জাফর আহমাদ | বৃহস্পতিবার, ০৬ জুন ২০২৪
আমরা মুসলিম, মুসলিম আমাদের পরিচয়। মুসলিম ব্যতিত অন্য কোন নামে আমরা পরিচিতি লাভ করতে পারি না। আমরা মুসলিম উম্মাহ্র অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহই আমাদেরকে মুসলিম নাম দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের রব, ইসলাম আমাদের জীবন ব্যবস্থা, আমাদের মুসলিম, মুহাম্মদ সা: আমাদের নবী, পথপ্রদর্শক ও অনুকরণীয়-অনুসরনীয় আদর্শ নেতা, কুরআন হচ্ছে আমাদের জীবন চলার পথ নির্দেশিকা।
আমাদের প্রধান পরিচয় হলো, আমরা মুসলিম। সুতরাং এই নামেই আমাদেরকে পরিচিতি লাভ করতে হবে। অন্য কোন গোষ্ঠী বা দলের নামে আমরা পরিচিতি লাভ করতে পারি না। কুরআন ও হাদীস কখনো আমাদেরকে অন্য নামে পরিচিতি লাভ করার অনুমোদন দেয় না। যেমন: আহলে হাদীস, হানাফী, সালাফী, শাফেয়ী, হাম্বলী, মালেকী, ওয়াহাবী, সুন্নি, বেরলভী, দেওবন্দী, মাইজভাণ্ডারী, গাউসিয়া, কাদেরীয়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আল্লাহর পথে জিহাদ করো যেমন জিহাদ করলে তার হক আদায় হয়। তিনি নিজের কাজের জন্য তোমাদেরকে বাছাই করে নিয়েছেন এবং দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি।
তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও। আল্লাহ আগেও তোমাদের নাম রেখেছিলেন “মুসলিম” এবং এর (কুরআন) মধ্যেও (তোমাদের নাম এটিই) যাতে রাসুল তোমাদের সাক্ষী হন এবং তোমরা সাক্ষী হও লোকদের ওপর। কাজেই সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও এবং আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাও। তিনিই তোমাদের অভিভাবক, বড়ই ভালো অভিভাবক তিনি, বড়ই ভালো সাহায্যকারী তিনি।”(সুরা হজ্জ:৭৮) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,“সেই ব্যক্তির কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে ডাকলো, সৎকাজ করলো এবং ঘোষনা করলো আমি মুসলমান।”(সুরা হামিম আস সাজদা:৩৩)
প্রথম আয়াতটিতে “তোমাদের” সম্বোধনটি শুধুমাত্র এ আয়াতটি নাযিল হবার সময় যেসব লোক ঈমান এনেছিল অথবা তারপর ঈমানদারদের দলভুক্ত হয়েছিল তাদের উদ্দেশ্য করা হয়নি বরং মানব ইতিহাসের সূচনা থেকেই যারা তাওহীদ, আখেরাত, রিসালাত ও আসমানী কিতাবের প্রতি বিশ^াস স্থাপনকারী দলভুক্ত থেকেছে তাদের সবাইকে এখানে সম্বোধন করা হয়েছে। এখানে মূল বক্তব্য হচ্ছে, এ সত্য মিল্লাতের অনুসারীদেরকে কোনদিন “নুহী” “ইয়াকুবী”
“ইবরাহিমী”“মুসাবী” “সুলাইমানী ইত্যাদি বলা হয়নি বরং তাদের নাম “মুসলিম” (আল্লাহর ফরমানের অনুগত) ছিল এবং আজো তারা “মুহাম্মাদী” নয় বরং মুসলিম। যেমন; আল্লাহ তা’আলা বলেন,“(হে মুসলমানরা!) তোমরা বলো, “আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি, যে হিদায়াত আমাদের প্রতি নাযিল হয়েছে তার প্রতি এবং যা ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও ইয়াকুবের সন্তানদের তাদের রবের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিল তার প্রতি। তাদের কারো মধ্যে আমরা পাথর্ক্য কনি না। আমরা সবাই আল্লাহর অনুগত “মুসলিম”।”(সুরা বাকারা: ১৩৬)
মুসলিম কাকে বলে। যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগত হয়, আল্লাহকে নিজের মালিক, রব ও মাবুদ হিসেবে মেনে নেয়, নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে দেয় এবং দুনিয়ায় আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করে সে-ই ‘মুসলিম’। এ বিশ^াস ও কর্মপদ্ধতির নাম ‘ইসলাম’ মানব জাতির সৃষ্টিলগ্ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন জাতির মধ্যে যেসব নবী এসেছেন এটিই ছিল তাঁদের সবার দীন ও জীবন বিধান। ফলে তাঁরা সকলেই মুসলিম হিসাবে পরিচয় বহন করতেন। মহান আল্লাহ তা’আলা ইবরাহিম আ: থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা নিলেন, অবশেষে বললেন, “যখন তার রব তাকে বললো ‘মুসলিম হয়ে যাও’। তখনই সে বলে উঠলো, “আমি বিশ^-জাহানের প্রভুর “মুসলিম” হয়ে গেলাম। ঐ একই পথে চলার জন্য সে তার সন্তানদের উপদেশ দিয়েছিল ইয়াকুবও তার সন্তানদেরকে। সে বলেছিল “আমার সন্তানেরা! আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দীনটিই পছন্দ করেছেন। কাজেই আমৃত্যু তোমরা মুসলিম থেকো।”(সুরা বাকারা:১৩১-১৩২)
শুরুতে উল্লেখিত সুরা হজ্জের ৭৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন,“এবং দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি। অর্থাৎ পূর্ববর্তি উম্মতদের ফকীহ, ফরিশী ও পাদরীরা তাদের ওপর যেসব অপ্রয়োজনীয় ও অযথা নীতি-নিয়ম চাপিয়ে দিয়েছিল সেগুলো থেকে তোমাদেরকে মুক্ত করে দিয়েছেন। আমাদের মাঝে আজ যারা আল্লাহর দেখানো রাজপথকে বাইপাস করে চিবাগলির সরু অসংখ্য পথ-মত তৈয়ার করেছে এবং বিশেষ নামে মুসলিমদের নামকরণ করেছে এবং এই নামে পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অবশ্যই তাদেরকে পরিহার করে আল্লাহর দেয়া নামেই নিজেদের পরিচিতি লাভ করতে হবে। আর সেই পরিচিতি হলো, “মুসলিম”।
সত্যিকারের তরীকা তো একটিই সেটি হলো, সুন্নাতে রাসুলিল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাদের পরিচিতিও একটি সেটি হলো, তারা মুসলিম। যেই পথ-পদ্ধতি ও পরিচয় দিয়েই আল্লাহ তাঁকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নির্দেশিত পথ ও পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সেটিই একমাত্র পথ। সাহাবাতুর রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীনসহ আয়েম্মায়ে মুজতাহিদিন কি নিজস্ব কোন তরীকা-পথ পদ্ধতি বা আলাদা কোন সুন্নাহ তৈরী করে গেছেন? তাহলে আমরা কেন এই বাইপাস বা শাখা পথ তৈরী করবো এবং ভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করবো? কে অনুমতি দিল? আল্লাহ তা’আলা বলেন,“এ ইসলাম ছাড়া যে ব্যক্তি অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করতে চায় তার সে পদ্ধতি কখনোই গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ব্যর্থ, আশাহত ও বঞ্চিত।”(সুরা আলে ইমরান:৮৫)
স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও এই পরিবর্তনের অনুমতি দেয়া হয়নি। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে নবী তোমার রবের কিতাবের মধ্য থেকে যা কিছু তোমার ওপর অহী করা হয়েছে তা (হুবহু) শুনিয়ে দাও। তাঁর বক্তব্য পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই তাঁকে ছাড়া তুমি কোন আশ্রয়স্থল পাবে না।”(সুরা কাহফ:২৭) অর্থাৎ যদি কেউ কারো স্বার্থে তার মধ্যে পরিবর্তন করে, তাহলে আল্লাহ তা’আলার আশ্রয় থেকে সে বেরিয়ে যাবে। আর আল্লাহকে ছাড়া কোন আশ্রয়স্থল পাবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“(হে মুহাম্মদ!) বলো, আমার রব নিশ্চিতভাবেই আমাকে সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। একদম সঠিক নির্ভুল দীন, যার মধ্যে কোন বক্রতা নেই, ইবরাহিমের পদ্ধতি, যাকে সে একাগ্রচিত্তে একমুখী হয়ে গ্রহণ করেছিল এবং সে মুশরিকদের অন্তরভুক্ত ছিল না। বলো, আমার সালাত, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান, আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য, যার কোন শরীক নেই। এরি নির্দেশ আমাকে দেয়া হয়েছে এবং সবার আগে আমিই মুসলিম।”(সুরা আন’আম:১৬১-১৬৩)
যারা আল্লাহর দেয়া বিধানকে আঁকড়ে ধরে। পথ নির্দেশনা ও জীবন যাপনের বিধান তাঁর কাছ থেকেই নেয়। তাঁরই আনুগত্য করে। তাঁকেই ভয় করে, তাকেই খুশি রাখে। তারা মুসলিম ও ইসলাম ছেড়ে কখনো ভিন্ন নামে পরিচিয় লাভ করতে পারে না। আশা-আকাংখা তাঁরই সাথে বিজড়িত করে। সাহায্যের জন্য তাঁরই কাছে হাত পাতে। তাঁরই সত্তার ওপর নির্ভর করে তাওয়াক্কুল ও আস্থার বুনিয়াদ গড়ে তুলে। ভিন্ন মত-পথ ও পরিচয় পরিত্যাগ করে। তারা রবের দেয়া নামেই পরিচিতি লাভ করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে। ইব্রাহিম আ: এর মতো সগৌরবে বলে উঠে আমি বিশ^-জাহানের মালিক ও রবের আনুগত্যশীল মুসলিম। আমি মুসলিম উম্মাহর একজন সদস্য। আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় করো। মুসলিম থাকা অবস্থায় ছাড়া যেন তোমাদের মৃত্যু না হয়।”(সুরা আলে ইমরান:১০২) অর্থাৎ আমৃত্যু তোমরা মুসলিম থাকবে। আল্লাহর আনুগত্য ও বিশ^স্ত থাকা অবস্থায় মৃত্যু করবে।
Posted ১:২৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ জুন ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh