন্ত আদালতের নিয়ন্ত্রণ নিতে মেজর জেনারেল মতিন ও কর্নেল রাজ্জাককে নিযুক্তির পর তদন্তের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এ ছাড়া তদন্ত আদালতের বিভিন্ন জবানবন্দি, উদঘাটিত তথ্যাবলি ও অন্যান্য বিষয় পরিবর্তন, বাদ দেওয়া ইত্যাদির কারণে আসল বিষয়বস্তু তুলে ধরা যায়নি বা উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি।
কমিশন প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ডিজিএফআই থেকে বারবার তদন্ত আদালত চলার সময় টেলিফোনের মাধ্যমে হুমকি, বিভিন্ন নির্দেশ প্রদানের ফলে তদন্ত আদালতের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে ও বাধাগ্রস্ত করে। এ ছাড়াও তাদের হুমকির কারণে তদন্ত আদালতের সদস্যদের বিচলিত হতে দেখা যায়। বিশেষ বিশেষ সাক্ষীর ক্ষেত্রে তাদের স্পষ্ট নির্দেশিকা (যেমন- লে. কর্নেল শামসের ক্ষেত্রে) পালন করতে হয়। সিআইবির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন খালেদের জবানবন্দি পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। তাকে বারবার অনুরোধ করার পর জবানবন্দি দিতে রাজি হন। কিন্তু তদন্ত আদালতের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ডিজিএফআইসহ অন্য সংস্থাগুলোর অসহযোগিতা তদন্তকে প্রভাবিত করার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তা ছাড়া মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিক যেভাবে প্রতি সপ্তাহে অগ্রগতি জানতে চেয়েছিলেন সেটাও প্রভাবিত করার জন্য। যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তদন্ত কার্যক্রমে সহায়তা করেননি তাদের বিরুদ্ধে অসযোগিতা/বিচারিক কাজে বাধার অভিযোগ এনে কোনো সুপারিশ করা হয়নি সেনা তদন্ত প্রতিবেদনে। বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের পর পিলখানায় প্রবেশকারী সেনা অফিসাররা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সেনাবাহিনীর তদন্ত আদালতের সভাপতি উক্ত অফিসারদের সব আলামত জমা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন এবং সেই অনুসারে অফিসাররা আলামতগুলো জমা দিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদনে ওই আলামতের তালিকা বা এই বিষয়ে কোনো তথ্য সংযোজন করা হয়নি।
তদন্ত আদালত বিদেশি সংশ্লিষ্টতা এবং বহিরাগতদের বিষয়ে কোনো তদন্ত করেনি। উল্লিখিত উদঘাটিত তথ্য স্পষ্টভাবে ভারতীয় বিএসএফের ইন্ধন নিশ্চিত করে, কিন্তু এ বিষয়ে অধিকতর তদন্ত এবং কোনো সুপারিশ করা থেকে বিরত থেকেছে সেনা তদন্ত আদালত।
২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এর হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত সেনা তদন্ত আদালতের সভাপতি লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর কমিশনে বক্তব্য দেনÑ তদন্ত কার্যক্রম অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা এবং সাক্ষীদের অনুপস্থিতি এই দুটি বিষয়ে তদন্ত আলাদতের সীমাবদ্ধতা ছিল। বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ এবং গোয়েন্দা সংস্থার কিছু কর্মকর্তা এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে রাজি হননি। সেনাসদর কর্তৃক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও কর্মকর্তাদের উপস্থিত করা যায়নি। সেনাবাহিনীর প্রধানকে অনুরোধের পরেও তারা বিষয়টি সুরাহা করতে পারেননি। তদন্তের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের অধিকাংশের সহযোগিতা না পাওয়ায় সত্য উদঘাটনের স্বার্থে অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করা হয় সেনাতদন্ত প্রতিবেদনে।
পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির। তিনি বলেন, বিদ্রোহের পর সেনা অভিযান হলে অনেক সেনা কর্মকর্তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব ছিল। এমনকি র্যাবও যদি অভিযান করত তাহলেও হতাহত অনেক কম হতো। আমরা হত্যাকাণ্ডের বিচার দেখতে চাই। কিন্তু আবার তদন্ত কমিশন গঠন করার কথা শুনছি। তিনি বলেন, জাতীয় কমিটিও স্বাধীন তদন্তে শেখ হাসিনা সরকার বারবার বাধা দিয়েছিল। এমনকি তখনকার সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। কিন্তু প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় কমিশনের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি ২০০৯ সালে পিলখানায় সেনাহত্যার ‘প্রকৃত রহস্য’ উদ্ঘাটন করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সমঝোতার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় পরিকল্পিতভাবে ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করে। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে হত্যা করে মূলত দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলার ষড়যন্ত্র করে। এই ঘটনায় অনেক নিরীহ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বিচারের নামে প্রহসনের আয়োজন করে। তাদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দিয়ে কারাগারে আটক রাখে। অনেকে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ফ্যাসিস্ট সরকারের ষড়যন্ত্রের কারণে তাদের মুক্তি মেলেনি। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন তিনি।
Posted ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh