বাংলাদেশ অনলাইন ডেস্ক : | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাই আন্দোলন দমনে তার সরকারের একাধিক মন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ও সিনিয়র নেতাদের ফোনালাপ-গোপন অডিও অকাট্য দলিল। গত ৬ মাসে প্রসিকিউশন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব দলিল উপস্থাপন করেছে।
এসব অডিও-ফোনালাপে শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, হাছান মাহমুদ, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, ঢাকা দক্ষিণের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও জাসদের হাসানুল হক ইনুসহ বিভিন্ন নেতার মধ্যকার কথোপকথন উঠে আসে। এতে আন্দোলন দমনে মারাত্মক নির্দেশনার তথ্য প্রকাশিত হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর গুলির নির্দেশসহ পালটা হামলা ও আগুন দেওয়ার নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। ওবায়দুল কাদের ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের একটি ফোনালাপে আন্দোলনে সংঘর্ষের খবর বা ভিডিও দেখালে টেলিভিশনের সম্প্রচার তাৎক্ষণিকভাবে এবং সারা জীবনের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি ও নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রসিকিউশনের এসব দলিল ডকুমেন্টস আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, গত দুই বছরে প্রসিকিউশন অন্তত ৩০টি অডিও ও ১০০০ কল লিস্ট শনাক্ত করেছে। প্রসিকিউশন ও সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই অডিও রেকর্ডের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অডিও প্রমাণগুলো শেখ হাসিনা এবং তার শীর্ষ মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করা অনেক সহজ করে তুলবে। বিচার প্রক্রিয়ায় এসব ডকুমেন্টস অকাট্য দলিল হিসাবে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আর বাকি তিনটি বর্তমান সরকারের আমলে রায় হয়। রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ের অপেক্ষায় আছে আরও এক মামলা। দুই মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে। বিচারাধীন রয়েছে ২৩ মামলা ও তদন্তাধীন ৪১ মামলা।
এ সরকারের সময় শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র দাখিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডে হাসিনা, মখা আলমগীর, শামসুল হক টুকু, ইনু ও দীপু মনিসহ ৪১ জন অভিযুক্ত। ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের শাসনামলের গুম, খুন ও নির্যাতনের ৭১টি মামলা রয়েছে। তবে গুম-খুনের কোনো মামলার রায় এখনো হয়নি। এই ৭১ মামলায় আসামি ৫০২। এর মধ্যে পলাতক ৩১৫ জন। গ্রেফতার ১৮৪ জন। এক আসামি আত্মহত্যা করেছেন। ক্ষমা করা হয়েছে একজনকে। গ্রেফতার থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত সাজা ভোগ করেছেন এক আসামি।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড বড় প্রমাণ : ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শিত অডিওতে শোনা যায়, আন্দোলনকারীদের বাড়িঘর, গাড়ি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করে তা জ্বালিয়ে দিতে হবে। জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে র্যাব, বিজিবি ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ওপর থেকে সরাসরি অ্যাকশন নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের মৃত্যুর দায় ছাত্র এবং বিরোধী দলগুলোর (বিএনপি-জামায়াত) ওপর চাপানোর বিষয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে আলোচনা করতে শোনা যায়। প্রসিকিউশন জানায়, শেখ হাসিনা নিজেই দলের নেতাদের ওপর নজরদারির জন্য ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার ব্যবহার করতেন। অভ্যুত্থানের সময় সরকারি সংস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হওয়া এই কলগুলোই এখন তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসাবে হাজির হয়েছে।
ডিজিটাল ডকুমেন্টস বিচার প্রক্রিয়ায় এসেছে স্বচ্ছতা : তানভীর হাসান জোহা একজন বাংলাদেশি সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। তিনি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনী অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণের বিধান যুক্ত করা হয়। জুলাই আন্দোলন দমনে সরকারের তরফ থেকে যেসব গোপন অডিও ফোনালাপ, ভিডিও ও কল লিস্ট ছিল সেসব উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, এসব ডকুমেন্টস মুছে ফেলা হয়েছিল, যা পরে উদ্ধার করা হয়। এসব ডকুমেন্টস উপস্থাপনের ফলে বিচার প্রক্রিয়ায় অনেকটা স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত হচ্ছে।
সংঘাতের খবর দিলে টেলিভিশন বন্ধ : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে তৎকালীন সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘আজকে যেন কোনো সংঘাতের খবর না দেয়।’ এর জবাবে আরাফাত বলেছিলেন, “আজকে যদি কোনো ক্ল্যাশের (সংঘাত) বা মারামারির ভিডিও ফুটেজ বা ছবি দেখায় (টেলিভিশন চ্যানেলগুলো), ওদেরকে ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ (রাষ্ট্রের শত্রু) হিসাবে ডিক্লেয়ার (ঘোষণা) করা হবে এবং সারা জীবনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।” গণ-অভ্যুত্থানের সময় ওবায়দুল কাদের ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের মুঠোফোনের কথোপকথনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। এই অডিও কথোপকথন ১০ আগস্ট উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় ট্রাইব্যুনালে এগুলো আমলে নেওয়া হয়। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আসামিরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধ ঠেকাতে পারেননি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ওবায়দুল কাদের অপরাধ ঠেকানোর চেষ্টা না করে সরাসরি মারার জন্য নির্দেশ দেন।
বর্তমান সরকারের আমলে তিন রায় : গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৯ এপ্রিল দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এছাড়া রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. হাসিবুর রশীদসহ ২৮ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। পঞ্চম রায় আসে গত ২৮ জুন। গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-১। অন্য পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সর্বশেষ ৩০ জুন ঘোষণা করা ষষ্ঠ রায়ে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুটি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ২৩টি মামলায় ৩১৬ আসামির বিচার চলছে। এর মধ্যে ৬টি মামলার আসামি শেখ হাসিনা।
এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তিন মামলার রায় ঘোষণা হয়। প্রথম রায়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-১। অপর আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
Posted ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh