বাংলাদেশ রিপোর্ট : | বৃহস্পতিবার, ২৮ এপ্রিল ২০২২
আমেরিকান কিশোর ও তরুণদের মধ্যে অবসাদগ্রস্ততা, নিজের ক্ষতি সাধন এবং আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্ট শুরু করা হয়েছে মিনিয়াপোলিসের শহরতলির ১৩ বছর বয়সী এক বালিকার কথা প্রসঙ্গ দিয়ে, লিভিং রুমে সে চেয়ারে বসে ছিল, হঠাৎ লাফ দিয়ে বের হয়ে ব্যাকইয়ার্ডে জঙ্গলে চলে যায়।
এর একটু আগেই মা লিন্ডা আড়চোখে তাকিয়েছিলেন কন্যার স্মার্টফোনের দিকে এবং কিশোরী কন্যা তার স্বাধীনতায় অনাহূত অনুপ্রবেশ টের পেয়ে ফোন হাতে জঙ্গলে চলে যায়। লিন্ডা মেয়ের ফোনে যেসব ছবি দেখেছিলেন তাতে রীমিতো শঙ্কিত হয়ে ওঠেছিলেন। শরীরের খোথায় নিজে আঘাত করেছে, রোমান্টিক কিছু ছবি ইত্যাদি। গত দু’বছর ধরেই লিন্ডা তার মেয়ের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলেন- অবসাদে আচ্ছন্ন থাকে, নিজের শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করে, কাউকে ব্যগ্রতার সাথে টেক্সট পাঠায়, ‘বলো, তুমি কোথায়?’
আমেরিকান কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিরাট এক পরিবর্তন এসেছে এবং একটি অংশের পরিবর্তন সর্বনাশা প্রমাণিত হচ্ছে। তিন দশক আগে আমেরিকার জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়েছিল মাত্রাতিরক্ত এলকোহল সেবন, মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানো, কিশোরীদের গর্ভসঞ্চার এবং ধূমপান। এ প্রবণতাগুলো যত দ্রুত এসেছিল তেমন দ্রুত শেষ হয়েছে এবং এর স্থলে এসেছে নতুন জনস্বাস্থ্য হুমকি : মানসিক স্বাস্থ্য বৈকল্যের শিকার বিপুল সংখ্যক কিশোর-কিশোরী ও ওঠতি বয়সের তরুণ-তরুণী। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৯ সালে পর্যবেক্ষণের আওতায় আসা আমেরিকার ১৩ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর মাঝে বড় ধরনের মানসিক অবসাদগ্রস্থতা পাওয়া গেছে, যা ২০০৭ সালের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি।
গত বছরগুলোতে অর্থ্যাৎ করোনা ভাইরাস মহামারীর সময়ে কমবয়সীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সিডিসির পরিসংখ্যানে পাওয়া যাচ্ছে, যা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে জাতি ও বর্ণগত গ্রুপ, শহুরে ও গ্রামীণ গ্রুপ ও আর্থ-সামিাজিক গ্রুপের মধ্যে। গত ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল কিশোর ও তরুণ বয়সীদের মধ্যে বিপর্যয়কর মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ব্যাপারে সতর্কতামূল্যক বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। তিনি এ সংকট বেড়ে চলা এবং পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সংকট থেরাপিষ্ট, ও চিকিৎসা সুবিধা না থাকা এবং এই প্রবণতা ব্যাখ্যার মতো যথেষ্ট গবেষণা কার্যক্রমের ঘাটতির উল্লেখ করেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার আরভিনে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সাইকোলজিস্ট ক্যানডিস ওডগারস বলেছেন, “এখনকার তরুণরা অনেক শিক্ষিত, কিশোরীদের গর্ভধারনের সম্ভাবনা কম, মাদক সেবনও কম করে এবং দুর্ঘটনা বা আহত হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কাও কম। যেকোনো বিচারে এখনকার ওঠতি বয়সীরা চমৎকার কাজ করছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা সত্বেও অবসাদগ্রস্থতা, আত্মহত্যা প্রবণতার মতো দিকগুলো প্রকৃতপক্ষেই উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি আমাদেরকে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে আটকে দেয়, যা দূর করা অত্যাবশ্যক। কারণ এটি আমাদের বাচ্চাদের জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্ন।
এই সঙ্কটকে প্রায়শ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তারকে দায়ী করা হয়। কিন্তু পরিসংখ্যান তা বলে না, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দায়ী করার বিরুদ্ধেই বেশি যুক্তি আসে, বরং তরুণরা কম্পিউটার ও মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা থেকে নিজেদেরকে ক্ষতি করা দিকে টেনে নেয়ার চেয়ে অন্যান্য কারণে নিজের সবর্ণাশ ডেকে আনার কথা ভাবে। ফেডারেল গবেষণায় দেখা যায় ওঠতি বয়সীরা কম সময় ঘুমায়, কম ব্যয়াম করে অথবা আদৌ ব্যায়াম করে না এবং বন্ধুদের সঙ্গে একত্রে কম সময় কাটায়- এসব বিষয় মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। এই বিচ্ছিন্নতা ওঠতি বয়সীদের আচরণের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, একাকীত্বের যন্ত্রণা নিজের ক্ষতি করা এমনকি আত্মহত্যা পথ বেছে নেয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রিপোর্টের শুরুতে উল্লেখিত লিন্ডা ও তার স্বামী তাদের কন্যার মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন দেখে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন এবং একই অবস্থার মোকাবিলা করছে এমন সন্তানের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা আরও শঙ্কিত হয়ে পড়েন যে সন্ধ্যায় তাদের কন্যা রেগে জঙ্গলে চলে গিয়েছিল, এর ক’দিন পরই স্থানীয় একটি মেয়ের আত্মহত্যার খবর পেয়ে। তিনি বলেন, “ওরা কী ভাবছে সেই ভাবনার ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। কী ঘটতে পারে আমি ভুক্তভোগীদের শুধু সেটুকু বলতে চাই।” নিউইয়র্ক টাইমস গত এক বছর যাবত লিণ্ডার কন্যাসহ আরও কয়েক ডজন ওঠতি বয়সের ছেলেমেয়ের সঙ্গে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রের কিশোর-কিশোরীদের পরিবর্তনশীল প্রবণতা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছে। তারা সংশ্লিষ্ট ছেলেমেয়েদের অবিভাবক, স্কুলের শিক্ষক ও পরামর্শকদের সঙ্গেও কথা বলেছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির চাইল্ড এন্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকোলজিস্ট এমিলি প্লুহার লিন্ডার মেডিকেল রিপোর্ট যাচাই করে বলেছেন, “তার মাঝে অবদমিত ইচ্ছার ক্ষুব্ধ প্রকাশের সর্বণাশা প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে, যা তাকে সঙ্গ দেওয়ার মধ্য দিয়ে নিরাময় করে তোলা সম্ভব।”
লিন্ডার বয়স এখন ১৪ বছরে পড়েছে। অনেক সময় সে লাজুক, অনেক সময় স্পষ্টবাদী। ১০ বছর বয়সে সে স্মার্টফোন পায়। তার বাবা মা দু’জনই কাজে বাইরে ব্যস্ত থাকতেন এবং তাদের সার্বক্ষণিক উৎকণ্ঠা ছিল স্মার্টফোনটি কন্যার অবসর সময়ে অধিকাংশ নিয়ে নিতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য ফোনটি না দিয়ে কোনো উপায় ছিল না। ১১ বছর বয়সে আরেকটি পরিবর্তনের সময় আসে কৈশোরে উন্নীত হওয়া। টেম্পল ইউনিভার্সিটির একজন সাইকোলজিষ্ট লরেন্স স্টেইনবার্গ বলেছেন, কৈশোরে উপনীত হওয়ার সাথে সাথে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও অবস্থানগত তথ্য জানা জন্য মস্তিস্ক অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে: “আমি কে? আমার বন্ধুরা কে? আমার স্থান কোথায়?” ইত্যাদি। সব প্রশ্নের উত্তর সে পায় না। ফলে অনেকের চেতনায় এক শূন্যতার সৃষ্টি হয় এবং নিবিড়তম মানুষ- মা বাবা, ভাইবোনের সঙ্গ ছাড়া এ ব্যবধান ক্রমে বাড়তে থাকে, এবং এর অনুপস্থিতিতে তার পক্ষে স্থিরতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না এবং ভিন্ন পথ বেছে নেয়। এ পথ নিজের ক্ষতি সাধন।
সিক্সথ গ্রেডে পড়ার সময় লিণ্ডার কন্যার মাঝে সমস্যার লক্ষণগুলো দেখা দিতে থাকে। স্কুলের পাঠে অমনোযোগী হয়ে পড়ে। তার বাবা মাকে স্কুলে ডাকা হয়। কিন্তু লিন্ডা ও তার স্বামী সন্ধিগ্ধু ছিলেন। তারা সন্তানের মানসিক ভারসাম্যহীনতার কথা ভাবতে চাননি। সেভেনথ গ্রেডে ওঠে সে আরও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে যখন তার এক ঘনিষ্ট বন্ধু কোনো একটি ক্ষেত্রে সেরা হওয়ার মর্যাদা পায়। সে এতটাই বিক্ষিপ্ত ছিল, যা তার নিজের কথায়, “আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতৈ চাইছিলাম। রুমে বসে আমি শুধু কেঁদেছি।
Posted ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৮ এপ্রিল ২০২২
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh