বাংলাদেশ রিপোর্ট : | বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫
ছবি : সংগৃহীত
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহবানে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু ক্যুমোর পক্ষে রিপাবলিকান ভোট পড়লে জোহরান মামদানির নিশ্চিত বিজয়ের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে আশঙ্কায় নিউইয়র্ক সিটির শ্রমজীবী মানুষের বিরাট এক স্বতস্ফূর্ত জোট ভোটারদের নির্বাচন কেন্দ্রমুখী করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
এ জোট ছিল প্রধানত সিটির কুইন্স ও ব্রঙ্কস বরোতে বসবাসকারী শ্রমজীবী দক্ষিণ এশিয়ান অভিবাসী সম্প্রদায়। চৌত্রিশ বছয় বর্ষীয় মামদানি ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার নিউইয়র্কের ১১১তম মেয়র নির্বাচিত হয়ে দেশের বৃহত্তম সিটিতে ঐতিহাসিক আদর্শিক পরিবর্তন সাধনের সূচনা করেছেন, যা সম্ভব হয়েছে তার প্রতি বর্তমান প্রজন্মের আস্থা। আমেরিকান বার্ত সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ভোটগ্রহণ বন্ধ হওয়ার ঠিক ৩৫ মিনিট পর এ নির্বাচনকে বিস্ময়কর অভিহিত করেছে, যা জোরদার হতে শুরু করেছিল গত জুনে অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে। তাদের মতে, “তখন এবং এখন মামদানি একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারকে বিপর্যস্ত করেছেন, যার বর্তমান প্রতিনিধি নিউইয়র্ক স্টেটের সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু এম. ক্যুমো। নিউইয়র্কের ধনবানরা প্রায় সকলে মামদানির মেয়র হওয়ার সম্ভাবনাকে পাল্টে দিতে ক্যুমোর প্রতি তাদের সার্বিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সিটি মেয়র নির্বাচনের ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে, মামদানি কতটা সুক্ষ্মভাবে তার নিজস্ব সমর্থনের নতুন জোট গড়ে তুলেছিলেন। তিনি কুইন্সের নবীন ভোটারদের শ্রমজীবী মানুষ ও অভিবাসীদের বসবাস যেখানে বেশি, সেখানে একত্রিত করেছেন। তবে তিনি প্রাইমারির তুলনায় শ্রমজীবী কৃষ্ণাঙ্গ এবং ল্যাটিনো কমিউনিটি থেকেও ভালো ভোট পেয়েছেন। এ কারণে দেখা যায় যে ১৯৬০ সালের পর মামদানি মেয়র পদে সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যেকোনো নির্বাচনে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার হার সর্বনিম্ন। সেক্ষেত্রে মেয়র নির্বাচনে নিউইয়র্ক সিটিতে মঙ্গলবার ভোটারদের অনেকটা ঢল নেমেছিল বলা যেতে পারে। এমন দৃশ্য গত অর্ধ শতাব্দীতে দেখা যায়নি। বিশ লাখের বেশি নিউইয়র্কবাসী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। চার বছর আগে মেয়র পদে ভোট দিয়েছিল ১১ লাখ ভোটার। এবার সে সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।
গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে ঘোষণাকারী জোহরান মামদানি বিনামূল্যে শিশু পরিচর্যা, বিনামূল্যে বাস সার্ভিস এবং স্ট্যাবিলাইজইড বাড়িভাড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা তাকে ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৬৯ সালের মেয়র পদপ্রার্থী জন ভি. লিন্ডসের পর তিনিই প্রথম প্রার্থী যিনি সিটির পাঁচ বরোতে মেয়র পদে দশ লাখের বেশি ভোটে জয়ী হলেন। যদিও ১৯৬৯ সালে ভোটদান ছিল ২,৪৫৮,২০৩ জন।
গত কয়েক দশক যাবত নিউইয়র্ক সিটিতে ডেমোক্রেটরা মোটামুটি স্থির ভোটে জয়লাভ করেছে।
এবার ম্যানহাটান ও ব্রুকলিনের উদারপন্থী, কৃষ্ণাঙ্গ ও ল্যাটিনো ভোটাররা, গোঁড়া ইহুদি এবং অন্যান্য অভিবাসীদের বিভ্রান্তি এড়িয়ে জোহরান মামদানি তাদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। নির্বাচনী ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে মামদানি সেই জোটের রূপরেখা পুনর্নিমাণ করেছেন, নতুন জোটগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন, যা আগামী বছরের জন্য সিটির ভোটের রাজনীতির চিত্রে ও ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে পারে। তিনি ব্রুকলিনের সমৃদ্ধ ব্রাউনস্টোন এলাকায় ৪০ থেকে ৫০ পয়েন্ট বেশি সমর্থন পেয়েছেন।
উত্তর ম্যানহাটানে ভালো করেছেন এবং ব্রুকলিন ও ব্রঙ্কসের ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণাঙ্গ ও ল্যাটিনো এলাকায়ও বেশ ভালো ভোট বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। অপরদিকে ক্যুমো গোঁড়া ইহুদি অধ্যুষিত এলাকায় ৮০ শতাংশ ভোটারের কাছে পৌঁছেছিলেন এবং ব্রঙ্কস ও ম্যানহাটন এবং রিভারডেলে বেশি ইহুদি ভোটারদের ভোট পেয়েছেন। কিন্তু সিটির প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশিয়ান মেয়র মামদানি, যাকে অধিকাংশ ডেমোক্রেট উপেক্ষা করেছেন, তিনি সাধারণ ভোটারদের ভোট পেয়েছেন বেশি। সিটির বুশউইক ও উইলিয়ামসবার্গের মতো এলাকা ও আশপাশের এলাকাগুলোর তরুণ অধিকাসী এবং ট্যাক্সি ড্রাইভার, ভেন্ডর এবং অন্যান্য শ্রমজীবী-শ্রেণির দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা তার প্র্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল তার প্রতিশ্রুতিগুলোর কারণে।
উল্লেখ্য, ৮৪ লাখের অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত নিউইয়র্ক সিটির ভোটারদের ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন ৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি। তার প্রায় দ্বিগুণ বয়সী (৬৭ বছর) অ্যান্ড্রু ক্যুয়ামো পেয়েছেন ৪০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট, এবং রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়া ৭ শতাংশের কিছু বেশি। কুইন্সের অ্যাসেম্বলিম্যান হিসেবে তুলনামূলক অখ্যাত অবস্থান থেকে মামদানির দ্রুত উত্থান গত জুন মাস থেকে সিটিজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রাইমারিতে বিজয়ী হওয়ার পর গত কয়েক মাসে তিনি তরুণ ও কর্মজীবী ভোটারদের সংগঠিত করে তার পক্ষে সমর্থনের জোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন। মামদানির বিজয় নিউইয়র্কের প্রশাসনে নি:সন্দেহে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। সামনে তার প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে নিউইয়র্ক স্টেট সরকার এবং ও সিটি কাউন্সিল নেতাদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়, যাতে আবাসন সংকট, গণপরিবহন ও মজুরি–সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগের রাতেই প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো মামদানির নিশ্চিত বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। সিটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এ বিজয় তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ, বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থান ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতার দাবিকে সামনে এনে এক অসম-সাহসী ম্যান্ডেট দিয়েছে, যা আগামী বছরগুলোতে সিটিকে পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরীক্ষা হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
আগামীর বছরের ১লা জানুয়ারি নিউইয়র্ক সিটির ১১১তম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি ট্রানজিশন টিম গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এই টিমে কমিউনিটি সংগঠক, নীতি–বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
Posted ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh