বাংলাদেশ রিপোর্ট : | বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫
নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে ব্রুকলিন প্যারামাউন্ট থিয়েটারে বিজয় সমাবেশে নিজের অভিব্যক্তি তুলে ধরেন ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জোহরান মামদানি। ছবি : রয়টার্স
জোহরান মামদানি বিস্ময়কর বিজয় অর্জন করলেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির তরুণ এই প্রার্থী গত ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিউইয়র্ক সিটির ১১১তম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমো ও রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। এ জয়ের মধ্য দিয়ে মামদানি শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হলেন। মামদানি হচ্ছেন প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম মেয়র। শুধু তাই নয় এক শতাব্দীর মধ্যে মামদানি হচ্ছেন সবচেয়ে কনিষ্ঠ মেয়র। উগান্ডায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নেওয়া জোহরান সাত বছর বয়সে পরিবারসহ নিউইয়র্কে আসেন।
তিনি ২০১৮ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব পান। নিউইয়র্ক সিটির বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামসও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য লড়াই করছিলেন। তবে গত সেপ্টেম্বরে নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। উল্লেখ্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে আনুমানিক ২০ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছে শহরের নির্বাচন বোর্ড। ১৯৬৯ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি। ১৯৯৩ সালের নির্বাচনে প্রায় ১৯ লাখ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী রুডি জুলিয়ানি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ডেভিড ডিনকিনসকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে প্রায় ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ জন আগাম ভোট দিয়েছেন, যা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো নির্বাচনে নিউইয়র্ক শহরে এটিই সর্বোচ্চ আগাম ভোট পড়ার ঘটনা। ৪ নভেম্বর নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয় নিউইয়র্ক সময় সকাল ৬টায়। শেষ হয় রাত ৯টায়। এর পরপরই শুরু হওয়ার কথা ভোট গণনা। শহরের অ্যাস্টোরিয়া এলাকায় একটি কেন্দ্রে ভোট দেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জোহরান মামদানি। এবারের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর অঙ্গীকার করেছেন তিনি। তরুণসহ সব বয়সী ভোটারের মধ্যে বেশ সাড়াও পেয়েছেন। তার প্রতিফলন দেখা গেছে ভোটকেন্দ্রে। নিউইয়র্ক শহরের অ্যাস্টোরিয়া এলাকায় একটি কেন্দ্রে ভোট দেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি। নির্বাচনে অন্যান্য প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোরও অঙ্গীকার করেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তরুণসহ সব বয়সী ভোটারের মধ্যে বেশ সাড়া পেয়েছেন, যার প্রতিফলন দেখা গেছে ভোটকেন্দ্রে।
জোহরান ৫০.৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ৬৭ বছর বয়সী কুমো পান ৪০.৬ শতাংশ ভোট, আর স্লিওয়া ৭.১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের একের পর এক সাফল্যের মধ্যে জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক এ জয় এসেছে।মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ৩৪ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট মামদানি এক প্রান্তিক প্রার্থী থেকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচিত মুখে পরিণত হয়েছেন। গত জুন মাসের দলীয় নির্বাচনে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে বিজয়ী হন।
ওই নির্বাচনে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ভোটার উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। এর আগের সব জরিপেই দেখা গেছে, নিউইয়র্ক শহরের সাবেক মেয়র অ্যান্ড্রু কুমোর চেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মামদানি এগিয়ে রয়েছেন। মামদানি আশা করছেন, আগেরবারের মতো এবারও তরুণ ভোটাররা তাঁর পাশে থাকবেন। তবে শুধু নিউইয়র্কের মধ্যেই নয়, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলার তাঁর অঙ্গীকার পুরো দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও সাড়া ফেলেছে। অনেক জেন–জি ও মিলেনিয়ালস প্রজন্মের মানুষ বলছেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গায় হাত রেখেছেন মামদানি। তরুণ প্রজন্ম যখন রাজনীতিকদের প্রতি আশা হারিয়ে ফেলেছেন এবং প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নতুন কণ্ঠস্বরের অপেক্ষায় আছেন, তখনই মামদানির উত্থান।
গবেষক বেলি বুথ বলেন, ‘মামদানিই এমন একজন প্রার্থী, যিনি প্রচলিত ব্যবস্থাকে নানা দিক থেকে চ্যালেঞ্জ করছেন।’ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের একের পর এক সাফল্যের মধ্যে জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক এ জয় এসেছে। গত শরতে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরুর সময় জোহরান ছিলেন তুলনামূলক অচেনা রাজনীতিক। কিন্তু শহরের বসবাসযোগ্যতা নিয়ে তাঁর স্পষ্ট বার্তা ও প্রাণবন্ত প্রচার দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর ঘোষিত কর্মসূচিতে ছিল বাড়িভাড়া স্থির রাখা, সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৩০ ডলার করা, বাস পরিবহনসেবা ফ্রি করা, ধনীদের ওপর কর বাড়ানোসহ নানা উদ্যোগ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুদান, হাজারো স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক যোগাযোগে বুদ্ধিদীপ্ত প্রচার ও পরিবর্তনের বার্তা—সব মিলিয়ে জোহরানের তৃণমূল প্রচার বসন্ত নাগাদ গতি পায়। এ গতি চূড়ান্ত রূপ পায় গত জুন মাসে ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে। প্রাথমিক বাছাই ভোটে তিনি কুমোকে প্রায় ১৩ পয়েন্টে হারিয়ে নিউইয়র্কের রাজনৈতিক অভিজাত ব্যক্তিদের হতবাক করে দেন। তরুণ ও প্রথমবার ভোট দেওয়া নানা শ্রেণির ভোটারকেও একত্র করতে সক্ষম হন তিনি।
প্রাইমারিতে হারার পরও কুমো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থেকে যান। এক ডজনের বেশি নারীর কাছ থেকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর ২০২১ সালে গভর্নর পদ ছাড়েন কুমো। রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আশা নিয়ে এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচনে নামেন তিনি। তবে গ্রীষ্ম ও শরৎজুড়ে সব জরিপে জোহরান কুমো ও স্লিওয়ার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। ইতিমধ্যে যৌন হয়রানির অভিযোগ নাকচ করেছেন কুমো। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জোহরান ও কুমোর মধ্যে প্রায়ই তর্কবিতর্ক চলে নিজেদের কাজের রেকর্ড, যোগ্যতা, শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের ভাবনাসহ নানা ইস্যু ঘিরে। জোহরান অভিযোগ করেন, কুমো ধনী অনুদান দাতা ও করপোরেট স্বার্থে কাজ করেন। আর কুমো বলেন, জোহরান শহর পরিচালনায় অদক্ষ ও অভিজ্ঞতাহীন। অক্টোবর মাসে মেয়র পদপ্রার্থীদের বিতর্কে জোহরান, কুমো ও স্লিওয়া শহরের অপরাধ, পুলিশিং, ইসরায়েল, আবাসন, পরিবহন, জীবনযাত্রার ব্যয়সহ নানা স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক বিষয়ে মুখোমুখি হন। তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও মতবিনিময় করেন।
জোহরান মামদানির প্রচার জাতীয় পর্যায়ে প্রগতিশীল নেতাদের সমর্থন পায়। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও নিউইয়র্কের কংগ্রেস সদস্য আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ প্রকাশ্যে তাঁর পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। নিউইয়র্কের প্রভাবশালী আরও কয়েকজন নেতা, যেমন জেরি ন্যাডলার ও রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসও জোহরানকে সমর্থন করেন। সেপ্টেম্বরে গভর্নর ক্যাথি হোকুল নীতিগত মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জোহরানের প্রতি তাঁর সমর্থনের ঘোষণা দেন। অতি সম্প্রতি, নির্বাচনের দুই সপ্তাহের কম সময় আগে প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিজ তাঁকে সমর্থন করার ঘোষণা দেন।
তবে নিউইয়র্কের সব ডেমোক্র্যাটই জোহরানের পাশে ছিলেন না। অঙ্গরাজ্যের দুই সিনেটর চাক শুমার ও কারস্টেন গিলিব্র্যান্ড তাঁকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেননি। নির্বাচনী প্রচারের সময় জোহরানকে সমালোচনা ও আক্রমণের মুখে পড়তে হয় বয়স, অভিজ্ঞতা ও প্রগতিশীল নীতির কারণে। ইসরায়েল সরকারের নীতি ও গাজায় দেশটির আগ্রাসন নিয়ে সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন তাঁর সঙ্গে কিছু ইহুদি গোষ্ঠীর সম্পর্ক জটিল করে তোলে। জোহরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহলে ইসলামবিদ্বেষী আক্রমণেরও শিকার হন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ ও নিউইয়র্কের রিপাবলিকান প্রতিনিধি এলিস স্টেফানিক তাঁকে ‘মেয়র পদে জিহাদপন্থী প্রার্থী’ বলে আখ্যা দেন। অক্টোবর মাসে জোহরান কুমোর তীব্র সমালোচনা করেন। এ নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক মনোযোগ কেড়েছে। চেষ্টা যে যদি আপনি কথা বলেন, তাঁরা আপনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবেন।’সব আক্রমণ উপেক্ষা করেও জোহরানের প্রচার দেশজুড়ে প্রভাব ফেলেছে। আগস্টে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, তাঁর প্রচার অন্তত ১০ হাজারের বেশি তরুণ প্রগতিশীলকে রাজনীতিতে আসার কথা ভাবতে অনুপ্রাণিত করেছে।
নিউইয়র্ক শহরের অ্যাস্টোরিয়া এলাকায় একটি কেন্দ্রে ভোট দেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি। নির্বাচনে অন্যান্য প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোরও অঙ্গীকার করেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তরুণসহ সব বয়সী ভোটারের মধ্যে বেশ সাড়া পেয়েছেন, যার প্রতিফলন দেখা গেছে গতকালের ভোটকেন্দ্রে।
Posted ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh