| বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে যুদ্ধ বন্ধ করতে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে উভয় দেশ ঐকমত্যে উপনীত হয়েছে এবং আগামীকাল ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে স্বাক্ষরিত হবে চুক্তি ঐতিহাসিক চুক্তি। সব ফ্রন্টে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসান এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
মাসের পর মাস ধরে চলা প্রাণঘাতী সহিংসতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার পর গত ১৫ জুন সোমবার এই ঘোষণা বিশ্বজুড়ে স্বস্তি বয়ে এনেছে। শান্তিচুক্তির শর্তের মধ্যে তেল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা, চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে চূড়ান্ত সমঝোতায় উপনীত হওয়া এবং ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালীন ইরানের জব্দকৃত ২৪ বিলিয়ন ডলার সম্পদ অবমুক্ত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশ্বনেতারা। বহুল প্রতীক্ষিত এ চুক্তিকে বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি ‘বড় পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন তাঁরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নিজ নিজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই শান্তি আলোচনায় পাকিস্তান অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।
গত রোববার ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে লেখেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণ।’ মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এই চুক্তির কথা প্রথম প্রকাশ করেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এ অগ্রগতিকে বজায় রাখতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপের শীর্ষ চার শক্তি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি। কাতার, তুরস্ক, জাপান, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ এ সমঝোতাকে ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এক নতুন দিগন্ত বলে অভিহিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এ চুক্তির পেছনে অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে কাতার ও পাকিস্তান। চুক্তির মূল শর্ত হলো, লেবাননসহ সকল ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সব ধরণের সামরিক অভিযান বন্ধ করা। অপরদিকে ট্রাম্প তার পোস্টে জানিয়েছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’, যা ইরান গত কয়েক মাস ধরে কার্যত বন্ধ করে রেখেছিল, তা এখন থেকে সম্পূর্ণ ‘টোল-মুক্ত’ করে দেওয়া হবে। বিনিময়ে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর জারি করা দীর্ঘ অবরোধের অবসান ঘটবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও লেবাননে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর প্রথম হামলার পর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যার বড় অংশই ইরান ও লেবাননের বেসামরিক নাগরিক। পাল্টা জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে।
এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম ইলেকশন) অনুষ্ঠিত হবে, যা দেশটির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে। নির্বাচনের আগে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং এই ব্যয়বহুল যুদ্ধের কারণে সাধারণ মার্কিনিদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেওয়ায় এই যুদ্ধ ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি ও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রোববার বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলীতে ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলার পরও এই চুক্তিটি আলোর মুখ দেখেছে। ইসরায়েলের এই হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়ই। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরু থেকেই এই চুক্তির বিরোধিতা করে আসছিলেন এবং লেবাননে সামরিক তৎপরতা কমাতে ট্রাম্পের অনুরোধ উপেক্ষা করেছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইসরায়েলের এই সাম্প্রতিক হামলা মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তিকে নস্যাৎ বা সাবোটাজ করার অপচেষ্টা। তাদেরকে সংযত হতে হবে। ইসরায়েলকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা বিশ্বশান্তি চায়। মধ্যপ্রাচ্যকে সার্বক্ষণিক যুদ্ধাবস্থার মধ্যে রেখে ইসরায়েলের কোনো লাভ হবে না।
Posted ৫:০১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh