বাংলাদেশ অনলাইন : | শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও তাদের সহযোগীদের সম্মিলিত জোট গতকাল শুক্রবার ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৬’ (বিশ্ব খাদ্য সংকট প্রতিবেদন) প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশে^র মোট ক্ষুধার্ত মানুষের দুই-তৃতীয়াংশের বাস বাংলাদেশসহ ১০টি দেশে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো মানবিক সংকট নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে একটি কাঠামোগত ও দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ৪৭টি দেশে প্রায় ২৬৬ মিলিয়ন মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগেছে, যা ওই দেশগুলোর জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ২০১৬ সালের তুলনায় এই হার প্রায় দ্বিগুণ, যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির দিকে ইঙ্গিত করছে।
এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর ক্রমবর্ধমান ঘনত্ব ও স্থায়িত্ব। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মহাপরিচালক কু ডংইউ বলেছেন, বর্তমান খাদ্য সংকট আর সাময়িক নয়; এটি এখন পুনরাবৃত্তিমূলক ও কাঠামোগত। অর্থাৎ, বিশ্ব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ক্ষুধা কোনো দুর্যোগ-পরবর্তী সাময়িক সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার প্রতিফলন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাতই এই সংকটের প্রধান চালিকাশক্তি। আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, কঙ্গো, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনÑ এই ১০টি সংঘাতপ্রবণ দেশেই বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ তীব্র ক্ষুধার্ত মানুষের বাস। এই পরিসংখ্যান শুধু খাদ্য সংকট নয়, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে। ২০২৫ সালে গাজা ও সুদানের কিছু অংশে দুর্ভিক্ষের ঘোষণা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। ২০২৫ সালে প্রায় ৩৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগেছে, যার মধ্যে প্রায় ১০ মিলিয়ন মারাত্মক অপুষ্টির শিকার। ইউনিসেফের মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস সতর্ক করে বলেন, এই শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, সাধারণ রোগও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ফলে ক্ষুধা শুধু একটি অর্থনৈতিক বা সামাজিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ২০২৫ সালে খাদ্য সংকটপ্রবণ অঞ্চলে ৮৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী সাধারণ জনগণের তুলনায় বেশি খাদ্য সংকটে ভোগে, যা একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ উল্লেখ করেন, শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংকট বাড়লেও সহায়তা কমছে। খাদ্য ও পুষ্টি খাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রায় এক দশক আগের পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে সরকার ও সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি বাড়ছে, যার কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
চলতি বছরের জন্য পূর্বাভাসও আশাব্যঞ্জক নয়। এই সময়ে চলমান সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা খাদ্য সংকটকে আরও তীব্র করার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে অস্থিরতা তৈরি করে খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা দরিদ্র দেশগুলোর জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
এই প্রেক্ষাপটে সমাধান খুঁজতে হলে শুধু জরুরি সহায়তা বাড়ালেই হবে না, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত পরিবর্তন। প্রথমত, সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে, কারণ শান্তি ছাড়া খাদ্যনিরাপত্তা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে দেশগুলো আমদানিনির্ভরতা কমাতে পারে। তৃতীয়ত, আগাম সতর্কতা ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে সংকট গভীর হওয়ার আগেই তা মোকাবিলা করা যায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মহাপরিচালক কু ডংইউ বলেন, ‘আমাদের কেবল দেরিতে প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে সরে এসে আগেভাগে পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু খাদ্যসহায়তার ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনকে রক্ষা করতে হবে। তবেই আমরা মানুষের প্রয়োজন কমাতে পারব এবং জীবন বাঁচাতে সক্ষম হব।’
Posted ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh