ঢাকা : | সোমবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৪
ভোট পর্ব শেষ হলেও সারা দেশজুড়ে নির্বাচনী সংঘাত সহিংসতা কমছে না। যার বেশিরভাগ হচ্ছে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে। এ কারণে বেশ চিন্তিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্র। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সোমবার (২২ জানুয়ারি) জরুরী কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির জরুরী বৈঠক ডেকেছে দলের হাইকমান্ড। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ওই জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে নির্বাচন পরবর্তী দেশের রাজনীতি ও আর্থ সামাজিক বিষয়েও আলোচনা হতে যাচ্ছে দলের ওই বৈঠকে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগের আজকের (সোমবার) কেন্দ্রীয় কমিটির আলোচনায় নির্বাচন পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন আলোকপাত করা হবে, তেমনি নির্বাচনের পরে যে সকল সংঘাত ও সংঘর্ষ হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়া দেশের আর্থ সামাজিক বিষয়েও আলোচনা হবে। এ ছাড়া বিএনপি যদি আন্দোলন করে তা কিভাবে মোকাবেলা করা যায় তা নিয়ে বিশ্লেষণ থাকবে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা হবে। এ ছাড়া গুজব প্রতিরোধ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে।জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন থেকে পরবর্তী ১০ দিনে ভোটকেন্দ্রিক সংঘাতে ৭জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পুলিশের আট সদস্যসহ সাড়ে চার শতাধিক ব্যক্তি। ভোটের দিন ৭ জানুয়ারি থেকে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৩৪৫টি সংঘাতে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। বেসরকারি সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) গত বুধবার জানিয়েছিল, গত ১৫ নভেম্বর সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই মাসে নির্বাচনী সহিংসতায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২ হাজার ২০০ জনের বেশি।
দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভোট পরবর্তী নির্বাচনী সংহিংসতা এখন শেষ হচ্ছে না। স্থানীয় পর্যায়ে জেলায় জেলায় আওয়ামী লীগের মধ্যে খুনোখুনি চলমান রয়েছে। নির্বাচনি বিরোধের ফলে তৃণমূল আওয়ামী লীগের অনেক জেলায় এখন মুখোমুখী। এই দুইপক্ষের বিরোধে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো। পাল্টাপাল্টি হামলা-মামলা, মারধর, ভাঙচুরে জর্জরিত দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। দলের তৃণমূল সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের পরো ভোটের আগের মতই জেলায় জেলায় আওয়ামী লীগ মনোনীত আর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। এদিকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ঘি ঢালছে নৌকাবঞ্চিত একাদশের এমপিদের লোকজনও। অনেক ক্ষেত্রে চেইন অব কমান্ডও মানছে না তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।
সংঘাত নিয়ন্ত্রণের আওয়ামী লীগ থেকে সার্বক্ষনিক নজরদারি রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা। তিনি বলেন, দল করলে দলের চেইন অব কমান্ড মানতে হবে, এই বার্তাই আওয়ামী লীগের তৃণমূলে দেওয়া হচ্ছে। আর যারাই সংঘাত ও সহিংসতায় জড়াবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শান্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সিরিয়াস। তাই এটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
দলের তৃণমূল ও বিভিন্ন স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন পরবর্তী সংঘাতের মধ্যে প্রায় সব কয়টিই সংঘাতের ঘটনাই ঘটেছে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। এই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। ৭ জানুয়ারি ভোটের দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত সংঘাতে নোয়াখালী, মাদারীপুর, নেত্রকোনা ও ঝিনাইদহেই ৪জন নিহত হন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি হামলায় আহত হন প্রায় দুই শতাধিক। এছাড়া শারীরিক নির্যাতন ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।
আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচন পরবর্তী সংঘাতের মধ্যে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার সিদ্ধকাঠি ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কাজী ফুয়াদকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। কুমিল্লার দেবীদ্বারের গুনাইঘর দক্ষিণ ইউনিয়নে নৌকা ও ঈগল প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়। ওই মারামারিতে নৌকা প্রতীকের সমর্থক নওয়াব আলী নিহত হন। মুন্সিগঞ্জ সদর-গজারিয়ার মিরকাদিম পৌরসভার রিকাবী বাজারের টেংগর এলাকায় জিল্লুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি নৌকার সমর্থক ছিলেন। যশোরের মনিরামপুরে ঈগল প্রতীকের সমর্থক মশিয়ার রহমান নৌকার সমর্থক হাবিবুর রহমানকে আঘাত করেন। যশোরের শংকরপুর বিদ্যালয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয় এবং একজন আনসার সদস্য আহত হন। পিরোজপুর মঠবাড়িয়ার স্বতন্ত্র প্রার্থী রুস্তম আলী ফরাজীর দুজন সমর্থককে পিটিয়ে আহত করা হয়। লালমনিরহাটে সংঘর্ষে নৌকা প্রতীকের দুজন ও ঈগল প্রতীকের একজন আহত হন। চট্টগ্রামে খুলশী থানায় নৌকা প্রতীক এবং ফুলকপি প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে একজন গুলিবিদ্ধ হন। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানায় ভোটকেন্দ্রের নৌকা প্রতীকের সমর্থকেরা ঈগল প্রতীকের ওপর হামলা করেন। এতে ঈগলের সমর্থক তাহিজুল ইসলাম আহত হন।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের বিভেদ ঘুচাতে জেলায় জেলায় সফর করবেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। ভেদাভেদ ভুলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের এক হয়ে কাজ করার বার্তা দেবেন তারা। সহিংসতার বিরুদ্ধে দলীয় প্রধানের কঠোর নির্দেশনা পৌঁছে দেবেন। ভোট-পরবর্তী সহিংসতায় আওয়ামী লীগ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ বিষয়গুলো আজকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে দলের কেন্দ্রীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নির্বাচনী সংঘাতের বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ইনকিলাবকে বলেন, এবারে অন্যবারের চেয়ে নির্বাচনী সংঘাত ও সংহিতা অনেক কম হয়েছে। তবে আমাদের কথা হচ্ছে, কি কারণে নির্বাচনী সংঘাত হতে? সংঘাত সহিংসতা তো কোনভাবেই কাম্য নয়। এটা যাতে কোনভাবেই না হয় সে বিষয়ে আমাদের আগামীকালের (আজ) বৈঠকে আলোচনা হবে। সেই সঙ্গে সিদ্ধান্তও আসতে পারে। নির্বাচন পরবর্তী সংঘাত সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিনি বলেন, এই সংঘাত এখন নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে রয়েছে। এ নিয়ে আমরা কাজ করছি। এটাই এখন দলের বিবেচ্য বিষয়।
Posted ১:০৩ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh