মোহাম্মদ আজাদ : | বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন আদালতগুলোতে প্রায় ৪০ লাখ এসাইলাম আবেদন শুনানি ও নিস্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে আছে। কিন্তু কোনো এসাইলাম আবেদনকারীই জানেন না যে কীভাবে ও কতদিনে তাদের আবেদন নিস্পত্তি হবে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এসাইলাম চেয়ে আবেদন করেছেন ১২৮,২১৪ জন বাংলাদেশি। এর বাইরেও ২০১৪ সালের আগের এসাইলাম আবেদনকারী রয়েছেন।
এছাড়া ২০২৫ সালেও অনেক বাংলাদেশি আবেদন করেছেন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত যেসব বাংলাদেশি আবেদন করেছেন, তাদের মধ্যে অনেকে মূল আবেদনকারী হিসেবে তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আগত পরিবারের অন্যান্য সদস্য; অর্থ্যাৎ স্বামী/স্ত্রী ও ১৮ বছর বয়সের নিচের সন্তানরাও অন্তর্ভূক্ত। সে হিসেবে এসাইলাম আবেদনকারীসহ তিন লক্ষাধিক বাংলাদেশি তাদের বিষয়গুলো নিস্পত্তির অপেক্ষা করছেন।
কোনো বিদেশি নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর এসাইলাম আবেদন করলে প্রথমেই ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আবেদনপত্রে প্রাপ্তি স্বীকার করে প্রত্যেক আবেদনকারীকে একটি নম্বর নম্বর দেন, যেটিকে বলা হয় ‘এলিয়েন নম্বর’। এরপর আবেদনকারী তার আবেদনের প্রাপ্তিস্বীকারপত্রের ১৫০ দিন পর ওয়ার্ক পারমিট বা ‘অ্যামপ্লয়মেন্ট অথরাইজেশন ডকুমেন্ট’র (ইএডি) জন্য আবেদন করতে পারেন। সাধারণত আবেদন করার একমাস পর ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া যায়।
এরপর আবেদনকারী সোস্যাল সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টে সোস্যাল সিকিউরিটি কার্ডের জন্য আবেদন করেন এবং কার্ড পেলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করতে পারেন। এসাইলাম আবেদনকারীরা প্রথমবার ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করলে তাদেরকে কোনো ফি পরিশোধ করতে হয় না। আগে এক বছর পর পর ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন করতে হতো, যা বর্তমানে দুই বছর করা হয়েছে।
২০১২ সালের আগে এসাইলাম আবেদন করার দুই মাসের মধ্যে ইমিগ্রেশন বিভাগের এসাইলাম অফিসে আবেদনকারীদের ইন্টারভিউ হতো। ইমিগ্রেশন অফিসার ইন্টারভিউয়ে সন্তুষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের দুই সপ্তাহের মধ্যে জানিয়ে দিতেন যে তাদের আবেদন অনুমোদিত হয়েছে, অথবা ইমিগ্রেশন আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে এত বিপুল সংখ্যক বিদেশি এসাইলাম আবেদন করতে শুরু করে যে এসাইলাম অফিসগুলো এবং ইমিগ্রেশন আদালতগুলোর পক্ষে এত অধিক সংখ্যক আবেদন নিস্পত্তি করা দু:সাধ্য হয়ে পড়ে এবং প্রতিবছর নতুন করে এসাইলাম আবেদনকারী যুক্ত হওয়ায় এখন কেবলমাত্র আদালতেই স্তুপ হয়ে আছে ৪০ লক্ষাধিক এসাইলাম মামলা।
ফলে অনৈক ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের ইন্টারভিউয়ের অপেক্ষায় থাকার এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কাউকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হলে তাকে একা ও পরিবার থাকলে পরিবারের সদস্যসহ এসাইলাম অফিসে যেতে হয়। তিনি ইংরেজিতে ভালো না হলে ইন্টারপ্রেটার সাথে নিতে পারেন। তার আইনজীবীও সঙ্গে যেতে পারে, কিন্তু ইন্টারভিউয়ের সময় তার কোনো ভূমিকা থাকে না।
এসাইলাম আবেদনকারী তার আবেদনে ও বিস্তারিত বিবৃতিতে তার দেশ ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের কারণ এবং তিনি দেশে ফিরে গেলে তার কী বিপদ হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন, ইমিগ্রেশন অফিসার তার ভিত্তিতে আবেদনকারীকে প্রশ্ন করেন, এবং আবেদনের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি সম্পুরক প্রশ্নও করতে পারেন। তার সন্তুষ্টির ওপর আবেদনকারীর এসাইলাম মঞ্জুর ও নাকচ হতে পারে। নাকচ হলে ইমিগ্রেশন আদালতে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে পড়তে হয় আবেদনকারীকে। এসাইলাম আবেদন মঞ্জুর আদালতকে সন্তুষ্ট করতে পারলে আদালত সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর এসাইলাম অনুমোদনের পক্ষে রায় দেয়, সন্তুষ্ট না হলে আদালত ডিপোর্টেশনের আদেশ দিয়ে থাকে।
এসাইলামের পক্ষে আবেদনকারীর জমা দেওয়া বিভিন্ন ডকুমেন্ট ও তথ্য সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি হলে এবং ইন্টারভিউয়ের সময় আবেদনকারীর বক্তব্য ও আবেদনের বক্তব্যে গরমিল দেখা গেলে আবেদন নাকচ করে আদালতে পাঠানো হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আদালতেও আবেদনগুলো বাতিল হয়ে যায়।
এসাইলাম অফিস থেকে নাকচ হওয়া আবেদন ইমিগ্রেশন আদালতে পাঠানো হলে আবেদনকারীরা ইমিগ্রেশন আইনজীবীর সহায়তা গ্রহণ করেন। ইমিগ্রেশন বিভাগের আইনজীবীও থাকেন এসাইলাম আবেদনকারীকে জেরা করার জন্য, যার মূল চেষ্টা থাকে এসাইলাম অফিসে নাকচ হওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে। তবে বিচারকগণও সরাসরি আবেদনকারীকে প্রশ্ন করেন। ইমিগ্রেশন আদালত থেকেও এসাইলাম মঞ্জুরের পক্ষে রায় দেওয়া হয়। তিনি আবেদনকারী ও তার আইনজীবীর যুক্তিতর্কে সন্তুষ্ট না হলে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার ও ডিপোর্ট করার পদক্ষেপ গ্রহণ করার নির্দেশ দিতে পারেন। তবে ক্ষেত্র বিশেষে আবেদনকারীকৈ রিভিউ আপিল করার সুযোগ দেওয়া হয়। গ্রেফতার এড়াতে আবেদনকারীর আইনজীবী ভলান্টারি ডেপারচার বা স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা জানালে আদালত সে অনুমতিও দিয়ে থাকে। স্বেচ্ছায় চলে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে আসার জন্য ভিসার আবেদন করতে পারেন। কাউকে ডিপোর্ট করা হলে তিনি পরবর্তী দশ বছর কোনো ধরনের ভিসার জন্য আবেদন করার অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হতে পারেন।
এছাড়া ইমিগ্রেশন আদালতে আবেদন নামঞ্জুর হলে আবেদনকারী ৩০ দিনের মধ্যে ‘বোর্ড অফ ইমিগ্রেশন আপিল’ বা ‘বিওআইএ’ বরাবর আপিল করতে পারেন, যেখান থেকে ৬ সিদ্ধান্ত আসতে সাধারণত ৬ থেকে ৯ মাস সময় লাগে। এখানে অনেকের আবেদন মঞ্জুর করাও হয়।
প্রতিবেদকের বন্ধু মোহাম্মদ ফারুক ও বাংলাদেশে বিশিষ্ট সাংবাদিক মরহুম মিনার মাহমুদের এসাইলাম আবেদন ‘বিওআইএ’ থেকে অনুমোদন লাভ করেছিল। কিন্তু ‘বিওআইএ’ যদি আবেদনকারীর আপিল নামঞ্জুর করে সেক্ষেত্রে আবেদনকারী প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের সার্কিট কোর্টে আরো একটি আপিল করতে পারেন। সার্কিট কোর্টেও যদি আবেদন নামঞ্জুর হয়ে যায়, এবং আবেদনকারী আরো চেষ্টা চালাতে চান, তাহলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রিম কোর্টেও যেতে পারেন। জানা যায় যে, দীর্ঘদিন আগে এক ভারতীয় শিখসহ একাধিক এসাইলাম আবেদনকারীর মামলা গ্রহণ করেছিল এবং আবেদনকারীদের মামলা জয়ী হয়েছিল।
Posted ১২:৫০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh