রয়টার্স, ওয়াশিংটন : | বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরোধীদলীয় নেতা রেজা পাহলভিকে ‘বেশ চমৎকার মানুষ’ বলে মনে হয়। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা দখলের জন্য ইরানের অভ্যন্তরে জনসমর্থন আদায় করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তাঁর অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও বলেছেন, ইরানের ধর্মীয় সরকারের পতন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে গতকাল বুধবার দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। এ সময় ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ প্রসঙ্গ ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা থমকে যাওয়ার জন্য ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে দায়ী করেন। এ ছাড়া ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের তদন্ত নিয়ে রিপাবলিকানদের সমালোচনাও উড়িয়ে দেন।
ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সহিংস বিক্ষোভে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন।
ট্রাম্প বারবারই এই বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে হস্তক্ষেপ করার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু ইরানের প্রয়াত শাহর ছেলে রেজা পাহলভিকে (১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন শাহ) পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে গতকাল দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁকে (রেজা পাহলভি) বেশ চমৎকার মানুষ মনে হয়, কিন্তু নিজ দেশের ভেতরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কেমন হবে, তা আমি জানি না। আর আমরা এখনো প্রকৃতপক্ষে সেই পর্যায়ে পৌঁছাইনি।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি জানি না, তাঁর দেশ তাঁর নেতৃত্ব গ্রহণ করবে কি না। তবে তারা যদি করে, তবে তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।’
গত সপ্তাহে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, পাহলভির সঙ্গে দেখা করার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। তাঁর এবারের মন্তব্যগুলো ইরানে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে পাহলভির সক্ষমতাকে আরও বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিল।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ৬৫ বছর বয়সী পাহলভি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে তাঁর বাবার পতনের আগেই ইরান ত্যাগ করেন এবং বর্তমানে প্রবাসে থেকে বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। ইরানের বিরোধী দলগুলো বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী ও আদর্শিক উপদলে বিভক্ত, যাদের মধ্যে পাহলভি–সমর্থিত রাজতন্ত্রপন্থীরাও রয়েছেন। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ভেতর এদের তেমন কোনো সুসংগঠিত উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না।
ট্রাম্প বলেন, ‘বিক্ষোভের কারণে তেহরান সরকারের পতন হওয়া সম্ভব। তবে সত্য কথা হলো, যেকোনো শাসনব্যবস্থারই পতন হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের পতন হোক বা না হোক, সামনের সময়টা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক হতে চলেছে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর শেষ করছেন। ৩০ মিনিটের সাক্ষাৎকারের সময় তাঁর বিশাল ডেস্কের পেছনে বসে ডায়েট কোক পান করেন তিনি। একপর্যায়ে কাগজের একটি পুরু বাইন্ডার ধরে থাকেন, যেখানে তাঁর মতে, গত বছরের ২০ জানুয়ারি শপথ নেওয়ার পর থেকে তাঁর অর্জনগুলো ছিল।
তবে ট্রাম্প নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য রিপাবলিকানদের প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষমতাসীন দল প্রায়ই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর আসন হারায়। বলেন, ‘যখন আপনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতেন, তখন আপনি মধ্যবর্তী নির্বাচন জেতেন না। কিন্তু আমরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে জেতার জন্য খুব চেষ্টা করব।’
চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা ‘জেলেনস্কি’
ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে দাবি করেছিলেন, তিনি এক দিনের মধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেও তিনি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি এখন বলছেন, এ চার বছরের পুরোনো যুদ্ধ সমাধানের পথে প্রধান বাধা হলেন জেলেনস্কি।
ট্রাম্প প্রায়ই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও জেলেনস্কি—উভয়েরই সমালোচনা করে থাকেন। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের ব্যাপারে তাঁকে আবারও বেশি হতাশ মনে হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘পুতিন চুক্তি করতে প্রস্তুত।’ তবে বাধা কোথায়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সোজাসাপটা বলেন, ‘জেলেনস্কি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে এ চুক্তিতে আমাদের রাজি করাতে হবে।’
রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের ‘অনুগত হওয়া উচিত’
পাওয়েলের বিষয়টি তদন্তে ফেডারেল রিজার্ভের প্রথাগত স্বাধীনতায় ট্রাম্পের বিচার বিভাগ হস্তক্ষেপ করছে—এমন আশঙ্কায় তাঁর মনোনীত প্রার্থীদের আটকে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন সিনেটের রিপাবলিকানরা। তবে এ হুমকিকে ট্রাম্প পাত্তা দেননি। দলীয় আইনপ্রণেতাদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি পরোয়া করি না। বলার কিছু নেই। তাঁদের অনুগত হওয়া উচিত।’
জে পি মরগ্যানের সিইও জেমি ডাইমন সমালোচনা করেছিলেন যে ফেডে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। ট্রাম্প সে সমালোচনাও প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘তিনি কী বললেন, তাতে আমার কিছু যায়–আসে না।’
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর থেকে কার্যত দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। পরে এ প্রথম আজ বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। মাচাদো সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি খুব চমৎকার একজন নারী। আমি তাঁকে টেলিভিশনে দেখেছি। আমরা মূলত প্রাথমিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলব।’
মাচাদো গত বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান এবং তা ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেন। তিনি পুরস্কারটি ট্রাম্পকে দিতে চাইলেও নোবেল কমিটি জানিয়েছে, এ পুরস্কার হস্তান্তরযোগ্য নয়।
ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজেরও প্রশংসা করেছেন। মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, বুধবার রদ্রিগেজের সঙ্গে তাঁর ‘চমৎকার আলাপ’ হয়েছে এবং ‘তাঁর সঙ্গে কাজ করা বেশ সহজ’।
মার্কিনদের মধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বারবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির শক্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে এ বার্তাই নিয়ে যাবেন তিনি। সেখানে জোর দেবেন, ‘আমাদের অর্থনীতি কতটা মহান, কর্মসংস্থানের সংখ্যা কতটা বেশি ও আমরা কতটা ভালো করছি’, তার ওপর।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট রয়টার্সকে জানান, দাভোস সফরকালে ট্রাম্প সুইজারল্যান্ড, পোল্যান্ড ও মিসরের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।
Posted ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh