জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪
ইসলামের একটি আয়না আছে, সে আয়নায় প্রতিদিন প্রতিক্ষণ নিজের চরিতের দাগ, ময়লা ও মেসতা দেখা যায়। কেউ কি তা দেখেন? যারা নিয়মিত চরিতের সৌন্দর্যচর্চা করেন তারা নিয়মিত সে আয়নাটি দেখে থাকেন, ফলে তিনি সেই আয়না ও নিজের চরিতের প্রতি যত্নবান হন। দৈনিক আয়নাটিকে মুছে যেমন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখেন তেমনি সে আয়নায় ভেসে উঠা নিজের চরিতে দৃশ্যমান দাগ, ময়লা ও মেছতা পরিস্কারেও অত্যন্ত যত্নবান হোন। সেই আয়নার নাম ইসলাম।
যা বাঁধাই করা হয়েছে আল কুরআন ও রাসুলুল্লাহ সা: এর সুন্নাহ দিয়ে। যিনি সে আয়নার আলোকে নিজের চরিত্রকে ময়লামুক্ত রাখেন, তার নাম হলো, মুসলিম। যারা আত্মপ্রবঞ্চিত তারা সে আয়নায় ভেসে আসা নিজের ত্রুটিগুলো দেখতে পায় না। শয়তান তার ত্রুটিগুলোকে সুশোভিত আকারে প্রদর্শিত করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“প্রত্যেক মানুষের ভালমন্দ কাজের নিদর্শন আমি তার গলায় ঝুলিয়ে রেখেছি এবং কিয়ামতের দিন তার জন্য বের করবো একটি লিখন, যাকে সে খোলা কিতাবের আকারে পাবে।
পড়ো, নিজের আমলনামা, আজ নিজের হিসেব করার জন্য তুমি নিজেই যতেষ্ট।”(সুরা বনী ইসরাঈল:১৩-১৪) প্রত্যেক মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য এবং তার পরিণতির ভাল ও মন্দের কর্মধারা এবং তার আপন সত্তার মধ্যে বিরাজিত রয়েছে। নিজের গুণাবলী, চরিত্র ও কর্মধারা এবং বাছাই ও নির্বাচন করার এবং সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে সে নিজেই নিজেকে সৌভাগ্যের অধিকারী করে আবার দুর্ভাগ্যের অধিকারী করে। তার আয়নায় যদি সে তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারে।
কিন্তু নির্বোধ ও গাফেল বা উদাসীন লোকেরা নিজেদের ভাগ্যের ভাল মন্দের চিহ্নগুলো তার আয়নায় না খোঁজে বাইরে খোঁজে বেড়ায় এবং তারা সব সময় বাইরের কার্যকারণকেই নিজেদের দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী করে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে, তাদের ভাল-মন্দের পরোয়ানা তাদের নিজেদের গলায়ই লটকানো থাকে।
আত্মচরিতের আয়নায় ও নিজেদের কার্যক্রমের প্রতি নজর দিলে তারা পরিস্কার দেখতে পাবে যে, কোন জিনিসটি তাদেরকে বিকৃতি ও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে দিয়েছে এবংং শেষ পর্যন্ত তাদের সর্বশ্রান্ত করে ছেড়েছে, তা ছিল তাদের নিজেদেরই অসৎ গুণাবলী ও অশুভ সিদ্ধান্ত। বাইর থেকে কোন জিনিস এসে জোর পুর্ব্ক তাদের ওপর চেপে বসেনি। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“যে ব্যক্তিই সৎপথ অবলম্বন করে, তার সৎপথ অবলম্বন তার নিজের জন্যই কল্যাণকর হয়। আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হয়, তার পথভ্রষ্টতার ধ্বংসকারিতা তার ওপরই বর্তায়। কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না। আর আমি (হক ও বাতিলের পার্থক্য বুঝাবার জন্য) একজন পয়গম্বর না পাঠিয়ে দেয়া পর্যন্ত কাউকে আযাব দেই না।”(সুরা:বনী ইসরাঈল:১৫)
সৎ ও সত্য-সঠিক পথ গ্রহণ করে সে মুলত: আল্লাহ, রাসুল ও সংশোধন প্রচেষ্টা পরিচালনারারীদের প্রতি কোন অনুগ্রহ করে না বরং সে তার নিজেরই কল্যাণ করে। অনুরূপভাবে ভুল পথ অবলম্বন অথবা তার ওপড় থেকে কোন ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করে না বরং সে তার নিজের ক্ষতি করে।
আল্লাহর রাসুল সা: ও সত্যের আহবায়কগণ মানুষকে ভুল পথ থেকে বাঁচাবার এবং সঠিক পথ দেখাবার জন্য যে প্রচেষ্টা চালান তা নিজের কোন স্বার্থে নয় বরং মানবতার কল্যাণার্থেই চালান। বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাজ হচ্ছে, যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে যখন তার সামনে সত্যের সত্য হওয়া ও মিথ্যার মিথ্যা হওয়া সুস্পষ্ট করে দেয়া হয় তখন সে স্বার্থন্ধতা ও অন্ধ আত্মপ্রীতি পরিহার করে সোজা মিথ্যা থেকে সরে দাাঁড়বে এবং সত্যকে মেনে নেবে। অন্ধ আত্মপ্রীতি, হিংসা ও স্বার্থন্ধতার আশ্রয় নিলে সে নিজেই অশুভাকাংখী হবে।
প্রত্যেক ব্যক্তির একটি স্বতন্ত্র নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। নিজের ব্যক্তিগত পর্যায়ে আল্লাহর সামনে এ জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এ ব্যক্তিগত দায়িত্বের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি তার সাথে শরীক নেই। দুনিয়ায় যতই বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিবর্গ, বিপুল সংখ্যক জাতি, গোত্র ও বংশ একটি কাজে বা একটি কর্মপদ্ধতি শরীক হোক না কেন, আল্লাহর শেষ আদালতে তাদের এ সমন্বিত কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত দায়িত্ব আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হবে এবং তার যা কিছু শাস্তি বা পুরস্কার সে লাভ করবে তা হবে তার সেই কর্মের প্রতিদান, যা করার জন্য সে নিজে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দায়ী বলে প্রমাণিত হবে।
এ ইনসাফের তুলাদণ্ডে অন্যের অসৎকর্মের বোঝা একজনের ওপর এবং তার পাপের ভার অন্যেও ওপর চাপিয়ে দেবার কোন সম্ভবনাই থাকবে না। তাই একজন জ্ঞানী ব্যক্তির অন্যেরা কি করছে তা দেখা উচিত নয়। বরং তিনি নিজে কি করছেন সেদিকেই তার সর্বক্ষণ দৃষ্টি থাকা উচিত। যদি তার মধ্যে নিজের ব্যক্তিগত দায়িত্বেও সঠিক অনুভূতি থাকে, তাহলে অন্যেরা যাই করুক না কেন সে নিজে সাফল্যের সাথে আল্লাহর সামনে যে কর্মধারার জবাবদিহি করতে পারবে তার ওপরই অবিচল থাকবে।
আখিরাত প্রত্যাশীরা যে দুনিয়া পূজারীদের অধিকারী ওপর শ্রেষ্টত্বের অধিকারী দুনিয়াতেই এ পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ পার্থক্য এ দৃষ্টিতে নয় যে, এদের খাবার-দাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ, গাড়ি-বাড়ী ও সভ্যতা-সংস্কৃতির ঠাঁটবাট ও জৌলুস ওদের চেয়ে বেশী। বরং পার্থক্যটা এখানে যে, এরা যা কিছু পায় সততা, বিশ্বস্ততা ও ঈমানদারীর সাথে পায় আর ওরা যা কিছু লাভ করে জুলুম, নিপীড়ন,ধোঁকা, বেঈমানী এবং নানান হারাম পথ অবলম্বনের কারণে লাভ করে। তার ওপর আবার এরা যা কিছু পায় ভারসাম্যের সাথে খরচ হয়। এ থেকে হকদারদের হক আদায় হয়। এ থেকে বঞ্চিত ও প্রার্থীদের অংশও দেয়া হয়। আবার এ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে অন্যান্য সৎ কাজেও অর্থ ব্যয় করা হয়।
পক্ষান্তরে দুনিয়া পূজারীরা যা কিছু পায় তা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বিলাসীতা, বিভিন্ন হারাম এবং নানান ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কাজে দু’হাতে ব্যয় করা হয়ে থাকে।
এভাবে সব দিক দিয়েই আখিরাত প্রত্যাশীদের জীবন আল্লাহভীতি ও পরিচ্ছন্ন নৈতিকতার এমন আদর্শ হয়ে থাকে যা তালি দেয়া কাপড়ে এবং ঘাস ও খড়ের তৈরী কুঁড়ে ঘরেও এমনই ঔজ্জল্য বিকীরণ করে, যার ফলে এর মোকাবেলায় প্রত্যেক চক্ষুষ্মানের দৃষ্টিতে দুনিয়া পূজারীদের জীবন অন্ধকার মনে হয়। এ কারণেই বড় বড় পরাক্রমশালী বাদশাহ ও ধনাঢ্য আমীরদের জন্যও তাদের সমগোত্রীয় জনগণের হৃদয়ে কখনো নিখাদ ও সাচ্চা মর্যাদাবোধ এবং ভালোবাসা ও ভক্তির ভাব জাগেনি। অথচ এর বিপরীতে ভক্ত, অনাহারী ছিন্ন বস্ত্রধারী, খেজুর পাতার তৈরী কুঁড়ে ঘরের অধিবাসী আল্লাহ ভীরু মর্দে মূ’মিনের শ্রেষ্টত্ব মেনে নিতে দুনিয়া পূজারীরা নিজেরাই বাধ্য হয়েছে। আখিরাতের চিরস্থায়ী সাফল্য এ দু’দলের মধ্যে কার ভাগে আসবে এ সুস্পষ্ট আলামতগুলো সেই সত্যটির প্রতি পরিস্কার ইংগিত করছে।
আত্মচরিতের আয়নাকে পরিস্কার রাখার জন্য নীচের বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে। প্রথমত: বেশী বেশী কুরআন ও হাদীস অধ্যায়ন করতে হবে এবং এই অধ্যায়ন বুঝে অর্খ অনুধাবন করে পড়তে হবে। আল্লাহর রহমত, বরকত ও আত্মার আনন্দের জন্য মানুষের প্রতি কল্যাণ ও উপকারের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। হৃদয়কে বিদ্বেষ, হিংসা ও অন্যের অকল্যাণ কামনা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। ধৈর্য ধারণ করতে হবে। ধৈর্য মু’মিন চরিতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও ঈমানের অন্যতম অংশ। আল্লাহর রহমত থেকে নৈরাশ্য যাবে না।
হতাশা ও উৎকন্ঠা পরিত্যাগ করে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দিতে হবে। আল্লাহ আমাদের জীবনে অগণিত নিয়ামত রয়েছে। তাই সদা তাঁর কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। সচ্ছলতা অসচ্ছলতা, সম্মান ও অসম্মান সর্বাবস্থায় স্থিতিশীল থাকতে হবে। মানুষের সাথে সুন্দর ও উত্তম আচরণ করতে হবে। এটি প্রকৃত মুসলিমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সকলের সাথে উত্তম ও শোভনীয় আচরণ করা আল্লাহর প্রিয় ইবাদাতসমূহের অন্যতম। কিয়ামতের দিন কর্মবিচারের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী ও মূল্যবান কর্ম হবে সুন্দর আচরণ। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সা: ভালবাসতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সা: কে অন্য সকল কিছু এবং নিজের জীবনের চেয়েও বেশী ভালবাসা।
আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ক্রমাগত জীবনের শেষ নি:ম্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত ভালবাসা ঈমানের অঙ্গ। এই ভালবাসা দ্বারা আত্মার খোরাক সৃষ্টি হয়, আত্মা সর্বদা পুষ্ট ও সতেজ থাকে। জেনে বুঝে মনের আবেগ মিশিয়ে সকাল-সন্ধা ছাড়াও সার্বক্ষণিক আল্লাহর যিক্র তথা আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে। এটি আত্মার বিশাল খাদ্যভাণ্ডার। আত্মা সুস্থ ও সবল রাখার জন্য রাসুলুল্লাহ সা: সুন্নাহ মোতাবেক নিজেকে আল্লাহর যিকরে রত রাখতে হবে।
Posted ১:২২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh