বাংলাদেশ রিপোর্ট : | বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৪
বিগত পোনে দুশ’ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রান্ট জনসংখ্যার পরিমাণ বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। গত জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রান্ট জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে মোট জনসংখ্যার ১৫.৫ শতাংশ। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস এবং ইউএস সেন্সাস ব্যুরোর পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে ১৮ শতকের শেষ দিক থেকে ১৯ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক বিদেশি নাগরিক প্রধানত জাহাজযোগে যুক্তরাষ্ট্রে আসে, যে সংখ্যা ১০ লাখের মধ্যে ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী ইমিগ্রান্ট সংখ্যা আমেরিকান ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বলে দাবি করা হয়েছে রিপোর্টে।
২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড়ে ২৪ লাখ করে বিদেশি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে এবং বাইডেন প্রশাসনের সময় আগত ইমিগ্রান্ট সংখ্যা ৮০ লাখ ছাড়িয়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ১৮ ও ১৯ শতকের ইমিগ্রান্ট ও বর্তমানে আগত ইমিগ্রান্টে মধ্যে পার্থক্য হলো, তখন আগত ইমিগ্রান্টরা ছিল ইউরোপীয় দেশগুলোর, বর্তমানে আগ্রত ইমিগ্রান্টরা বলতে গেলে বিশ্বের প্রায় সকল দেশে। ওই সময়ে চেয়ে এখন ইমিগ্রান্ট আগমনও দ্রুততর হয়েছে। ১৮৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রান্ট জনসংখ্যা ছিল ১৪.৮ শতাংশ, ২০২০ সালে ১৩.৬ শতাংশ।
নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে যে, বাইডেন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর এসাইলামসহ অন্যান্য ইমিগ্রেশন আইন শিথিল করার ফলে বিদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সহজ হয়। তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করার অস্থায়ী বৈধতা লাভ করেছে, যারা তাদের এসাইলাম আবেদন নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থান করতে পারবে। কিন্তু আগত বিদেশিদের একটি অংশ আইনি বৈধতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে এবং অনুমোদন ছাড়াই কাজকর্ম করছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টে অবশ্য উল্লেখ করা হয়েছে যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর সরকার পরিচালিত সহিংসতার কারণেও রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের আশায় যুক্তরাষ্ট্রমুখী বিদেশির সংখ্যা পূর্বের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আফগানিস্তান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, হাইতি, ইউক্রেন এবং ভেনিজুয়েলাসহ আরো কিছু দেশে অস্থিরতার কারণে অসংখ্য মানুষ কোনোভাবে নিজ দেশ থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মেক্সিকোর মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের তৎপরতা ও সংঘাতের কারণেও দেশটির অসংখ্য লোক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে। তবে সাম্প্রতিককালে বাইডেন প্রশাসন সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করায় সীমান্ত অতিক্রমকারী বিদেশির সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু বাইডেনের গত বছরগুলোতে তার প্রশাসনের গৃহীত ইমিগ্রেশন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় ছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন স্টেটের ডেমোক্রেটিক এবং রিপাবলিকান উভয় দলের নিয়ন্ত্রণাধীন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সিটি বা স্টেটে ইমিগ্রান্টদের অস্বাভাবিক চাপের বিষয়ে অভিযোগ করেছে। নিউইয়র্ক, শিকাগো, ডেনভার, লস অ্যাঞ্জেলেস, স্যান ফ্রান্সিসকোর মতো সিটির সাধারণ নাগরিকরাও তাদের সিটিতে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি অবনতির জন্য ইমিগ্রান্টদের অধিক উপস্থিতিকে দায়ী করেছে।
বহু সিটিতে ইমিগ্রান্ট সমাগম এত অধিক যে হোমলেস লোকজন পর্যন্ত আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। নিউইয়র্ক সিটিতে গত দুই বছরে আগত ইমিগ্রান্ট সংখ্যা অতীতের যেকোনো রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তাদের আবাসন, খাদ্য, চিকিৎসাসহ অন্যান্য সেবা দিতে গিয়ে সিটি প্রশাসনকে বিভিন্ন খাতের বাজেট কাট করতে হয়েছে। ফলে বহু নাগরিক সুবিধা থেকে সিটিবাসী বঞ্চিত হচ্ছে এবং আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
সীমান্তবর্তী স্টেট টেক্সাসের রাজনীতিতে ইমিগ্রেশন পরিস্থিতি বরাবরই মুখ্য। আট বছর আগে টেক্সাসের দক্ষিাঞ্চলে রিও গ্রান্ডে বরাবর ছয়টি কাউন্টিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ৩০ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু বাইডেনের ইমিগ্রেশন নীতিতে সেই এলাকার ভোটাররা ডেমোক্রেটদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ। ফলে ট্রাম্প এ বছর ছয়টি কাউন্টিতেই বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ ইমিগ্রান্ট উপস্থিতিতে সীমান্তবর্তী প্রতিটি স্টেটের ভোটাররা হতাশা প্রকাশ করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ কিছু রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ সাম্প্রতিক ইমিগ্রান্ট সংখ্যা নিয়ে মিথ্যাচার করে দাবি করেছেন যে ইমিগ্রান্টদের দ্বারা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বেশি। সত্যিকার অর্থে, অভিবাসীরা ঐতিহাসিকভাবে আদিবাসী আমেরিকানদের তুলনায় কম হারে অপরাধ করেছে এবং গত কয়েক বছরে অভিবাসনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় দেশব্যাপী অপরাধ কমে গেছে।
আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভের বার্ষিক আদমশুমারি অনুযায়ী ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আগত ইমিগ্রান্ট সংখ্যা ৯ লাখ দেখানো হলেও কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস, গোল্ডম্যান শাকস এবং অক্সেফোর্ড এর ধারণা যে ওই বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী বিদেশির সংখ্যা ২৪ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। গত নির্বাচনী অভিযানকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তিনি অবৈধ ইমিগ্রান্টদের ঢালাওভাবে ডিপোর্ট করবেন। অনেক আমেরিকান তার এই নীতির পক্ষে। গত অক্টোবরে পরিচালিত নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের যৌথ জরিপে ৫৭ শতাংশ ভোটার অবৈধভাবে দেশে বসবাসকারী ইমিগ্রান্টদের ডিপোর্ট করাকে সমর্থন করেছেন। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে প্রতি বছর গড়ে ৩ লাখ করে অবৈধ ইমিগ্রান্টকে ডিপোর্ট করেছেন। তার আগে ওবামা প্রশাসনের সময় প্রতিবছর গড়ে ৪ লাখ করে অবৈধ ইমিগ্রান্টকে ডিপোর্ট করা হয়েছিল বলে নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট উল্লেখ করা হয়। তবে ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে অবৈধ ইমিগ্রান্টদের ব্যাপারে যে আরো কঠোর হবেন তাতে সন্দেহ নেই। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পরই সীমান্তে ইমিগ্রান্ট প্রবেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
Posted ১:৫৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh