বাংলাদেশ অনলাইন : | রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মৃত্যুর খবরে তাদের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জ এবং মাদারীপুর সদর উপজেলার চর গোবিন্দপুরে চলছে শোকের মাতম।
১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ পাওয়ার খবরে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির আঙিনা। প্রবাসে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া ২৭ বছর বয়সী এই তরুণের এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা।
নিহত জামিল আহমেদ মাদারগঞ্জের কড়ইচড়া ইউনিয়নের মহিষবাথান এলাকার জহুরুল হকের ছেলে। জহুরুল হক দীর্ঘদিন ধরেই গাজীপুরের মাওনা এলাকায় বসবাস করতেন। সেখানেই জামিলের বেড়ে ওঠা ও পড়ালেখা। একই এলাকায় তিনি স্ত্রী লুৎফন নেছাকে নিয়ে স্থায়ীভাবে সংসার গড়ে তোলেন। যদিও পরিবারের সদস্যরা মাঝে মধ্যে গ্রামের বাড়ি মহিষবাথানে আসতেন। গতকাল শনিবার উপজেলার মহিষবাথান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শোকাহত স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়ে স্তব্ধ পুরো বাড়ি।
জহুরুল হক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। দুই ছেলের মধ্যে জামিল ছিলেন বড়। ছোট ছেলে জোবায়ের হোসেন। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে জামিলকে ঘিরে সবার অনেক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ছিল। সেই স্বপ্নই আজ শোকে রূপ নিয়েছে। জামিল ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন।
জামিলের মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ পুরো মহিষবাথান গ্রাম। বাড়ির আঙিনায় জড়ো হয়েছেন স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনরা। সবার মুখে একই প্রশ্ন- কীভাবে এমন পরিণতি হলো। স্বজনরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন জামিলের মরদেহ দেশে ফেরার। তবে গ্রামের বাড়িতে তার মা-বাবা ও ছোট ভাই নেই। তাদের ঘরে তালা ঝুলছে। বাড়িতে থাকা চাচা-চাচিসহ স্বজনদের দাবি- জামিলের মৃত্যু প্রকৃত রহস্য উদ্?ঘাটন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
জামিলের বাবার বন্ধু জসিম উদ্দিন বলেন, ছোটবেলা থেকেই জামিল অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত। পড়ালেখার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে তার বড় স্বপ্ন ছিল। এমন সম্ভাবনাময় জীবনের অকাল সমাপ্তি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তারা।
চাচা জিয়াউল হক বলেন, ‘জহুরুল হক আমার ছোট ভাই। সে দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের মাওনা এলাকায় বসবাস করেন। আমার দুই ভাতিজা ঢাকায় লেখাপড়া করত। জামিল বাংলাদেশে লেখাপড়া শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল। নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকে আমরা এক রকম স্তব্ধ হয়ে গেছি। কীভাবে এই ঘটনা ঘটল, তার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
এদিকে নিখোঁজ নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির গ্রামের বাড়িতেও বইছে শোকের মাতম। তার করুণ মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছে না পরিবার। হত্যাকারীর কঠোর শাস্তি ও বিচার চান তারা।
নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায়। তার বাবার নাম জহির উদ্দিন আকন ওরফে দিল মোহাম্মদ। জহির উদ্দিন দুই যুগের বেশি সময় ধরে রাজধানী ঢাকার মিরপুর ১১ নম্বরে পরিবার নিয়ে থাকেন। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি লাইফ ইন্সু্যুরেন্স কোম্পানিতে কর্মরত রয়েছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জহির উদ্দিন আকন বলেন, ‘মেয়ের সঙ্গে আমাদের রোজই কথা হতো। গত বৃহস্পতিবার আমার সবশেষ কথা হয়। তখন বৃষ্টি ওর ক্যাম্পাসের ল্যাবের ডেস্কে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছিল। এর পর থেকে বৃষ্টির ফোন বন্ধ। পরে বাংলাদেশি অন্য শিক্ষাার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও বৃষ্টির কোনো সন্ধান পাইনি। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ আমাদের বৃষ্টির মৃত্যুর সংবাদ জানিয়েছে।
জহির উদ্দিন আকন আরও বলেন, ‘আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। পড়ালেখায় খুব ভালো ছিল। কীভাবে কী থেকে কী যে হয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারছি না। দূর থেকে যে যাই বলছে শুনতে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মেয়ের সঙ্গে বাঙালি কমিউনিটির অন্য শিক্ষার্থীদের ভালো সম্পর্ক ছিল। ঘনিষ্ঠতা ছিল কয়েকজনের সঙ্গে। এর মধ্যে একজন লিমন। ওরা ভালো বন্ধু ছিল।’
বৃষ্টির পরিবারের সূত্র জানায়, ঢাকার মিরপুরের নাহার একাডেমি হাইস্কুল থেকে ২০১৪ সালে জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) নিয়ে এসএসসি পাস করেন নাহিদা সুলতানা। পরে শহীদ বীরউত্তম লেফটেন্যান্ট আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকেও জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) নিয়ে এইচএসসি পাস করে। এর পর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে ঢাকার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়। তবে স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ফুল স্কলারশিপে পিএইচডি করার সুযোগ পায়। ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করে নাহিদা।
বৃষ্টির হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে মাদারীপুরে লোকজন ভিড় করছেন। শনিবার বিকালে সরেজমিনে দেখা যায়, কেউ বৃষ্টির মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। তারা অপরাধীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি, দ্রুত বৃষ্টির লাশ খুঁজে বের করে দেশে আনা হোক। পাশাপাশি অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
বৃষ্টির চাচাতো বোন তুলি আকন বলেন, ‘বৃষ্টি আপু অনেক মেধাবী ছিলেন। অনেক ভালো ছিলেন। সকালে জাহিদ ভাইয়া (বৃষ্টির বড় ভাই) তার ফেসবুকে আপু মারা যাওয়া নিয়ে পোস্ট দেন, তা দেখে আমরা প্রথমে জানতে পারি। তবে এর আগে থেকেই আপু নিখোঁজ ছিলেন। কীভাবে, কেন তাকে হত্যা করা হলো, তা আমরা কিছুই জানি না। তার এক সহপাঠীকেও হত্যা করা হয়েছে। শুনেছি তার লাশ পাওয়া গেছে। কিন্তু আপুর লাশ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।’
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ‘আমি বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি বৃষ্টি নামে মাদারীপুরের এক শিক্ষার্থী আমেরিকায় মারা গেছে। এ ক্ষেত্রে মূল কাজ করবে দূতাবাস। আমার কাছে তার পরিবার যদি কোনো সহযোগিতা চায়, আমি সেটা করব। দূতাবাস যদি স্থানীয় কোনো তথ্য চায়, সেটাও দিতে পারব।’
যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ হন লিমন ও বৃষ্টি নামের দুই শিক্ষার্থী। দুজনই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী। ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন লিমন। অন্যদিকে নাহিদা পিএইচডি করছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার দুজনকে সর্বশেষ ক্যাম্পাসে দেখা গিয়েছিল। গত শুক্রবার জামিলের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। ফ্লোরিডার হিলসবরোর স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্লোরিডার ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্য্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের কথা জানায়। তাদের নিখোঁজের ঘটনায় হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের ২৬ বছরের আমেরিকার এক নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তবে তাকে প্রেপ্তার করা হয়েছে তার বাড়ি থেকে।
সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র সিএনএনকে জানান, আবুঘরবেহ ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। তিনি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
হিশাম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে বলে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে এমন হত্যাকে ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার বলে।
হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের (পুলিশ) কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদের পর শুক্রবার ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে।
Posted ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh