মোহাম্মদ আজাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৪
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে গত চার দশকের মধ্যে এবারের নির্বাচনী সমীকরণ বেশ জটিল। কারণ এবার পোলিং সংস্থাগুলো সহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নির্বাচন নিয়ে যেন হিসাব মেলাতে পারছেন না। গত প্রায় চার দশক থেকে পোলিং সংস্থাগুলো তাদের মধ্য মে মাসে জরিপের যে ফলাফল প্রকাশ করেছে, সেগুলোই নভেম্বরের নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে এমন দেখা গেছে। কিন্তু এবারের নির্বাচন নিয়ে তারা বলছে যে, তারা জানে না এবারের নির্বাচনে কোন প্রার্ধী জয়ী হতে যাচ্ছেন।
আর মাত্র ১৮ দিন পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পোলিং সংস্থা রিয়েল ক্লিয়ার পলিটিকস, ফাইভথানটিনইট, কুইনিপ্যাক, নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজ, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, সিবিএস, সিএনএন ও এনবিসির সর্বশেষ জরিপে প্রায় একই ফলাফল দেখা যাচ্ছে।
এই সংস্থাগুলো রেড ও ব্লু স্টেটখ্যাত স্টেটগুলো বাদ দিয়ে তাদের জরিপে প্রাধান্য দিয়েছে সুয়িং স্টেটগুলোকে। ফ্লোরিডা ও ওহাইয়ো বলা হতো পলিটিক্যাল ব্যাটলগ্রাউন্ড। এই দুটি স্টেটে কখনো ডেমোক্রেট, আবার কখনো রিপাবলিকান প্রার্থী বিজয় লাভ করতো। কিন্তু এই দুটি স্টেট এখন রেড স্টেট। সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার পর দুটি স্টেটে আর কোনো ডেমোক্রেট প্রার্থী জয়ী হননি। ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা এখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ফ্লোরিডা ও ওহাইয়োতে নির্বাচনী প্রচারণা কমিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া গতানুগতিকভাবে ডেমোক্রেট বা রিপাবলিকান স্টেটগুলোতে ডেমোক্রেট বা রিপাবলিকান প্রার্থী জয়ী হয়ে থাকেন তারা এখন সেই স্টেটগুলো বাদ দিয়ে প্রচারণায় জোর দিয়েছেন স্যুয়িং স্টেটগুলোতে।
জরিপ সংস্থা রিয়েল ক্লিয়ার পলিটিকস ও এনবিসির সর্বশেষ জরিপে সমগ্র দেশে ডেমোক্রেট কামাল হ্যারিস দুই থেকে তিন পয়েন্টের ব্যবধানে রিপাবলিকান ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে আছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা জাতীয়ভাবে কোনো প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও জাতীয়ভাবে বিভিন্ন স্টেটে ইলেকটোরাল কলেজের ভোটের মারপ্যাচে সেই এগিয়ে থাকা কোনো কাজে লাগবে না। এনবিসি এ মাসের শুরুতে যে জরিপ করেছে তার ফলাফলে স্যুয়িং স্টেটগুলোর নির্বাচনী হওয়ার কিছুটা ট্রাম্পের অনুকূলে।
ডেমোক্রেট প্রার্থী হ্যারিস গত সপ্তাহে গুরুত্বপূর্ণ স্যুয়িং স্টেট পেনসিলভেনিয়াতে প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভয়ঙ্কর এক বিপদ। তিনি উন্মাদ ও অস্থিরচিত্ত। অবশ্য টাম্প সেখানে কামালার চেয়ে দুই পয়েন্ট শতাংশে এগিয়ে আছে। মিশিগানে মুসলিম ভোট না পেলে কোন প্রার্থী জয়ী হতে পারেন না। এবার এই স্টেটে দুজনের অবস্থান সমান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাকি আর ২১ দিন। হোয়াইট হাউসে যাওয়ার লড়াইয়ে শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁদের লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোয় ভোটারদের আস্থা অর্জন করা।
ভোটের আগের জরিপগুলো বলছে, এবারের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। তবে কিছু নতুন জরিপ কমলার জন্য নিরাশার বার্তা দিচ্ছে। কিছু ডেমোক্রেটিক ভোটারদের মধ্যে তাঁর সমর্থনে ভাটা পড়তে দেখা গেছে। কমলা হ্যারিস গত রোববার গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য নর্থ ক্যারোলাইনায় প্রচার চালান।
এ অঙ্গরাজ্যে সম্প্রতি হারিকেন হেলেনে ২৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে হারিকেনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট সহায়তা দেওয়া হয়নি। নর্থ ক্যারোলাইনার গ্রিনভিন চার্চে দেওয়া এক বক্তব্যে কমলা বলেন, ‘সংকটের মুহূর্তে আমাদের মধ্যে নায়কদের উঠে আসার একটি উপায় আছে বলে আমি মনে করি।’ ট্রাম্পের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে যাঁরা কঠোর পরিশ্রম করছেন, তাঁদের নিয়ে মিথ্যা ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছেন লোকজন।এদিকে অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প তাঁর অভিবাসী ইস্যুটাকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। ৯২ মিনিটের বক্তব্যে তিনি বলেন, আবার নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রে ১০ হাজার সীমান্তরক্ষী নিয়োগ দেবেন।
এর আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশের ভেতরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের কথা বলেন ট্রাম্প। কারও নাম প্রকাশ না করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের কিছু অসুস্থ লোক আছেন, যাঁরা মৌলবাদী বামপন্থী উদ্মাদ। প্রয়োজন পড়লে খুব সহজে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে ন্যাশনাল গার্ড বা প্রয়োজনে সামরিক বাহিনী ব্যবহার করা হবে।’ এদিকে, গত শনিবার ক্যালিফোর্নিয়ায় ট্রাম্পের এক নির্বাচনী সমাবেশের কাছে গুলিভর্তি শটগানসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস জানায়, গত জুলাই থেকে দুবার হত্যাচেষ্টার মুখে পড়া ট্রাম্পের জন্য বিপজ্জনক কোনো ঘটনা ঘটেনি।
জরিপে দেখা গেছে, সাতটি দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে কমলা ও ট্রাম্পের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা হবে। তবে, জরিপে আরও দেখা গেছে, ডেমোক্রেট বলয়ে থাকা লাতিন ভোটারদের টানতে ব্যর্থ হয়েছেন কমলা। ট্রাম্পের তীব্র অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যের পরও লাতিন ভোটাররা কমলার দিতে ঝোঁকেননি। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, এর আগে লাতিন ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্রেটির প্রার্থীদের প্রতি যে সমর্থন ছিল, কমলার ক্ষেত্রে তা অনেক কম।
তবে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের মধ্যে তাঁর প্রতি সমর্থন বেশি। তবে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের সমর্থন কমছে তাঁর জন্য। হারিকেন মিল্টনের আঘাতের পর কমলা নর্থ ক্যারোলাইনা ও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ফ্লোরিডা সফর করছেন। বাইডেন হারিকেন আক্রান্ত এলাকার জন্য ৬০ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছেন।
দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যের মধ্যে পেনসিলভানিয়ায় চোখ দুই প্রার্থীর। গত ১৪ অক্টোবর দুই প্রার্থী সেখানে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন। এর আগে কমলার হয়ে জর্জিয়ায় প্রচার করেছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন। রোববার গ্রিনভিলে কমলা অভিযোগ করেন যে ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের কোনো স্বচ্ছ ভাবমূর্তি নেই। নিজের স্বাস্থ্যগত তথ্য প্রকাশের বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন। ট্রাম্পকেও নিজের স্বাস্থ্যগত তথ্য প্রকাশ করার আহ্বান জানান। কমলা প্রশ্ন করেন, ‘এটা আপনাকে অবাক করবে যে কেন ট্রাম্পের কর্মীরা তাঁকে লুকিয়ে রাখতে চাইছেন! তারা কি ভয় পান যে মানুষ দেখে ফেলবে ট্রাম্প আমেরিকাকে নেতৃত্ব দেওয়ার পক্ষে খুব দুর্বল এবং অস্থির?’
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন : জর্জিয়ায় আগাম ভোট শুরু
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উপলক্ষে গত ১৫ অক্টোবর জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। যে সাতটি দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যের ভোটে পরবর্তী প্রেসিডেন্টের ভাগ্য নির্ধারিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, জর্জিয়া তার মধ্যে অন্যতম। আগামী ৫ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে আগাম ভোট দিচ্ছেন এই রাজ্যের ভোটাররা। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬টি অঙ্গরাজ্য এবং ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ায় আগাম ভোট দেওয়ার সুযোগ আছে। এর মধ্যে ৩৭টি অঙ্গরাজ্যের প্রায় ৫০ লাখ ভোটার এরই মধ্যে সশরীরে অথবা ই-মেইলের মাধ্যমে আগাম ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছে এনবিসি নিউজ। আগামী পাঁচ দিনে জর্জিয়া ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য নেভাডা ও নর্থ ক্যারোলাইনায় সশরীরে আগাম ভোট দিতে পারবেন ভোটাররা।
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আগাম ভোটের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। করোনা মহামারির সময় জনসমাগম এড়াতে ১০ কোটিরও বেশি ভোটার আগাম ভোট দেন। নির্ধারিত দিনের আগে ভোটগ্রহণের কারণে ঐতিহাসিকভাবে সুবিধা পেয়ে এসেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। এ কারণে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি আগাম ভোটের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তাই রিপাবলিকানরা নিজের সমর্থকদের আগাম ভোট দিতে উৎসাহ দিয়ে আসছেন। যদিও মার্কিন গণমাধ্যম বলছে, বর্তমানে আগাম ভোটের বেশির ভাগই পড়েছে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। আর জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আগাম ভোট কমলা ও ট্রাম্প—উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি বড় অংশের বসবাস জর্জিয়ায়। তাঁদের ভোটেই ২০২০ সালের নির্বাচনে জর্জিয়ায় জো বাইডেন ট্রাম্পকে মাত্র ১২ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন। এ ছাড়া এটিই সেই রাজ্য, যেখানে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে ট্রাম্প ও আরো ১৮ জনের বিরুদ্ধে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে।
Posted ১২:১৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh