বাংলাদেশ অনলাইন : | শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
রেনি নিকোল গুড। ছবি : বিবিসি
যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপলিসে অভিবাসন বিরোধী অভিযানের সময় নিজের গাড়িতে থাকা অবস্থায় এক মার্কিন অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে এক নারী নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ড মিনেসোটা শহরে ব্যাপক প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই ঘটনার বর্ণনায় দুই ধরনের কথা বলছে। গত বুধবার আসলে কী ঘটেছিল এবং কে ছিলেন এই নারী—তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
মিনিয়াপলিস আইসিই গুলি করার সময় কী ঘটেছিল?
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই বা আইস) একজন ফেডারেল অফিসার গাড়ির ভেতরে থাকা এক নারীকে গুলি করে হত্যা করেছেন।
মেয়র জ্যাকব ফ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার কিছু পরে মিনিয়াপলিস পুলিশ গুলির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি, ওই নারী ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন বিরোধী কড়াকড়ির বিরুদ্ধে চলা বিক্ষোভে ‘লিগ্যাল অবজারভার’ বা আইনি পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করছিলেন।
সাধারণত স্বেচ্ছাসেবকরা এই পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করেন। তারা বিক্ষোভের সময় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং কোনো আইনি লঙ্ঘন বা সংঘাত হলে তা নথিবদ্ধ করেন।
ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের খবর অনুযায়ী, অভিবাসন কর্মীদের স্বেচ্ছাসেবক দলগুলো নিজেদের এলাকায় ছদ্মবেশী আইসিই এজেন্ট বা গাড়ি আছে কি না তা পাহারা দেয় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবেশীদের সতর্ক করে দেয়।
মিনিয়াপলিস সিটি কাউন্সিলের সদস্য জেসন শ্যাভেজ স্থানীয় মিডিয়াকে বলেন, “আমাদের সম্প্রদায়ের অনেক লোক এখন মাঠে কাজ করছে। তারা আইসিই এজেন্টদের ওপর নজর রাখে, পরিবারগুলোকে ভাড়া বা খাবারের সাহায্য করে এবং আমাদের এলাকাগুলোকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করে যাতে অভিবাসন কর্মকর্তারা পরিবারগুলোকে আলাদা করতে না পারে।”
বুধবারের ঘটনার ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন মাস্ক পরা আইসিই এজেন্ট একটি এসইউভি গাড়ির দিকে লক্ষ্য করে তিনবার গুলি করছেন। এরপর গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পার্ক করে রাখা অন্য গাড়িগুলোর ওপর আছড়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তোলা বিভিন্ন ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে আতঙ্কিত মানুষদের চিৎকার করে এজেন্টকে গালি দিতে এবং গুলি থামাতে বলতে শোনা যায়। কিছু ছবিতে গাড়ির ভেতরে ওই নারীর রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। মেয়র ফ্রে জানান, তাকে হেনি পিন কাউন্টি মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হলে তিনি মারা যান।
কে ছিলেন রেনি নিকোল গুড?
মিনিয়াপলিস সিটি কাউন্সিল নিহতের পরিচয় শনাক্ত করেছে। তিনি ৩৭ বছর বয়সী রেনি নিকোল গুড।
কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট এলিয়ট পেইন এবং অন্য সদস্যরা এক যৌথ বিবৃতিতে লিখেছেন, “রেনি আমাদের শহরেরই বাসিন্দা ছিলেন। আজ (বুধবার) সকালে তিনি প্রতিবেশীদের সাহায্য করতে বেরিয়েছিলেন এবং ফেডারেল সরকারের হাতে প্রাণ হারালেন। আমাদের শহরে যে কাউকেই হত্যা করুক না কেন, তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া উচিত।” বিবৃতিতে তারা আইসিইকে মিনিয়াপলিস ছেড়ে চলে যেতে বলেন।
রেনির মা ডোনা গ্যাঞ্জার জানান, রেনি তার নিজের বাড়ির থেকে কয়েক ব্লক দূরেই মারা গেছেন। তিনি বলেন, “সে হয়তো খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল।” রেনির মা অবশ্য দাবি করেছেন যে তার মেয়ে কোনো বিক্ষোভের অংশ ছিলেন না। তিনি বলেন, “আমার মেয়ে খুব দয়ালু ছিল। সে সারাজীবন মানুষকে সাহায্য করেছে। সে ছিল এক অসাধারণ মানুষ।”
রেনির শ্বশুর জানিয়েছেন, রেনির ছয় বছর বয়সী একটি সন্তান আছে। রেনির স্বামী টিমি রে ম্যাকলিন ২০২৩ সালে ৩৬ বছর বয়সে মারা যান। খবরে বলা হয়েছে, রেনির আরও দুটি সন্তান আছে।
রেনি ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটিতে ক্রিয়েটিভ রাইটিং নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ইংরেজী বিভাগের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতিতে তাকে ‘রেনি ম্যাকলিন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে তিনি কলোরাডো স্প্রিংসের বাসিন্দা ছিলেন এবং স্বামীর সঙ্গে পডকাস্ট করতেন। লেখালেখির বাইরে তিনি মুভি, ম্যারাথন আর ঘর সাজাতে পছন্দ করতেন।
রেনি নিকোল গুড, যিনি রেনি নিকোল ম্যাকার্লিন নামেও পরিচিত—ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান কবি। তিনি মূলত তার পুরস্কারজয়ী কবিতা “অন লার্নিং টু ডিসেক্ট ফেটাল পিগস” (On Learning to Dissect Fetal Pigs) এর জন্য ২০২০ সালে ‘অ্যাকাডেমি অফ আমেরিকান পোয়েটস প্রাইজ’ পেয়েছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ট্রাম্প কী বলেছেন?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, “গাড়ি চালানো ওই নারীটি খুব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিলেন, কাজে বাধা দিচ্ছিলেন এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। এরপর তিনি হিংস্রভাবে আইসিই অফিসারের ওপর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। অফিসার আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, এই ধরনের ঘটনা ঘটছে কারণ “কট্টর বামপন্থীরা প্রতিদিন আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আইসিই এজেন্টদের হুমকি দিচ্ছে ও আক্রমণ করছে।”
তবে ভিডিও ফুটেজ দেখে এটা পরিষ্কার নয় যে রেনি সত্যি ওই অফিসারের ওপর গাড়ি তুলে দিতে চেয়েছিলেন কি না। ফুটেজে দেখা যায় গাড়িটি একবার পেছনে গিয়ে আবার সামনে এগোচ্ছিল। গাড়িটি যখন সামনে আগায়, তখন একজন এজেন্টকে সামনে ঝাঁপ দিতে দেখা যায়। তবে সেটি কি গাড়ির ভয়ে নাকি অন্য কারণে, তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা কী বলছেন?
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) বিভাগের সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “যেকোনো মৃত্যু ট্র্যাজেডি, কিন্তু রেনি সারাদিন আইসিইর কাজে বাধা দিচ্ছিলেন।” তিনি বলেন, “রেনি তার গাড়িটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন।”
উল্লেখ্য, ডিএইচএস বর্তমানে আইসিই পরিচালনা করে এবং গত গ্রীষ্মে তারা আরও ১০ হাজার নতুন এজেন্ট নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ডিএইচএস জানিয়েছে, ওই এজেন্ট প্রাণভয়ে এবং জননিরাপত্তার খাতিরে ‘আত্মরক্ষামূলক গুলি’ চালিয়েছেন। তারা এই ঘটনাকে ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স লিখেছেন, “আমি চাই প্রত্যেক আইসিই এজেন্ট জানুক যে তাদের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পুরো প্রশাসন তাদের পাশে আছে। যারা তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, শুনে রাখুন, আমরা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও কঠোর হবো।”
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
মিনেসোটার কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনের এই ব্যাখ্যার ঘোর বিরোধী। ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর টিম ওয়ালজ ডিএইচএসের পোস্ট শেয়ার করে লিখেছেন, “আমি ভিডিওটা দেখেছি। এই প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার বিশ্বাস করবেন না। রাষ্ট্র এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।”
মেয়র জ্যাকব ফ্রে আইসিইর ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছেন, “আইসিই—মিনিয়াপলিস থেকে বের হয়ে যাও। তোমাদের আমরা এখানে চাই না। তোমরা নিরাপত্তার কথা বলছ, কিন্তু তোমরা করছ ঠিক তার উল্টো।”
তিনি আরও বলেন, “মানুষ আহত হচ্ছে, পরিবার বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, আমাদের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা মানুষদের আতঙ্কিত করা হচ্ছে এবং এখন একজন মানুষ মারা গেল। এর দায় তোমাদের। দয়া করে আর ক্ষয়ক্ষতি না করে চলে যাও।”
মিনিয়াপলিসে এই অভিযানের পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি কী?
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প প্রশাসন মিনিয়াপলিসে তাদের অভিবাসন অভিযান আরও জোরদার করেছে। এক্সে দেওয়া পোস্টে আইসিই ঘোষণা করেছে, তারা এই শহরে আরও ২,০০০ এজেন্ট মোতায়েন করবে। তারা একে ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’ বলছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো অপরাধী ও অবৈধ অভিবাসীদের খুঁজে বের করা।
আইসিইর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক টড লিয়নস বলেন, তারা মিনিয়াপলিসে জালিয়াতি রুখতে এবং অপরাধী বিদেশিদের সরাতে এসেছেন। মিনেসোটার জনসংখ্যা ৫০ লাখের বেশি, যেখানে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ।
রিপাবলিকানরা বিশেষ করে মিনেসোটার সোমালি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের টার্গেট করে নানা মন্তব্য করছেন। গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন মিনেসোটার শিশুদের যত্নের জন্য দেওয়া সরকারি অর্থ স্থগিত করেছে। তাদের দাবি, সোমালি-আমেরিকানদের পরিচালিত ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে বড় ধরনের জালিয়াতি হয়েছে।
ট্রাম্পের অধীনে আর কোথায় কোথায় আইসিই অভিযান হয়েছে?
সেপ্টেম্বর মাসে শিকাগোতে ‘অপারেশন মিডওয়ে ব্লিৎজ’ শুরু হয়। গত মাসে কলম্বাস ও ওহাইওতেও অভিযান হয়েছে, যেখানে অনেক সোমালি লোক বাস করেন। এছাড়া নিউ অরলিন্স ও নর্থ ক্যারোলাইনাতেও অভিযান চলছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে আটলান্টা, বোস্টন, ডেনভার, মিয়ামি, নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া ও ওয়াশিংটন ডিসিসহ আরও অনেক শহরে এই ধরনের অভিযান নিয়মিত চলছে।
Posted ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh