জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন ২০২৫
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ,প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর মুখাপেক্ষী। কারণ তাঁর সাহায্য-সহযোগীতা কারো আিস্তত্বের জানান দেয়া অসম্ভব। অমুখাপেক্ষী কেবলমাত্র আল্লাহ তা’আলা। তিনি এমন এক সার্বভৌম ক্ষমতাধর সত্তা যাকে পৃথিবীর কোন মানুষই যদি না মানে, তাঁর আনুগত্য অস্বীকার করে, তাঁর সাথে বিদ্রোহ করে তথাপি তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হয় না। তিনি এক ও একক।
কেউ তাঁর সাথে শরীক নাই। কেউ তাঁর প্রশংসা করুক আর না করুক, তাতে তাঁর কিছুই যায় আসেনা, কারণ তিনি নিজে নিজেই প্রশংসিত। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হে লোকেরা! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী এবং আল্লাহ তো অমুখাপেক্ষী, অভাবমুক্ত ও প্রশংসার্হ।”(সুরা ফাতির:১৫) দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানে আমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি এমন নন যে, মানুষ তাঁকে আল্লাহ বলে মেনে না নিলে তার সার্বভৌম ও একচ্ছত্র কর্তৃত্ব চলবে না এবং মানুষ তার ইবাদাত ও বন্দেগী না করলে তার কোন ক্ষতি হয়ে যাবে, এ ভুল ধারণা পোষণ করা বোকামী। প্রকৃত কথা হচ্ছে, পৃথিবীর মানুষসহ সকল সৃষ্টিই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনিই কেবলমাত্র মুখাপেক্ষীহীন সত্তা।
তিনি যদি আমাদের জীবিত না রাখেন এবং যেসব উপকরণের সহায়তায় আমরা পৃথিবীতে বেঁচে থাকি এবং কাজ করতে পারি সেগুলোর সরবরাহ যদি তিনি বন্ধ করে দেন তাহলে আমাদের জীবন এক মুহুর্তের জন্য টিকে থাকতে পারে না। কাজেই তাঁর অনুগত্য ও ইবাদাতের পথ অবলম্বন করার জন্য আমাদেরকে তাকীদ দেয়া হয় তা এ জন্য নয় যে, আল্লাহর প্রয়োজন আছে বরং এ জন্য যে, এরি ওপর নির্ভর করে আমাদের দুনিয়ার ও আখিরাতের সাফল্য। এমনটি না করলে আমরাদের নিজেদেরই সর্বনাশ হবে, আল্লাহ তা’আলার কোন ক্ষতি হবে না। কারণ তিনি অভাবমুক্ত ও অমুখাপেক্ষী। সুবহানা’আল্লাহ-আল্লাহ মহাপবিত্র অর্থাৎ তিনি মানবীয় সকল প্রকার দূর্বলতা থেকে মহাপবিত্র। মানুষের যেমন অন্যের স্বীকৃতির প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু আল্লাহ তা’আলা তার কোন কিছুতেই অন্যের স্বীকৃতির প্রয়োজন পড়ে না।
উল্লেখিত আয়াতে ‘গনী’ ও ‘হামীদ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। দুটোই আল্লাহর গুণবাচক নাম। এগুলোর মানে হচ্ছে, তিনি অমুখাপেক্ষী, অভাবমুক্ত ও নিজে নিজেই প্রশংসিত বা প্রশংসার্হ। তিনি সবকিছুর মালিক, প্রত্যেকটি জিনিসের অভাবমুক্ত ও অমুখাপেক্ষী। তিনি কারো সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন।
কেউ তাঁর প্রশংসা করুক আর না করুক তথাপি তিনি নিজে নিজেই প্রশংসিত। আল্লাহর উল্লেখিত দু’টি গুণকে একসাথে বর্ণনা করার কারণ হচ্ছে এই যে, নিছক গনী তো এমন ব্যক্তিও হতে পারে যে নিজের ধনাঢ্যতার দ্বারা কারো সাহায্য বা উপকার করে না। এখানে সে গনী হবে কিন্তু হামীদ হবে না।
হামীদ তো হতে পারে এমন অবস্থায় যখন সে কারো সাহায্যে নিজে লাভবান হবে না কিন্তু নিজেরধন সম্পদ থেকে অন্যদেরকে সব ধরনের সহায়তা দান করবে। আল্লাহ যেহেতু এ দুটি গুনের পূর্ণ আধার তাই বলা হয়েছে তিনি নিছক গনী নন বরং এমন গুন যিনি সব রকমের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা লাভের অধিকারী। কারণ তিনি তোমাদের এবং বিশ্ব জাহানের যাবতীয় জড় ও জীবের প্রয়োজন পূর্ণ করেন।
পৃথিবীর তামাম সৃষ্টিকুলের কেহ যদি তাঁর তাসবীহ, তাহলীল, তাহমিদ ও তাকবির না করে তবু তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতার এতটুকু কিছুই যায় আসে না। কারণ তিনি মুখাপেক্ষীহীন এক প্রবল পরাক্রান্ত সত্ত্বা। তিনি নিজে নিজেই প্রশংসিত। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ এবং অধিক মাত্রায় আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো। আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।” (সুরা জুমআ:১০) আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমি লোকমানকে সুক্ষèজ্ঞান দান করেছিলাম যাতে সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে সে তার কৃতজ্ঞতা হবে তার নিজের জন্য লাভজনক। আর যে ব্যক্তি কুফরী করবে, সে ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ অমুখাপেক্ষী এবং নিজে নিজেই প্রশংসিত।”
(সুরা লোকামন:১২) আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তিনি ঘুমান না এবং তন্দ্রাও তাঁকে স্পর্শ করে না।”(সুরা বাকারা:২৫৫) মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর সত্তাকে যারা নিজেদের দূর্বল অস্তিত্বেও সদৃশ মনে করে এবং যাবতীয় মানবিক দুর্বলতাকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করে, এখানে তাদের চিন্তা ও ধারণার প্রতিবাদ করা হয়েছে। যেমন বাইবেলের বিবৃতি মতে আল্লাহ ছয় দিনে পৃথিবী ও আকাশ সৃষ্টি করেন এবং সপ্তমদিনে বিশ্রাম নেন।
মহান আল্লাহ এ সমস্ত দূর্বলতা এবং এদের চিন্তা থেকে মহাপবিত্র। তিনি চিরস্থায়ী ও চিরঞ্জীব। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তাঁর কর্তৃত্ব আকাশ ও পৃথিবী ব্যাপী। এগুলোর রক্ষাবেক্ষন তাঁকে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত করে না। মূলত: তিনিই এক মহান ও শ্রেষ্ট সত্তা।”(সুরা বাকারা:২৫৫) তিনি ঘুম,তন্দ্রা, ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত ও বিশ্রাম থেকে পবিত্র। কেই সকাল বিকাল আল্লাহর তাসবীহ করলো কি করলো না তাতে আল্লাহর কিছুই যায় আসে না।
তিনি মুখাপেক্ষীহীন সত্তা। তাসবীহ করলেও তিনি পবিত্র না করলেও তিনি পবিত্র। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আল্লাহুস সামাদ অর্থাৎ আল্লাহ কারোর ওপর নির্ভরশীল নন এবং সবাই তাঁর ওপর নির্ভরশীল। তিনি বেনিয়াজ, অমুখাপেক্ষী। তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনি কারোর সন্তান নন।”(সুরা ইখলাস:২-৩)
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ“ যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে এবং ব্যয় করার পর নিজেদের অনুগ্রহের কথা বলে বেড়ায় না আর কাউকে কষ্টও দেয় না, তাদের প্রতিদান রয়েছে তাদের রবের কাছে এবং তাদের কোন দুঃখ মর্মবেদনা ও ভয় নেই।
একটি মিষ্টি কথা এবং কোন অপ্রীতিকর ব্যাপারে সামান্য উদারতা ও ক্ষমা প্রদর্শন এমনি দানের চেয়ে ভালো, যার পিছনে আসে দুঃখ ও মর্মজ্বালা। মুলত: আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সহনশীলতাই তাঁর গুণ।”(সুরা বাকারাঃ২৬২-২৬৩) প্রকৃতই আল্লাহ কারো দান-খয়রাতের মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ নিজেই যেহেতু সহনশীল, তাই তিনি এমন লোকদের পছন্দ করেন যারা নীচ ও সংকীর্ণমনা নন বরং বিপুল সাহস ও হিম্মতের অধিকারী এবং সহিষ্ণু। তাছাড়া যারা আল্লাহকে মানে, আর যারা মানেনা উভয়কেই জীবনের অগণিত উপায়-উপকরণ এবং বার বার বহুবিধ ভুল-ত্রুটি করার পরও মাফ করে দেন। যেহেতু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন গাণিউন হালিম বা মুখাপেক্ষীহীন ও সহনশীল। তাই তিনি কি করে ঐ সমস্ত লোকদের পছন্দ করতে পারেন যারা দান করে, সামান্য এ অনুগ্রহের কথা মানুষের কাছে বলে বেড়ায়।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তারা এমন পরিণতির সম্মুখীন হয়েছে যে, তাদের কাছে যেসব রাসুল এসেছেন তাঁরা স্পষ্ট দলীল-প্রমাণ নিয়ে তাদের কাছে এসেছিলেন। কিন্তু তারা বলেছিল: মানুষ কি আমাদের হিদায়াত দান করবে? এভাবে তারা মানতে অস্বীকৃতি জানালো এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। তখন আল্লাহও তাদের তোয়াক্কা করলেন না আল্লাহ তো আদৌ কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি আপন সত্তায় প্রশংসিত।”(সুরা তাগাবুন:৬)
যারা আল্লাহর দেয়া হিদায়াতের পরোয়া করে না তারা গোমরাহীর কোন গহ্বরে পতিত হতে যাচ্ছে, আল্লাহও তার পরোয়া করেন না। কোন ব্যাপারেই আল্লাহ কারো কাছে ঠেকা নেই যে, তাকে খোদা হিসেবে মানলে তবেই তিনি খোদা থাকবেন অন্যথায় তাঁর কর্তৃত্বের আসন হাত ছাড়া হয়ে যাবে। তিনি কারো ইবাদাত-বন্দেগীরও মুখাপেক্ষী নন কিংবা প্রশংসার মুখাপেক্ষী নন। মানুষ তাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যেই আল্লাহ তাদেরকে সত্য ও সঠিক পথ দেখাতে চান। কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে আল্লাহও তাদের প্রতি বিমুখ হয়ে যান। আল্লাহ বলেন,“তোমার রব কারোর মুখাপেক্ষী নন এবং দয়া ও করুণা তাঁর রীতি।”(সুরা আনাম:১৩৩) আল্লাহ আরো বলেন,“মানুষের মধ্যে থেকে যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ রাখে, তারা যেন এই গৃহের হজ্জ সম্পন্ন করে,এটি তাদের ওপর আল্লাহর অধিকার। আর যে ব্যক্তি এ নির্দেশ মেনে চলতে অস্বীকার করে তার জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ বিশ্ববাসীর মুখাপেক্ষী নন।”(সুরা আলে ইমরান:৯৭)
আল্লাহর কোন কাজ মানুষের জন্য আটকে নেই। তাদের সাথে তাঁর কোন স্বার্থ জড়িত নেই। তবে তিনি মানুষকে ভালোবাসেন। আর এই ভালবাসার ফলে তিনি তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য তাঁর কথা শোনা ও মানার নির্দেশ দেন। কেউ যদি তাঁর কথা শোনে তাহলে তাঁর উন্নতি হয়। তাদের মানুষের নাফরমানীর ফলে তাঁর কোন ক্ষতি হবে না। অথবা তাদের আনুগত্যের ফলে তিনি লাভবানও হবেন না। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মিলে কঠোরভাবে তাঁর হুকুম অমান্য করলে তাঁর বাদশাহী বা সার্বভৌম কর্তৃত্বে এক বিন্দু পরিমাণ কমতি দেখা দেবে না। আবার সবাই মিলে তাঁর হুকুম মেনে চললে এবং তাঁর বন্দেগী করতে থাকলেও তাঁর সাম্রাজ্যে এক বিন্দু পরিমাণ বৃদ্ধি ঘটবে না।
তিনি মানুষের সেলামীর মুখাপেক্ষী নন। তাদের মানত-নযরানারও তাঁর কোন প্রয়োজন নেই। তিনি তাঁর বিপুল ভাণ্ডার মানুষের জন্য অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছেন এবং এর বিনিময়ে তাদেও কাছ থেকে কিছুই চান না। তিনি মালিকুল মুলক, তাঁকে ভোট দিয়ে কেউ মালিকুল মুলক বানায়নি। তিনি নিজে নিজেই শাহানশাহ। বরং তিনি দুনিয়ার রাজা-বাদশাদের ক্ষমতা দেন আবার তিনিই ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন।
আল্লাহ সত্য-সরল পথে চলার নির্দেশ দেন এবং প্রকৃত ও বাস্তব সত্যের বিপরীত পথে চলতে নিষেধ করেন। তাঁর এ আদেশ ও নিষেধের অর্থ এ নয় যে, মানুষ সঠিক পথে চললে তাঁর লাভ এবং ভুল পথে চললে তাঁর ক্ষতি। বরং এর আসল অর্থ হচ্ছে এই যে, সঠিক পথে চললে মানুষের নিজের লাভ এবং ভুল চললে তাদের ক্ষতি। এ জন্য আল্লাহ সঠিক কর্মপদ্ধতি শিক্ষা দেন। যাতে এই কর্মপদ্ধতির ফলে সে উচ্চতর যোগ্যতা লাভ করতে পারে। এগুলো আল্লাহর করুণা ও মেহেরবানী ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ তিনি তাঁর সৃষ্টির প্রতি মেহেরবান। আর তিনি ‘সাবুর’ ও ‘হালিম’ অর্থাৎ চরম ধৈর্যশীল ও সহনশীল। তাই যে তাঁকে মানে এবং যে তাঁকে মানে না সকলকেই অপরিমিত নিয়ামত দিয়ে যাচ্ছেন অবিরত।
Posted ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh