বাংলাদেশ অনলাইন ডেস্ক : | রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ হয়তো আপাতত শেষ হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো তীব্র জ্বালানিসংকটে ভুগছে। বিশেষ করে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
দেশের স্পিনিং, নিটিং ও ডায়িং কারখানাগুলো বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল ব্যবহার করে। আর বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল ও গ্যাস আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। জ্বালানির বাড়তি দাম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। গত ৬ জুন, বড় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপ ঢাকায় তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানা থেকে প্রায় এক হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন, যাঁদের বেশির ভাগই নারী। তাঁরা জারা এবং এইচঅ্যান্ডএমের মতো পশ্চিমা ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করেন। প্রায় চার কোটি মানুষ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। গত বছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই এসেছে পোশাক খাত থেকে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩ শতাংশ। চীনের পর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ।
গত মে মাসে সরকার ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় গড়ে প্রতিদিনি প্রায় দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামে বিদ্যৃিবভ্রাট কখনো কখনো দিনে আট ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। উৎপাদন চালিয়ে রাখতে কিছু কারখানার মালিক ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু দক্ষতানির্ভর এই শিল্পে, বাংলাদেশ এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভের আবিল বিন আমিনের ভাষায়, ‘জেনারেটর চালু করতেই যে ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে, সেটিও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।’ গত ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
উৎপাদনে বিলম্ব, পরিবহন বিঘ্ন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ভোক্তাদের কম পোশাক কেনার প্রবণতার কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোও কম অর্ডার দিচ্ছে। ঢাকার একটি জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নকিব জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁর কারখানার অর্ডার প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে; আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কাঁচামালের খরচও বেড়েছে। সিনথেটিক ফাইবার, রং, ফিনিশিং কেমিক্যাল, প্লাস্টিকের বোতাম ও চেইন সবকিছুতেই পেট্রোকেমিক্যাল ব্যবহৃত হয় এবং এগুলো মিলিয়ে একটি পোশাক তৈরির মোট খরচের প্রায় ৬৫ শতাংশ। বাংলাদেশে উৎপাদিত পোশাকের প্রায় ৩০ শতাংশ পলিয়েস্টার ফাইবার ও সুতা দিয় তৈরি হয়, যা ন্যাফথা থেকে উৎপাদিত। যুদ্ধ শুরুর পর ন্যাফথার দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে গেছে। এ ছাড়া দেশের পোশাক শিল্প খণ্ডে খণ্ডে; কিছু সমন্বিত টেক্সটাইল মিল থাকলেও বেশির ভাগ কারখানা উৎপাদন প্রক্রিয়ার শুধু একটি ধাপ সম্পন্ন করে। আবদুল্লাহ হিল নকিবের হিসাবে, পরিবহন ব্যয় তাঁর প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
মে মাসে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকটে থাকা ব্যবসাগুলোর জন্য ৬০০ বিলিয়ন টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, যার সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয় পোশাক শিল্পের জন্য। তবে এসব ঋণের সুদের হার প্রায় ৭ শতাংশ, যা এরই মধ্যে আর্থিক চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বহন করা কঠিন।
মহামারির সময় উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের জন্য বেশি দাম দিতে রাজি হয়নি। এবারও পরিস্থিতি একই রকম। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানায় অন্তত ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ৭ জুন মাধবপুরের কোরটেক্স অ্যাপারেলস কারখানায় কাজে এসে সামলী খাতুন দেখতে পান, কারখানার ফটকে ছাঁটাইয়ের নোটিশ ঝুলছে। তিনি বলেন, ‘আমার জন্য আরেকটা চাকরি খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন হবে। একজন নারী হিসেবে আমার সুযোগও সীমিত। হয়তো আমাকে গ্রামে ফিরে যেতে হবে।’
Posted ১১:০১ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh