নিউইয়র্ক : | বৃহস্পতিবার, ০২ জুন ২০২২
নব গঠিত জ্যামাইকা বাংলাদেশী আমেরিকান ফাউন্ডেশন-এ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো পথমেলা। বাংলাদেশের অসহায় পথশিশুদের সাহাযার্থে রোববার নিউইয়র্কের জ্যামাইকার ৮৪ এভিনিউতে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। কমিউনিটিতে স্ব স্ব ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য পথমেলায় নিউইয়র্কের তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে মরনোত্তর সম্মাণনা জানানো হয়। তারা হলেন বাংলাদেশ সোসাইটি সভাপতি মরহুম কামাল আহমেদ, খানস টিউটোরিয়াল-এর প্রতিষ্ঠাতা, একুশে পদকপ্রাপ্ত মরহুম ড. মনসুর খান ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, মান্নান বেকারী, গ্রোসারী ও সুপারমার্কেটের প্রতিষ্ঠাতা, জেবিবিএ’র সাবেক সভাপতি মরহুম সাঈদ রহমান মান্নান। মেলা উপলক্ষে ‘পথকলি’ শীর্ষক একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হয়। তবে মেলায় বাংলাদেশের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী কনক চাঁপা বক্তব্য রাখলেও তিনি কোন গান পরিবেশন না করায় দর্শকরা হতাশ হয়েছেন। অপরদিকে নিধার্রিত সময়ের এক ঘন্টা আগে মেলার কার্যক্রম বন্ধ এবং র্যাফর ড্র না হওয়া সহ বিভিন্ন কারণে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এব্যাপারে মেলার আহ্বায়ক নাসির আলী খান পল ইউএনএ প্রতিনিধি-কে বলেন, বাংলাদেশের অসহায় পথশিশুদের সাহাযার্থে নবগঠিত জ্যামাইকা বাংলাদেশী আমেরিকান ফাউন্ডেশন এই মেলার আয়োজন করা হয়। বেলা ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত মেলার কার্যক্রম চলার কথা থাকলেও নিরাপত্তার কথা ভেবে এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কথায় আমরা এক ঘন্টা আগে মেলার কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হই। ফলে মেলার নির্ধারিত র্যাফল ড্র করা সম্ভব হয়নি। এজন্য তিনি দু:খ প্রকাশ করে বলেন, যারা র্যাফল ড্র’র কুপন ক্রয় করেছেন তাদের অনেককেই কুপন ক্রয়ে অর্থ ফেরৎ দেয়া হয়েছে এবং বাকী যারা ক্লেম করবেন তাদের অর্থও ফেরৎ দেবো। তবে সবাই মিলে মেলাটি সফল করায় তিনি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বেলা ২টার দিকে আনুষ্ঠানিভাবে মেলার কার্যক্রম শুরু হয়। পবিত্র কোরআন, বাইবেল ও গীতা থেকে পাঠ করার পর শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মেলা কমিটির আহ্বায়ক নাসির আলী খান পল, সদস্য সচিব আহসান হাবীব, প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আলী, আখতার বাবুল প্রমুখ। অনুষ্ঠানে টম সোয়াজি, দিয়ানা রেইনা ও স্থানীয় কাউন্সিলম্যান জি জিনারো ছাড়াও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মেলার প্রধান স্পন্সর, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু জাফর মাহমুদ, ভার্জিনিয়াস্থ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ভিসি ও প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আবু বকর হানিফ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ডিষ্ট্রিক্ট লীডার পদপ্রার্থী শাহ নেওয়াজ, জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির সভাপতি ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার প্রমুখ।
গ্র্যান্ড স্পন্সর আবু জাফর মাহমুদ মেলার অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে বলেন, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, বাংলাদেশকে সবসময় মনে রাখি। আজকে এই মেলায় বাংলাদেশকে স্মরণ করছি। দেশের ছিন্নমূল শিশুদের জন্য আজকের এ মেলার আয়োজনে অংশীদার হতে পেরে আমি গর্বিত।
বিকেলে নিউইয়র্ক ষ্টেট-এর গভর্ণর পদপ্রার্থী টম সোয়াজি ও তার রানিংমেট দিয়ানা রেইনাসহ মূলধারা ও কমিউনিটি নেতৃবৃন্দসহ প্রবাসী বাংলাদেশীদের পদচারণায় মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠে। অনেক প্রার্থী নেমে পড়েন নির্বাচনী প্রচারণায়। এরমধ্যে টম সোয়াজি ছাড়াও অ্যাসেম্বলী ডিষ্ট্রিক্ট ২৪এ থেকে ডেমোক্র্যাট দলীয় ডিষ্ট্রিক্ট লীডার পদপ্রার্থী শাহ নেওয়াজের প্রচারণা ছিলো চোখে পড়ার মতো।
সঙ্গীতানুষ্ঠানের এক পর্যায়ে মূলধারা ও কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে মঞ্চে মরহুম কামাল আহমেদ, মরহুম ড. মনসুর খান ও মরহুম সাঈদ রহমান মান্নান-এর পরবার বা তাদেও প্রতিনিধির হাতে মরোনাত্তর সম্মানণা তুলে দেয়া হয়। এই সম্মানণা তুলে দেন জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী কনক চাঁপা। এছাড়াও ৫ কভিড হিরো যথাক্রমে ডা. নাজমুল এইচ খান, ডা. চৌধুরী সারোয়ারুল হাসান চৌধুরী, ডা. এস চৌধুরী এবং সেরা নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে রানো মালিক, সঙ্গীত শিল্পী রানো নেওয়াজ ও মুনমুন বারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। মেলায় প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন আশরাফুল হাসান বুলবুল ও সোনিয়া সিরাজ।
নিউইয়র্ক (ইউএনএ) :
পথশিশুদের জন্য আয়োজিত পথমেলা যেভাবে পথ হারালো
বাংলাদেশ প্রতিবেদন : করোনা মহামারির ধকল অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে নিউইয়র্কের বাংলাদেশী কমিউনিটি। নতুন স্বাভাবিকতায় বারোয়ারী অনুষ্ঠানের হিড়িক পড়েছে এখন। নির্মল বিনোদন কোথাও কোথাও রূপ নিয়েছে ব্যবসায়িক ধান্ধায়। দু’বছরের বিরতি শেষে গ্রীষ্মের শুরুতে পথমেলার আয়োজন চলছে সিটির বাংলাদেশী অধু্যুষিত বিভিন্ন এলাকায়। সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশী পরিবারের অনেকেই পথমেলায় অংশ নেন। পৃষ্ঠপোষকতাও করেন অনেকে।
এবার মৌসুমের শুরুতে জ্যামাইকা বাংলাদেশ পথমেলা-২০২২ এর আয়োজন করে সম্পূর্ণ নতুন জ্যামাইকা বাংলাদেশ আমেরিকান ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশের অসহায় পথশিশুদের সাহায্যার্থে গত ২৯ মে রোববার জ্যামাইকা হিলসে অনুষ্ঠিত মেলা ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে বাদ-প্রতিবাদের ঝড় বইছে স্থানীয় বাংলাদেশী কমিউনিটিতে। ফেইসবুক সহ বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া সরব হয়ে উঠেছে। জ্যামাইকা বাংলাদেশ মেলাকে কেন্দ্র করে আয়োজক সংগঠন ব্যাপক অনিয়ম ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে ভুক্তভোগীদের মাঝ থেকে। বিশেষ করে মেলায় কনকচাঁপা, রথীন্দ্রনাথ রায় সহ যে সকল শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করবেন বলে বিজ্ঞাপন দেয়া হয় পত্রিকায় কার্যত তাদের কেউ সঙ্গীত পরিবেশন করেননি। আর স্থানীয় যে সকল শিল্পী গান গেয়েছেন তাদের নূন্যতম কোন সম্মানী দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন অনেক শিল্পী। মেলায় অর্জিত সমুদয় অর্থ বাংলাদেশের পথ শিশুদের জন্য পাঠানো হবে এমন অজুহাতে শিল্পীদেরকে বিমুখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি ঘটেছে র্যাফেল ড্র নিয়ে। মেলায় র্যাফল ড্র’তে ‘ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি’ থাকবে প্রথম পুরস্কার হিসেবে সাংবাদিক সম্মেলনে এমন ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু মেলার দিন গাড়ির কোন অস্তিত্ব ছিলো না। মেলায় ৫ ডলার মূল্যে স্বাভাবিক র্যাফল ড্র’র টিকিট বিক্রি করা হলেও শেষ পর্যন্ত কোন র্যাফল ড্র অনুষ্ঠিত হয়নি। দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত মেলা চলবে এমন ঘোষণা থাকলেও ৭টার মধ্যে সবকিছু বন্ধ হয়ে যায় পুলিশের নির্দেশে। ফলে পুরষ্কার ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হয়েছে র্যাফেল টিকিট ক্রয়কারীদের। দুর্দিনে বাজারে ৫ ডলারই বা কম কিসে? এছাড়া মেলায় যেসকল ভিআইপি অতিথি থাকবেন বলে ফোনে জানিয়েছিলেন আয়োজক, তাদের কারো দেখা মেলেনি মেলায়। কাঙ্খিত দর্শক শ্রোতার অভাবে স্টলগুলো ব্যবসায়িকভাবে মার খেয়েছে এমন অভিযোগ অনেকের। জ্যামাইকা বাংলাদেশী আমেরিকান ফাউন্ডেশন সম্পূর্ন নূতন একটি সংগঠন।
২৯ মে’র মেলাকে উপলক্ষ্য করে রাতারাতি সংগঠনটির গোড়াপত্তন ঘটান কমিউনিটির পরিচিত মুখ নাসির আলী খান পল। এজন্য তিনি বাংলাদেশের ‘পথশিশুদের সাহায্যার্থে’ শ্লোগানটি সামনে নিয়ে আসেন। গত ৭মে, জ্যামাইকার ষ্টার কাবাবে সংবাদ সম্মেলনে মেলার বিভিন্ন দিকের কার্যক্রম ঘোষণা দেন নাসির আলী খান পল। জ্যামাইকা পথমেলার বাজেট ৫০হাজার ডলার বলে জানান তিনি। মেলায় ১০/১২ হাজার মানুষ অংশ নিবেন। পৃষ্ঠপোষক ছাড়াও মেলায় অংশ গ্রহণকারীদের নিকট থেকে ১ ডলার করে অনুদান নেয়া হবে পথশিশুদের জন্য। সংবাদ সম্মেলনে আয়োজক সংগঠন এবং এর কর্মকর্তাদের পরিচিতি সম্পর্কে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি পল খান। আসলে মেলাকে সামনে রেখে নিবন্ধিত সংগঠনটি একান্তভাবেই তার নিজস্ব। ব্যাংক একাউন্টিও তার হাওলায়। তিনি ছাড়া এ সংগঠনের দ্বিতীয় কোন কর্মকর্তার নাম সংবাদ সম্মেলনে বলতে পারেননি পল খান।
মেলার বিজ্ঞাপনে কমিউনিটির বিশেষ করে জ্যামাইকার পরিচিত অনেকের নাম সেঁটে দিলেও তাদের সিংহভাগ মানুষ এব্যাপারে কিছু জানতেন না। ফলে অনেকেই তাদের নাম বিজ্ঞাপন থেকে প্রত্যাহার করতে বলেন। এসব নিয়ে বিপাকে পড়েন আয়োজক। অনেকের সাথে গরম বাক্য বিনিময় হয়। এজন্য প্রতিদিনই কর্মকর্তাদের নামের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় বিজ্ঞাপনে। পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় শোভা পাচ্ছে এমন অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন বিজ্ঞাপনে তাদের নাম দেখে। তারপরও পথকলিদের কথা শুনে অনেকে মোটা অংকের অনুদান দিয়েছেন বলে বাজারে চাউর আছে। মেলাতে আশানুরূপ জনসমাগম না হওয়ায় পৃষ্ঠপোষকগণও হতাশ, অখুশী। সবকিছু মিলিয়ে জ্যামাইকা বাংলাদেশ পথমেলা নিয়ে আগে থেকেই বিভ্রান্তি ও ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়। যার চূড়ান্ত বর্হিপ্রকাশ ঘটে মেলার দিন অনিয়মের মধ্য দিয়ে।
যারা আয়োজকের ঐকান্তিক অনুরোধে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন তারাও এখন ক্ষুব্ধ। জ্যামাইকায় বাংলাদেশের পথশিশুদের নামে ব্যক্তিবিশেষ মেলা আয়োজন করে পার পেয়ে যাবে এমনটি হবে না বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। অচিরেই এ বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হবে বলেও জানান স্থানীয় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ। তাদের মতে পল খান একক সিদ্ধান্তে সবকিছু করেছেন। পুরো হিসেব-নিকেষ তার কাছে। পথশিশুদের সাহায্যের আড়ালে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কাজ করেছে বলে তাদের ধারণা। ফলে পথশিশুদের জন্য আয়োজিত পথমেলা পথ হারিয়ে এখন বিপাকে। জ্যামাইকাবাসী চান পথকলিদের নামে সংগৃহীত অর্থের হিসাব ও স্বচ্ছতা।
Posted ৮:১৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০২ জুন ২০২২
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh