মোহাম্মদ আজাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৭ নভেম্বর ২০২২
মধ্যবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল এখন বলা চলে নিশ্চিত। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে সিনেটে ৫০টি আসনে জয়ী হয়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি পুনরায় তাদের প্রাধান্য ধরে রেখেছে। অপরদিকে হাউজের ৪৩৫ টি আসনের মধ্যে রিপাবলিকান পার্টি ২১৭টি আসন পেয়ে এগিয়ে আছে। পক্ষান্তরে হাউজে ২০৯টি আসন পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। হাউজে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। একারণে এখন হাউজে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত। তবে তাদের ধারণা ছিলো বড় ধরণের ব্যবধানে হাউজে জয় পাবে রিপাবলিকান পার্টি। এদিকে দলটি গত ১৪ নভেম্বর হাউজে তাদের স্পিকার নির্বাচিত করেছে ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান কেভিন ম্যাককার্থীকে। আগামী জানুয়ারি তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। ১৫ নভেম্বর একই দিন ২০২৪ সালে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থীতা ঘোষণা করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনী ফলাফলে রিপাবলিকান পার্টির যে অবস্থা হয়েছিল, ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো দীর্ঘ ৬০ বছর পর ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। জনগণ ব্যালেন্স ও পাওয়ারের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আমেরিকানরা মনে করেন যে হোয়াইট হাউজ ও কংগ্রেসে যদি একই দলের কর্তৃত্ব বজায় থাকে তাহলে প্রেসিডেন্টকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না। ১৯৬৩ সালে ডালাসে আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট ছিলেন জন এফ কেনেডি। তার মৃত্যুর আগে ১৯৬২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয়ী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হেরে যায়। যেমনটি ঘটেছে গত সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনে।
২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা মনে করেছিল যে তারা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সহজে জয় পেতে যাচ্ছে।নির্বাচনের ঠিক একদিন আগেও প্রতিটি জরিপ সংস্থার জরিপে রিপাবলিকানরা জয়ী হচ্ছে দেখানো হয়েছে। ডেমোক্রেটরা তাদের পরাজয়ের প্রস্তুতি অনেকটা নিয়েই রেখেছিল। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্তক হাউজের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি। সিনেটে ডেমোক্রেটরা অপ্রত্যাশিতভাবে জয় পেয়েছে। জর্জিয়ায় সিনেট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়েছে, কারন সেখানে স্টেটের আইন অনুযায়ী কোনো বিজয়ী প্রার্থী যদি ৫০ শতাংশের কম ভোট পান তাহলে সেখানে ‘রান অফ’ ইলেকশন হতে হবে। আগামী ৬ ডিসেম্বর সেখানে রান অফ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জর্জিয়ায় ডেমোক্রেট প্রার্থী ছিলেন সিনেটর রাফায়েল ওয়ারনক ও রিপাবলিকান প্রার্থী হার্সেল ওয়াকার। চেজ অলিভার নামে তৃতীয় একজন প্রার্থী ছিলেন, যিনি নির্বাচনে ২.১ শতাংশ ভোট পান। ‘রান অফ’ নির্বাচনে চেজ অলিভার আর প্রার্থী হতে পারবেন না।
ধারণা করা হচ্ছে সিনেটের জর্জিয়ার আসনটি ডেমোক্রেটদের হাতে থাকবে। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের নেপথ্য কারণগুলো ছিল বিতর্কিত সাবেক প্রেসিডেন্ট ড্রোনাল্ড ট্রাম্পর্কে নির্বাচনী প্রচারণায় টেনে আনা, অতি আস্থা ও সিনেট মাইনরিটি লিডার মিটচ ম্যাককনেলের দুর্বল নেতৃত্ব। ট্রাম্পকে প্রচারণায় অবতীর্ণ করানো রিপাবলিকানদের পরাজয়ের একমাত্র কারণ না হলেও অধিকাংশ জাদরেল রিপাবলিকান কুশলী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ট্রাম্পর্কে বেশির ভাগ দায়ী করেছেন। রিপাবলিকান ঘেঁষা নিউইয়র্ক পোস্ট পত্রিকার গত ১৩ নভেম্বর সংখ্যায় পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নিবন্ধে লেখা হয়েছে, “ট্রাম্পকে বিশ্বাস করবেন না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল লন্ডভন্ড হওয়ার একমাত্র কারণ ট্রাম্প। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেসব রিপাবলিকান প্রার্থীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছেন সেইসব প্রার্থীরা পরাজিত হয়েচেন।
দ্বিতীয় কারণ ছিল অতি আস্থা। রিপাবলিকানরা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে অতি মাত্রায় আস্থাশীল ছিল, এবং এটিও পরাজয়ের একটি কারণ। শেষ কারণ সিনেট মাইনরিটি লিডার মিটচ ম্যাকনেলের দুর্বল নেতৃত্ব ও ভুল প্রচারণা। এ অভিযোগ এনেছেন একাধিক রিপাবলিকান, যারা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। অনেকে অভিযোগ করেছেন যে নির্বাচনে সঠিক এজেন্ডা নিয়ে অভিযানে অবর্তীর্ণ হওয়ার পরিবর্তে তিনি শুধু প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সমালোচনায় মুখর ছিলেন।, যে কারণে দলকে নির্বাচনে খেসারত দিতে হয়েছে।এরই মধ্যে ফ্লোরিডার সিনেটর রিক স্কট সিনেট মাইনরিটি লিডার মিটচ ম্যাককনেলের পদকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। নিজ দলের আরো একাধিক সিনেটরের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী জানুয়ারি মাসে তিনি সিনেট মাইনরিটি লিডারের পদ হারাতে পারেন। অন্যদিকে হাউজ মাইনরিটে লিডার কেভিন ম্যাককর্টি পরবর্তী স্পিকার নির্বাচিত হতে পারেন, যদি রিপাবলিকানরা হাউজে ২১৮ আসন নিশ্চিত করতে পারে।
ব্যর্থতা নিয়ে রিপাবলিকান দলে বিভক্তি
ডেমোক্রেটদরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়ায় রিপাবলিকান দলের মধ্যে বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। এই বাজে ফলাফলের জন্য একে অপরকে দায়ী করছেন রিপাবলিকান রাজনীতিবিদরা। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচকরা নির্বাচনে ব্যর্থতার জন্য তাকেই দায়ী করছেন। অপরদিকে অন্য রিপাবলিকানরা তাদের সিনেট নেতা মিচ ম্যাককনেলকে দুষছেন। এখনও হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভের ফলাফল ঝুলে আছে। তবে তাতে এগিয়ে আছে রিপাবলিকানরা। ২১৭ আসনে তাদের জয় নিশ্চিত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য আর প্রয়োজন ছয় আসন। অপরদিকে ডেমোক্রেটদের আসন সংখ্যা ২০৪। প্রতিনিধি পরিষদ দখলে নিতে না পারলেও সম্ভাব্য রিপাবলিকান ঝড় তারা সফলভাবে মোকাবেলা করতে পেড়েছে। প্রথম দিকে রিপাবলিকানরা যেভাবে ঝড়ের বেগে সব আসনে জয় পেতে শুরু করেছিল তাতে হাউস ও সিনেট উভয় চেম্বারেই হারের পথে ছিল ডেমোক্রেটরা। অথচ শেষ পর্যন্ত সিনেট নিজের করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে রিপাবলিকানরা। ভোট গণনা যত আগাচ্ছে হাউসের দৌড়েও ব্যবধান কমে আসছে। আর এই অবস্থার জন্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে একে অপরকে দুষছেন রিপাবলিকান নেতারা। ম্যারিল্যান্ডের রিপাবলিকান গভর্নর ল্যারি হোগ্যান বলেন, এ নিয়ে তিনটি নির্বাচনে ট্রাম্পের কারণে আমাদের দায় চুকাতে হলো। ট্রাম্প বুঝিয়েছিলেন যে- আমরা জিততে জিততে হাপিয়ে যাব। কিন্তু আমরা হাপিয়েছি হারতে হারতে। হোগ্যান যদিও আগে থেকেই ট্রাম্পের সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
ইতিহাস বলে, হোয়াইট হাউসে যে দল ক্ষমতায় থাকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তারাই বেশি আসন হারায়। সেই হিসেবে ডেমোক্রেটরা নিম্নকক্ষে হারলেও গত ২০ বছরের মধ্যে সবথেকে ভাল ফল করেছে। ডেমোক্রেট নেতা ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, আমরা এসব ইতিহাস না বরঞ্চ আমাদের দল এবং প্রতিপক্ষের প্রতি নজর দিয়েছিলাম। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বাইডেনকে ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান পেলোসি। হোয়াইট হাউস থেকেও এখন বেশ জোরেসোরেই সেই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের সিনিয়র উপদেষ্টা আনিতা ডুন সিবিএস-কে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজেই তার সিদ্ধান্ত শিগগিরই জানাবেন। তিনি অন্যদের চিন্তা কিংবা পদক্ষেপ থেকে প্রভাবিত হবেন না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল দলের জন্য ব্যাপক ফলপ্রসূ হয়েছে। তাই বাইডেন মনে করেন, তিনিই এই দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আদর্শ ব্যক্তি। বিরোধী পক্ষে আগামী নির্বাচন করতে পারেন ডনাল্ড ট্রাম্প। ২০২০ সালের নির্বাচনেও এই দুই জনেরই প্রতিদ্বন্দ্বীতা হয়েছিল।
Posted ২:০১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৭ নভেম্বর ২০২২
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh