বাংলাদেশ অনলাইন : | রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
সাবেক মৃত এক অর্থমন্ত্রীর পরিবার, জায়নিস্টরা, সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গ, নাগরিক সমাজের কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমনকি এক পডকাস্টার। এরা সবাই এমন এক অদ্ভুত তালিকার অংশ। তাদেরকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছে। অভিযোগ হলো তারা নাকি মালয়েশিয়ায় গণতন্ত্রকে দুর্বল করে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে জড়িত।
আনোয়ার ইব্রাহিমের মতে, এই ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য হলো মালয়েশিয়ার ‘সিস্টেম ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর আঘাত করা’ এবং ‘সরকারকে নাশকতার মাধ্যমে দুর্বল করা’। ৩ মার্চ পার্লামেন্টে তিনি বলেন, একটি ‘জায়নিস্ট’ জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রতিবেদন ছড়িয়েছে। এর মধ্যে ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক নিবন্ধও রয়েছে। সেখানে মালয়েশিয়ান এন্টি-করাপশন কমিশনের (এমএসিসি) বিরুদ্ধে ব্যাপক নিয়ম লংঘনের অভিযোগ তোলা হয়েছে, বিশেষ করে করপোরেট সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন স্ট্রেইটস টাইমস।
প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি দমন সংস্থাটি নিয়ে প্রকাশ্য তদন্তের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বরং তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল দুসুকি মোকতারের নেতৃত্বে একটি অভ্যন্তরীণ টাস্কফোর্স গঠন করেছেন। তবে দুসুকির বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সিদ্ধান্ত নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এমএসিসির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?
ফেব্রুয়ারিতে ব্লুমবার্গ দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রথম প্রতিবেদনে বলা হয়, এমএসিসি প্রধান আজাম বাকি সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত শেয়ার মালিকানার সীমা লঙ্ঘন করেছেন। এই সীমা একটি কোম্পানিতে সর্বোচ্চ ১ লাখ রিঙ্গিত। মালয়েশিয়ার সংবাদ মাধ্যম মালয়েশিয়াকিনি পরবর্তী প্রতিবেদনে আরও প্রমাণ তুলে ধরে যে তিনি অন্যান্য কোম্পানিতেও অতিরিক্ত শেয়ার ধরে রেখেছিলেন। সাবেক অর্থনীতি মন্ত্রী রাফিজি রামলি ১৩ মার্চ দাবি করেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের নেতৃত্বে হওয়া তদন্তে দেখা গেছে দুর্নীতি দমন সংস্থার প্রধান নয়টি কোম্পানিতে মোট ১ কোটি ৪০ লাখ রিঙ্গিত মূল্যের শেয়ার ধরে রেখেছিলেন।
ব্লুমবার্গের দ্বিতীয় প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, এমএসিসির কিছু কর্মকর্তা তাদের বিস্তৃত ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশে ‘করপোরেট মাফিয়া’ হিসেবে কাজ করেছেন এবং কোটি কোটি ডলার মূল্যের কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ দখল করেছেন। তবে এসব অভিযোগ নতুন নয়।
আজাম বাকির বিরুদ্ধে প্রথম শেয়ার অনিয়মের অভিযোগ ওঠে ২০২১ সালে। এছাড়া দ্য স্ট্রেইটস টাইমস এবং কিছু ব্লগেও এমএসিসির ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি এবং করপোরেট ব্যক্তিদের প্রভাবিত করার অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম বড় সংবাদ সংস্থা যখন এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তখনই পুত্রজায়ার ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
এমএসিসির সমালোচকরা কী চাইছেন?
সমালোচকদের দুটি প্রধান দাবি রয়েছে। প্রথমত, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আজাম বাকিকে সাময়িক বরখাস্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এমএসিসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের জনস্বার্থ তদন্ত ব্যবস্থা- রয়্যাল কমিশন অব ইনকোয়ারি, গঠন করতে হবে। এই দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জোরালো দাবি এসেছে ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টি বা ডিএপির পক্ষ থেকে। এ পর্যন্ত এই দাবিগুলোর কোনোটি মানা হয়নি। আনোয়ার বলেছেন, ‘আইনগত প্রক্রিয়া’ মেনে চলতে হবে এবং টাস্কফোর্স প্রথমে মন্ত্রিসভায় তাদের রিপোর্ট উপস্থাপন করবে। এরপরই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে রয়্যাল কমিশন গঠনের বিষয়ে। তবে তদন্ত রিপোর্টটি শেষ পর্যন্ত সিভিল সার্ভিস প্রধানের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি ১০ মার্চ তা গ্রহণ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া টাস্কফোর্সটি কেবল শেয়ার মালিকানার বিষয়টি তদন্ত করেছে; তথাকথিত ‘করপোরেট মাফিয়া’ অভিযোগটি তারা খতিয়ে দেখেনি।
তাহলে কারা তদন্তের মুখে?
১১ মার্চ সরকার মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পুলিশ, সিকিউরিটিজ কমিশন, ইনল্যান্ড রেভিনিউ বোর্ড এবং এমএসিসি- এসব সংস্থা কয়েক বছর ধরেই ‘করপোরেট মাফিয়া’ অভিযোগ তদন্ত করছে। তবে এসব তদন্ত সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা গেছে। ২০২৩ সালে পুলিশ জানায়, এই অভিযোগের সঙ্গে ব্যবসায়ী ভিক্টর চিন-এর নাম জড়িত থাকতে পারে। তার ব্যবসায়িক লেনদেন এমএসিসি প্রধান আজাম বাকি এবং প্রধানমন্ত্রী আনোয়ারের ঘনিষ্ঠ কিছু করপোরেট ব্যক্তির সঙ্গে মিলে যায়। ১৬ মার্চ সিকিউরিটিজ কমিশন ও পুলিশ ভিক্টর চিনের বাড়িতে তল্লাশি চালায়। চিন দাবি করেন, মালয়েশিয়ায় করপোরেট মাফিয়া আছে। কিন্তু আমি তাদের একজন নই।
তবে আজাম বাকিকে তদন্ত করার বদলে পুলিশ এখন মনোযোগ দিয়েছে একটি কথিত সরকার পতনের ষড়যন্ত্রের দিকে। এই মামলার প্রধান সন্দেহভাজনদের মধ্যে রয়েছেন প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী দাইম জাইনুদ্দিনের স্ত্রী ও সন্তানরা।
দাইম কে ছিলেন?
দাইম জাইনুদ্দিন মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। বিশেষ করে যখন ড. মাহাথির মোহাম্মদ দীর্ঘ ২৪ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মাহাথিরের প্রথম মেয়াদে দাইম অর্থমন্ত্রী ও উমনো দলের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ফলে করপোরেট সিদ্ধান্তে তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। ২০১৮ সালে মাহাথির আবার ক্ষমতায় ফিরে এলে দাইম ‘কাউন্সিল অব এমিনেন্ট পারসনস’-এর প্রধান হন। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি উপদেষ্টা পরিষদ হলেও, অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলত- এটি আসলে একটি ‘সমান্তরাল প্রশাসন’ চালাত। সমালোচকরা মনে করেন, আনোয়ারের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মাহাথির এবং দাইমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত আসলে রাজনৈতিকভাবে হিসাব করে করা হয়েছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া কীভাবে দেখা হচ্ছে?
বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, সরকার এমএসিসির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সরকার পতনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। সমালোচকরা এটিকে ভণ্ডামি বলেও আখ্যা দিয়েছেন। কারণ বিরোধী নেতা থাকাকালে আনোয়ার নিজেও ২০২২ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির পর আজাম বাকির সাময়িক বরখাস্তের দাবি করেছিলেন। এদিকে আনোয়ারের দল পার্টি কেদাই।
Posted ১:২৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh