জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
আল্লাহর দিকে ফিরে এলে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগত সমৃদ্ধশালী হয়। অনেকের ধারণা, যারা আল্ল্হা ভীতি, সততা, সাধুতা ও দায়িত্বনুভূতির পথ অবলম্বন করে তারা আখিরাতের জীবন লাভ হলেও হতে পারে কিন্তু দুনিয়ার জীবন একেবারেই বরবাদ হয়ে যায়। সত্যিকার অর্থে এ মন্ত্র কেবল শয়তান দুনিয়ার মোহে মুগ্ধ অজ্ঞ-নির্বোধের কানে ফুঁকে দেয়। এ সংগে তাকে এ প্ররোচনাও দেয় যে, এ ধরনের আল্লাহভীরু ও সৎলোকদের জীবনে দারিদ্র, অভাব ও অনাহার ছাড়া আর কিছুই নেই। আল্লাহ তা’আলা এ ধারনার প্রতিবাদ করে বলেন,“ তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও এবং তাঁ দিকে ফিরে এসো, তাহলে তিনি একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তোমাদের উত্তম জীবন সামগ্রী দেবেন এবং অনুগ্রহ লাভের যোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অনুগ্রহ দান করবেন। তবে যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে আমি তোমাদের ব্যাপারে একটি অতীব ভয়াবহ দিনের আযাবের ভয় করছি।”( সুরা হুদ:৩)
অর্থাৎ এ সঠিক পথ অবলম্বন করলে তোমাদের শুধুমাত্র আখেরাতেই নয়, দুনিয়াও সমৃদ্ধ হবে। আখিরাতের মতো এ দুনিয়ায় যথার্থ মর্যাদা ও সাফল্যও এমনসব লোকের জন্য নির্ধারিত যারা আল্লাহর প্রতি যথার্থ আনুগত্য সহকারে সৎ জীবন যাপন করে, যারা পবিত্র ও ত্রুটিমুক্ত চরিত্রের অধিকারী হয়, যাদের ব্যবহারিক জীবনে ও লেনদেনে কোন ক্লেদ ও গ্লানি নেই যাদের ওপর প্রত্যেকটি বিষয়ে ভরসা কার যেতে পারে, যাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি কল্যাণের আশা পোষণ করে এবং কোন ব্যক্তি বা জাতি যাদের থেকে অকল্যাণের আশংকা করে না।
আল কুরআনের দৃষ্টিতে দুনিয়ার জীবন সামগ্রী দু প্রকারের। এক প্রকারের জীবন সামগ্রী আল্লাহ বিমুখ লোকদেরকে ফিতনার মধ্যে নিক্ষেপ করার জন্য দেয়া হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে তারা নিজেদেরকে দুনিয়া পূজা ও আল্লাহ বিস্মৃতির মধ্যে আরো বেশী করে হারিয়ে যায়। আপাত দৃষ্টিতে এটি নিয়ামত ঠিকই কিন্তু গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলে দেখা যাবে এটি আল্লাহর লানত ও আযাবের পটভুমিই রচনা করে। আল কুরআনে এটি প্রতারণার সামগ্রি নামেও একে উল্লেখ করে। আর দ্বিতীয় প্রকারের সামগ্রী মানুষকে আরো বেশী সচ্ছল,সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তাকে তার আল্লাহর আরো কৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত করে। এভাবে সে আল্লাহর, তাঁর বান্দাদের এবং নিজের অধিকার আরো বেশী করে আদায় করতে সক্ষম হয়। আল্লাহর দেয়া উপকরণাদির সাহায্যে শক্তি সঞ্চয় করে সে দুনিয়ায় ভালো, ন্যায় ও কল্যাণের উন্নয়ন এবং মন্দ, বিপর্যয় ও অকল্যাণের পথ রোধ করার জন্য এর বেশী প্রভাবশালী ও কার্যকর প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এ হচ্ছে কুরআনের পরিভাষায় উত্তম জীবন সামগ্রী। অর্থাৎ এমন উন্নত পর্যায়ের জীবন সামগ্রী যা নিছক দুনিয়ার আয়েশ আরামের মধ্যে খতম হয়ে যায় না বরং পরিণামে আখিরাতেরও শান্তির উপকরণে পরিণত হয়।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“পুরুষ বা নারী যে-ই সৎকাজ করবে, সে যদি মু’মিন হয়, তাহলে তাকে আমি দুনিয়ায় পবিত্র পরিচ্ছন্ন জীবন দান করবো এবং (আখিরাতে) তাদের প্রতিদান দিবো তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুসারে।”(সুরা আন নাহল:৯৭) এ আয়াতেও মু’মিন ও কাফের উভয় দলের এমন সব সংকীর্ণচেতা ও বেখবর লোকদের ভুল ধারণা দূর করা হয়েছে, যারা মনে করে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততা ও পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতার পথ অবলম্বন করলে মানুষের পরকালে সাফল্য অর্জিত হলেও তার পার্থিব জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের জবাবে আল্লাহ বলছেন, তোমাদের এ ধারণা ভুল। এ সঠিক পথ অবলম্বন করলে শুধু পরকালীন জীবনই সুগঠিত হয় না, দুনিয়াবী জীবনও সুখী সমৃদ্ধশালী হয়। যারা প্রকৃতপক্ষে ঈমানদার, পবিত্র-পরিচ্ছন্ন এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত ও সৎ তাদের তাদের পার্থিব জীবন ও বেঈমান ও অসৎকর্মশীল লোকদের তুলনায় সুষ্পষ্টভাবে ভালো ও উন্নত হয়। নিজেদের নিস্কুলংক চরিত্রের কারণে তারা যে প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা লাভ করে তা অন্যরা লাভ করতে পারে না। যে সব পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও উত্তম সাফল্য তারা লাভ করে থাকেন তাও অন্যেরা লাভ করতে পারে না। কারণ অন্যদের প্রতিটি সাফল্য হয় নোংরা ও ঘৃণিত পদ্ধতি অবলম্বনের ফসল। সৎ লোকেরা ছেঁড়া কাঁথায় শয়ন করেও যে মানসিক প্রশান্তি ও চিন্তার স্থৈর্য লাভ করেন তার সামান্যতম অংশও প্রাসাদবাসী বেঈমান দুস্কৃতিকারী লাভ করতে পারে না।
উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এই যে, “তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও এবং তাঁ দিকে ফিরে এসো, তাহলে তিনি একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তোমাদের উত্তম জীবন সামগ্রী দেবেন এবং অনুগ্রহ লাভের যোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অনুগ্রহ দান করবেন।” অর্থাৎ দুনিয়ায় তোমাদের অবস্থান করার জন্য যে সময় নির্ধারিত রয়েছে সে সময় পর্যন্ত তিনি তোমাদের খারাপভাবে নয় ভালোভাবেই রাখবেন। তাঁর নিয়ামতসমূহ তোমাদের ওপর বর্ষিত হবে। তাঁর বরকত ও প্রাচুর্যলাভে তোমরা ধন্য হবে। তোমরা সচ্ছল ও সুখী -সমৃদ্ধ থাকবে। তোমাদের জীবন শান্তিময় ও নিরাপদ হবে। তোমরা লাঞ্ছনাম হীনতা ও দীনতার সাথে নয় বরং সম্মান ও মর্যাদার সাথে জীবন যাপন করবে।
যে ব্যক্তি চরিত্রগুণে ও নেক আমলে যত বেশী এগিয়ে যাবে আল্লাহ তাকে ততই বড় মর্যাদা দান করবেন। আল্লাহর দরবারে কারোর কৃতিত্ব ও সৎকাজকে নষ্ট করা হয় না। তাঁর কাছে যেমন অসৎকাজ ও অসৎবৃত্তির কোন মর্যাদা নেই তেমনি সৎকাজ ও সৎবৃত্তিরও কোন অমর্যাদা হয় না। এটি মহান আল্লাহর রাজ্যের রীতি নয়। যে ব্যক্তিই নিজের চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেকে যেরূপ মর্যাদার অধিকারী প্রমাণ করবে তাকে আল্লাহ সে মর্যাদা অবশ্যই দেবেন। তাদের মর্যাদা তাদের সর্বোত্তম কর্মের প্রেক্ষিতে নির্ধারিত হবে। অন্য কথায় যে ব্যক্তি দুনিয়ায় ছোট বড় সব রকমের সৎ কাজ করে থাকবে তাকে তার সবচেয়ে বড় সৎকাজের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চতর মর্যাদা দান করা হবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “জনপদের লোকেরা যদি ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকততেরসমূহের দুয়ার খুলে দিতাম।”(সুরা আরাফ:৯৬) আসমান ও যমীনের সমস্ত বরকত খুলে বলতে সব রকম কল্যাণ সবদিক থেকে খুলে দেয়া। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হত, আর যমীন থেকে যে কোন বস্তু তাদের মনমত উৎপাদিত হতো এবং সেসব বস্তু দ্বারা তাদের লাভবান হওয়া এবং সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করে দেয়া হতো। তাতে তাদেরকে এমন কোন চিন্তা-ভাবনা কিংবা টানাপোড়নের সম্মুখীন হতে হত না
দুনিয়ায় বরকতের বিকাশ ঘটে বিভিন্নভাবে। কখনো মূল বস্তুটি প্রকৃতভাবেই বেড়ে যায়। কখনো মুলবস্তুটি ব্যতিরেখে এমন মূল্যবান জিনিস তাকে দেয়া হয়, যা তার অত্যন্ত কাঙিত এবং সেটি কখনো সে চায়নি। কখনো বর্তমান সম্পদ বিভিন্ন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে বরকত দেয়া হয়। সে সময় সে অল্প টাকা দিয়ে যেই কাজ সম্পাদন করতে পারে অন্যজন তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী সম্পদ দিয়েও তা সম্পাদন করতে পারে না। এই জন্য আল্লাহর রাসুল দু’আ করতেন,“আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফিমা আতাইতা” অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে যা দিয়েছো তাতে বরকত দান করো। মনে করুন, আপনারা দু’জন ঘর থেকে বের হলেন, দরজার কাছে দু’জনই পায়ে আঘাত পেলেন। এবং দু’জনই ডাক্তারী পরীক্ষা করে দেখলেন, একজন সামান্য আঘাত পেয়েছে এবং প্রাথমিক চিকিৎসায় সেরে উঠলেন। অন্যজন মারাত্মক আঘাত পেয়ে অপারেশন করে দীর্ঘদিন পরে সেরে উঠলেন। একজনের মাত্র কয়েক টাকা খরচ হলো, অন্যজনের লক্ষ লক্ষ টাকা ও সময় খরচ হয়ে গেলো। এগুলোই হলো, বরকতের বিভিন্ন ধরণ।
তবে তাদেরকে রকমারী দুর্যোগ, দুর্বিপাক ও বিপদের মুখেও ঠেলে দেয়া হয় এবং দুভিক্ষ, মহামারী, বাণিজ্যিক ক্ষয়ক্ষতি, সামরিক পরাজয় ও এ ধরনের আরো নানান দুর্ভোগচাপিয়ে দেয়া হয় যাতে তাদের মন নরম হয়, অহংকার ও ঔদ্ধত্যের দৃপ্ত গ্রীবা নত হয়, শক্তিমত্ততা ও ধনলিপ্সা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। নিজের উপায়-উপকরণ,শক্তি ও যোগ্যতার ওপর নির্ভরতা ভেংগে পড়ে এবং তারা যাতে অনুভব করতে পাওে যে ওপরে অন্য কোন শক্তিধর সত্তা আছে এবং হাঁরই হাতে রয়েছে তাদের ভাগ্যের লাগাম। এভাবে উপদেশের বাণী শোনার জন্যে তাদের কান খুলে যাবে এবং নিজেদের প্রভু পরওয়ারদিগারের সামনে সবিনয়ে শির আনত করার জন্যে তারা প্রস্তুত হয়ে যাবে। এজন্য একটি হাদীস থেকে জানা যায় যে,“বিপদ-মুসিবত তো মু’মিনকে পর্যায়ক্রমে সংশোধন করতে থাকে, অবশেষে যখন সে এ চুল্লী থেকে বের হয়, তখন তার সমস্ত ভেজাল ও খাদ পুড়ে সে পরিচ্ছন্ন ও খাটি হয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু মুনাফিকের অবস্থা হয় ঠিক গাধার মতো। সে কিছুই বোঝে না, তার মালিক কেন তাকে বেঁধে রেখেছিল, আবার কেনই বা তাকে ছেড়ে দিল।”
Posted ১:০৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh