বাংলাদেশ অনলাইন : | সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ছবি : সংগৃহীত
গত ১৪ সেপ্টেম্বর জেরুজালেমের পবিত্র স্থানে ২ হাজার বছর পুরনো পশ্চিম প্রাচীরের বিশাল পাথরগুলো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে দেখানোর পর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করলেন, তাদের দুই দেশের জোট ‘তেমন শক্তিশালী ও টেকসই, যেমন শক্ত পাথরগুলো…আমরা মাত্র ছুঁয়েছি’। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তিনি ভুল।
গাজা যুদ্ধে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ইসরায়েল আগের চেয়ে আমেরিকার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। চলমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে পুরনো বন্ধুরা—অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, ও কানাডা—ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতি দেওয়ার অপেক্ষায় আছে ফ্রান্স।
যদিও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ বাস্তব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে আরও অসম্ভব করে তুলছে। আমেরিকা ছাড়া আর কোনো শক্তি নেই যে ইসরায়েলকে ‘প্যারিয়া স্ট্যাটাস’ থেকে রক্ষা করছে। এই অবস্থান বজায় থাকলে কূটনৈতিক, আইনগত ও সামরিক নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে ইসরায়েল।
যদিও নেতানিয়াহু অবলীলায় আশ্বাস দেন যে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক একেবারেই দৃঢ়, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। নেতানিয়াহুর আচরণ ও কর্মকাণ্ডে ট্রাম্প প্রশাসন অনেকবার ক্ষুব্ধ হয়েছে। শুধু তাই নয়, জোটের ভিতরে গভীর ফাটলগুলোও উপেক্ষা করছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরেই ডেমোক্র্যাট ভোটাররা আমেরিকার সবচেয়ে সুবিধাভোগী মিত্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। রিপাবলিকান ভোটারদের আস্থাও ক্রমশ কমছে। হঠাৎ করে আমেরিকান জনসমর্থন হারানো ইসরায়েলের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় হবে। কারণ ইসরায়েল মাত্র এক কোটি মানুষের একটি ছোট দেশ যা শত্রুভাবাপন্ন ও বিপজ্জনক এক অঞ্চলে অবস্থিত।
আমেরিকার জনমত জরিপ ভয়াবহ সংকেত দিচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের তুলনায় ইসরায়েলকে সমর্থনকারীর হার গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২২ সালে যেখানে ৪২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলকে নেতিবাচকভাবে দেখতেন, এখন তা বেড়ে ৫৩ শতাংশ।
সাম্প্রতিক ইউগভ/ইকোনমিস্ট জরিপে দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। গত তিন বছরে ৫০ বছরের বেশি বয়সী ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ২৩ শতাংশ বেড়েছে। ৫০ বছরের নিচের রিপাবলিকানদের মধ্যে এখন সমর্থন সমানভাবে বিভক্ত, যেখানে ২০২২ সালে ৬৩ শতাংশ ইসরায়েলকে সমর্থন করত।
২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৩০ বছরের কম বয়সী ইভানজেলিকাল খ্রিস্টানদের মধ্যে যারা ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনের চেয়ে বেশি সমর্থন করত, তাদের হার ৬৯ শতাংশ থেকে নেমে ৩৪ শতাংশে এসেছে। জরিপকারীরা মনে করছেন, এই পরিবর্তন স্থায়ী হয়েছে।
কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে সেই সময়ে যখন আমেরিকা-ইসরায়েল সম্পর্ক ছিল মূল্যবোধ ও স্বার্থের মিশ্রণে গড়া। উভয় দেশই গণতান্ত্রিক, নিপীড়ন থেকে মুক্তি খুঁজতে আসা প্রগতিশীলদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। উভয়ই বিশ্বাস করত তাদের দেশ অসাধারণ: একদিকে পাহাড়ের ওপর উজ্জ্বল নগরী অন্যদিকে ‘জাতির বাতিঘর। একই সময়ে, তাদের স্বার্থগত মিলও ছিল। স্নায়ু যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ছিল আরব দুনিয়ায় সোভিয়েত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে প্রাচীর। সোভিয়েত পতনের পরও তারা ইরানের বিরুদ্ধে মিত্র ছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর তারা ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদের প্রতি ঘৃণায় একতাবদ্ধ হয়।
তাহলে সমস্যা কোথায়? ডেমোক্র্যাটদের জন্য বিরোধ মূলত মূল্যবোধ নিয়ে—বিশেষত তরুণদের মধ্যে। আমেরিকার দাসত্ব ও নব্য ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে তাদের ক্ষোভ তারা নিপীড়িত ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি বসতকারীদের ওপর প্রতিফলিত করে। যদিও তুলনাটি সবসময় সঙ্গত নয়।
ইসরায়েলি রাজনীতির ডানদিকে সরে যাওয়ায় এটা আরও তীব্র হয়েছে। এর পাশাপাশি নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে দৃঢ়ভাবে রিপাবলিকান শিবিরে নিয়ে গেছেন কিছুটা হলেও এই আশায় যে, রিপাবলিকানরা যে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রশাসনকে চেপে ধরবে যদি তারা বসতি বা শান্তি আলোচনার ব্যাপারে চাপ দেয়।
রিপাবলিকান ভোটারদের সমর্থন কমার কারণ বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব নয়, বরং স্বার্থের বিভাজন। করদাতাদের ক্ষোভ মূলত ছড়িয়েছে তাদের ট্যাক্সের ৩০০ বিলিয়ন ডলার ইউক্রেনকে দেওয়ায় কিংবা ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়মিত ইসরায়েলকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ায়।
কাতার ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের হামলার ফলে ট্রাম্পের আঞ্চলিক শান্তি প্রচেষ্টায় বিঘ্ন ঘটেছে। টাকার উৎস জানেন এমন একজন প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে ধনী দাতাদের কেউ কেউ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর দিকেও ঝুঁকছেন।
গাজার যুদ্ধ এই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। ক্ষুধার্ত শিশুদের ছবি দেখে আমেরিকানরা স্বাভাবিকভাবেই শিউরে ওঠে। টাকার কার্লসনের মতো কিছু রিপাবলিকান ভাষ্যকার ক্ষুব্ধ যে ইসরায়েল হয়তো আমেরিকাকে ইরানের বিরুদ্ধে আরেকটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দিকে ধাবিত করতে পারে।
ইসরায়েল সমালোচিত হলে তার রক্ষাকারীরা প্রায়ই ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তোলে—যা সব সময় ন্যায্য নয়। অতিরিক্ত ব্যবহারে একটি জঘন্য অভিযোগ তার ধার হারাচ্ছে। এটি ইসরায়েলসহ সারা বিশ্বের ইহুদিদের জন্যই খারাপ।
আশাবাদীরা বলবেন এটা ভীতি প্রদর্শন। ইসরায়েলি ও আমেরিকান সরকার অতীতে ঝগড়া করেছে। তাদের সেনারা এর আগের জুনে প্রথমবার একসঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে লড়েছে। গাজার যুদ্ধ শেষ হলে এবং নতুন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এলে, ইসরায়েলের আমেরিকার ঘনিষ্ঠ থাকার স্বার্থ আবারও নিজেকে প্রমাণ করবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের উত্থান মানে আমেরিকা এটিকে উপেক্ষা করতে পারবে না বলে তারা মনে করেন।
কিন্তু এটা আত্মতুষ্টি। দীর্ঘমেয়াদি জনমতের পরিবর্তন সরকারগুলোর ঝগড়ার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। ধীরে ধীরে গড়ে উঠলেও এগুলো পাল্টানো কঠিন। ভোটাররা মত বদলালে রাজনৈতিক ট্যাবু হঠাৎ ভেঙে পড়তে পারে। আজও কিছু ইসরায়েলি বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, জো বাইডেনই হবেন শেষ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যিনি স্বতঃসিদ্ধভাবে জায়নিস্ট।
সামরিক সহায়তা দশ বছরের চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েল প্রতিবছর ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পায়, যা ২০২৮ সালে শেষ হবে এবং এখনই নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন। কিন্তু ইসরায়েল চিন্তিত যে ট্রাম্প অর্থ দিতে অস্বীকার করবেন, তাই তারা এই চুক্তিকে ‘অংশীদারিত্ব’ হিসেবে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। অর্থের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রযুক্তি ভাগাভাগি এবং উন্নত অস্ত্রের নিশ্চয়তা—বিশেষ করে যুদ্ধের সময়।
ধারণা করা ভুল হবে যে, নেতানিয়াহুর উত্তরসূরি এলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ইসরায়েলও একটি গণতন্ত্র; এবং এটি এমন এক বিভক্ত গণতন্ত্র যেখানে অনেক ভোটার জাতীয়তাবাদী-ধর্মীয় ডানপন্থাকে সমর্থন করেন। গাজা লড়াই থামলেও তা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত হয়ে থাকবে। শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো বসতি সম্প্রসারণ ও গাজা ও পশ্চিম তীরের অংশ দখলে বদ্ধপরিকর।
এই সপ্তাহে নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে একটি ‘সুপার-স্পার্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যারা একা দাঁড়াতে প্রস্তুত। গাজায় লড়াই চালিয়ে এবং আরব রাজধানীগুলোতে ইচ্ছেমতো আক্রমণ চালিয়ে, ইসরায়েল বাজি ধরেছে যে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আধিপত্য তাকে আরও সুরক্ষিত করবে। এই পেশিশক্তিনির্ভর, আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আসলে এক করুণ ভ্রান্তি। এটা শেষ পর্যন্ত তার একমাত্র ও অদ্বিতীয় রক্ষককেই (আমেরিকা) দূরে ঠেলে দিতে পারে। ইসরায়েলের জন্য এর চেয়ে বড় কৌশলগত ভুল আর কিছু হতে পারে না।
Posted ৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh