বাংলাদেশ অনলাইন : | মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
টানা বৃদ্ধির পর খেলাপি ঋণে কিছুটা লাগাম পড়েছে। গত বছরের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ শতাংশের বেশি। মূলত নীতি সহায়তার আওতায় নামমাত্র ডাউনপেমেন্টে ঢালাও পুনঃতফসিল, শিথিল নীতিমালার আওতায় অবলোপন বৃদ্ধি এবং ডিসেম্বর প্রান্তিকে নগদ আদায় জোরদার করার প্রভাবে খেলাপি ঋণে এই উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য অনেক খেলাপি প্রার্থী তাদের বকেয়া ঋণ নিয়মিত করেন।
অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টদের মতে, খেলাপি ঋণ কমার এই চিত্র পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ, যেটা কমেছে তার বড় অংশ এসেছে পুনঃতফসিল, হিসাব সমন্বয় ও অবলোপনের মাধ্যমে। প্রকৃত অর্থে ঋণ আদায়ের অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তা আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এ ছাড়া এখনও ব্যাংক খাতে মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।
এর আগে কয়েক দফায় বড় অঙ্কে বেড়েছিল খেলাপি ঋণ। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আর্থিক খাতে কঠোর নজরদারি ও পর্যালোচনা শুরু হলে আগের সরকারের সময়ে বিভিন্ন উপায়ে গোপন রাখা অনেক খেলাপি ঋণ প্রকাশ্যে আসে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ শ্রেণিকরণের নীতিমালা কঠোর করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকে এবং গত সেপ্টেম্বরে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ওই সময় পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছিল প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এর মধ্যেই গত নভেম্বরে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য নতুন নীতি সহায়তা ঘোষণা করে সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নীতিমালার আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো মাত্র ২ শতাংশ নগদ ডাউনপেমেন্ট দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া খেলাপি ঋণ অবলোপনের নীতিমালা কয়েক দফা শিথিল করা হয়। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ‘আংশিক অবলোপনের’ সুযোগ দিয়ে সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলার অনুযায়ী, মন্দ ও ক্ষতিজনক মানের ঋণের যে অংশটুকু যোগ্য আমানত দ্বারা আবৃত সে অংশটুকুু আদায়যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। ঋণের অবশিষ্ট অংশ এ নীতিমালার আওতায় অবলোপন করা যাবে। এর আগ পর্যন্ত কোনো খেলাপি ঋণের আংশিক অংশ বাতিল বা মূল হিসাব থেকে বাদ দেওয়ার নিয়ম ছিল না।
এর আগে গত নভেম্বরে খেলাপি ঋণ অবলোপনের শর্ত আগের চেয়ে শিথিল করা হয়। আগে মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত ঋণ অবলোপন করতে হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে ৩০ দিনের নোটিশ দিয়ে জানাতে হতো। এখন থেকে কোনো ঋণ হিসাব অবলোপনের ১০ কর্মদিবস আগে ঋণগ্রহীতাকে নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করলেই হয়। আগে যেসব ঋণ টানা দুই বছর মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত থাকে, কেবল সেসব ঋণই অবলোপন করা যেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, নীতি সহায়তার আওতায় কম ডাউনপেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ রাখার সুযোগ নিয়েছেন খেলাপিরা। আবার ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্যও অনেকে ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। সেই সঙ্গে নীতিমালা শিথিলের কারণে মূল হিসাব থেকে মন্দমানের খেলাপি ঋণ অবলোপন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক হিসাব ভালো দেখাতে বছরের শেষ প্রান্তিকে ঋণ আদায় জোরদার করে ব্যাংকগুলো। সবমিলিয়ে কমেছে খেলাপি ঋণ। আগামীতে খেলাপি ঋণ আরও কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খেলাপি ঋণ স্থায়ীভাবে কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েকটি কাঠামোগত পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে আছে ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া জোরদার ও বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা ত্বরান্বিত করা। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত ঝুঁকি মূল্যায়ন করে ঋণ বিতরণ এবং নিয়মিত তদারকি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নতুন করে যাতে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ফলে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। তবে এক বছরের হিসাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।
ব্যাংকের ধরনভেদে খেলাপি ঋণের চিত্রে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যা ডিসেম্বর শেষে কমে হয়েছে ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমে ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোতে একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪১ দশমিক ৯৫ শতাংশ, যা ডিসেম্বর শেষে কমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে।
Posted ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh