জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০২৪
ইসলাম সাম্য-সম্প্রীতির এক জীবন ব্যবস্থার নাম। ইসলামের নবী ছিলেন মানবতার নবী, বঞ্চিত মানবতার নবী, সাম্য ও সম্প্রীতির নবী। তিনি যেই সমাজে আগমন করেছিলেন সেটি ছিল বৈষম্যমূলক একটি সমাজ। ইসলামে আলোকে তিনি একটি বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। যে সমাজ ব্যবস্থায় কারো শ্রেষ্টত্ব নিরূপিত হতো “তাকওয়া” এর ভিত্তিতে। যে যত বেশী আল্লাহকে ভয় করতো সে তত বেশী মর্যাদাবান হিসাবে সমাজে পরিচিত হতো। আল কুরআন একটি বৈষম্যবিরোধী শ্লোগানের নাম। এর ছত্রে ছত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আগুনঝরা বক্তব্য রয়েছে। এই কুরআন দিয়েই নবী সা: বৈষম্যের পাহাড় ভেঙ্গে একটি সাম্য-সম্প্রীতির সমাজ কায়েম করেছিলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিশনের প্রথম যারা সাথী হওয়ার সুভাগ্য অর্জন করেছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই সমাজের দূর্বল শ্রেনীর অর্ন্তভূক্ত ছিলেন। অবশ্য যুগে যুগে সমাজের নির্যাযিত দুর্বলেরাই সর্বপ্রথম আল্লাহর নবীদের ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছেন। এর একটি যৌক্তিক কারন ছিল এই যে, ইসলাম ছাড়া অন্য কোন পথ বা মত মানবতার মুক্তির গ্যারান্টি দিতে পারেনি। বরং বিভিন্ন মত ও পথের পদতলে এ শ্রেনীর দুর্বল, অসহায় ও অধীনস্ত অবহেলিতরা সব সময় বঞ্চিত, নির্যাতিত-নিষ্পেষিত ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। তাই এ শ্রেনীর লোকেরা সর্বপ্রথম ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে তাদের অধিকার ফিরে পেতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন এদের একান্ত প্রিয় ও কাছের ব্যক্তিত্ব। কবি বলেন,
নগন্য দূর্বল যারা এতদিন ছিল ধরনীতে
তারা আজ বাহিরিল দ্বিগ্বিজয়ে অকুণ্ঠিত চিত্তে।
কত দেশ, কত জাতি, কত রাজ্য, স্বর্ণ সিংহাসন
লুটাল তাদের পায়ে কেঁপে গেল নিখিল ভূবণ।
ইসলাম কোন প্রকার শ্রেনী-বৈষম্যের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। বরং ইসলাম মানুষের মাঝে বৈষম্য দূর করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারণা পেশ করে। ইসলামের আনুষ্ঠানিক ইবাদাতগুলোর প্রতি গভীর মনোনিবেশ করলে লক্ষ করা যায় যে,ইসলামের একেকটি ইবাদাত বৈষম্যমূলক সমাজকে ভেঙ্গে কিভাবে একটি ভেদভেদাহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যায়।
যেমন:
সালাত: প্রতিদিন সালাত ধনী-দরিদ্র, রাজা-ফকিরসকলকে একই কাতারে একাকার করে মানুষে মানুষে ভেদাভেদকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টির জন্য সালাতই এক উপযুক্ত হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে। ভ্রাতৃত্বের এ প্রবল টানে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় একে অপরের প্রতি সহানুভুতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একটি সহানুভূতিশীল ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মানের জন্য সালাত দৈনিক পাঁচবার কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
যাকাত: যাকাত সমাজে বিরাজমান ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসের একটি কার্যকরী প্রতিষ্ঠান। সমাজের অধিবাসীরা একাধারে নৈতিক, কল্যাণকামী এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন পরস্পরের বন্ধু।
যেমন:-আল কুরআনের ঘোষনা”ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার স্ত্রীলোকেরাই প্রকৃতপক্ষে পরস্পর পরস্পরের দায়িত্বশীল বা সাহায্যকারী বন্ধু। এদের পরিচয় এবং বৈশিষ্ট্য এই যে, এরা নেক কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে, নামায কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে, আল্লাহ ও রাসুলের বিধান মেনে চলে। প্রকৃতপক্ষে এদের প্রতিই আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন।” (সুরা-তাওবা-৭১) ফলে দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কখনো বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারে না।
সাওম:সাওম তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ গঠনে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। রমযানের সাওম ফরজ করে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:- ”হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পুর্ববর্তী নবীর উম্মতদের উপর। আশা করা যায় তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণ ও বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হবে।”(সুরা বাকারা-১৮৩) তাকওয়া বলতে বুঝি কোন এক অদৃশ্য ভয় যা আমাকে তাড়া করে ফিরে। যিনি তাকওয়ার পথ অবলম্বন করেন, তিনি একজন মুত্তাকী।
এর ফলে মানুষ অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে এবং ন্যায় কাজ করার জন্য এগুতে পারে। সিয়ামের মাধ্যমে মানুষের বৈধ এবং শাণিত তিনটি হাতিয়ার তথা ক্ষুধা, পিপাসা, যৌনবৃত্তি এবং বিশ্রামের সঙ্গে ক্রমাগত ৩০টি দিন মুকাবিলা করে এ যোগ্যতাই সৃষ্টি করে থাকে। যার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতিটি হুকুম পালনে যাবতীয় শক্তি নিযুক্ত করতে পারে। আল্লাহর নিষিদ্ধ ও অমনোনীত প্রত্যেকটি পাপ কাজকে রুখে দিতে পারে। এটিই তাক্ওয়ার শক্তি। তাক্ওয়ার গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমার সকল কর্মকান্ড গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করছেন।
তিনি সর্বশক্তিমান বিধায় আমার প্রতিটি দূর্নীতির জন্য শাস্তি দিবেন এবং প্রতিটি ন্যায়নীতির জন্য পুরস্কৃত করবেন। তিনি জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব সংরক্ষণের জন্য সম্মানিত লেখক নিয়োজিত করেছেন। পৃথিবীর কেউ না দেখলেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঠিকই প্রত্যক্ষ করছেন। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমেও যা ধরা যায় না আল্লাহর কাছে তা গোপন থাকে না। কারন তিনি দেখেন,জানেন ও শুনেন। এ ধরনের ঈমানের বাস্তব প্রতিফলনের নাম তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয়। চিন্তা করুন এ ধরণের ব্যক্তি দ্ধারা দুর্নীতি ও চরিত্রহীনতার কাজ সংঘঠিত হওয়া কি আদৌ সম্ভব ? এ ধরনের ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কি কখনো বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারে?
হজ্জ: বিশ্বজনিন ভ্রার্তৃত্ব সৃষ্টির এক বিশেষ ট্রেনিং এ হজ্জ। কালো-ধলা, বর্ণ-বৈষম্যহীন এক বিশ্ব গঠনের লক্ষ্যে সকল্ইে একই পোষাকে মাত্র দু-টুকরো কাপড় পরিধান করে দীন-ভিক্ষুকের ন্যায় আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হয়। এখানেও কোন ব্যক্তি বা দেশের বিশেষ মর্যাদা ও উচুঁ নীচুর শ্রেনী বিন্যাশ করা হয় না। মানবতার বন্ধু রাসুল স: জীবনের শেষ হজ্জ অনুষ্ঠানে সোনার বাণী শুনিয়েছিলেন যে, “তোমরা সবাই ভাই এবং প্রত্যেকে সমান। তোমাদের কেউ অন্যের উপর বেশী সুবিধা বা মর্যাদা দাবী করতে পারবে না। একজন আরব অনারব থেকে বেশী মর্যাদাশীল নয় এবং একজন অনারবও আরববাসী থেকে অধিক মর্যাশীল নয়।” এভাবে হ্জ্জ ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করে থাকে। এবং ভ্রাতৃত্বের প্রবল টানে কেউ তারভাইয়ের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারে না। ইসলামের এই ইবাদাতগুলো যখন কোন ব্যক্তি সুচারুরূপে পালন করার পরও যদি কারো সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে দেখা যায়, তবে বুঝতে তার সালাত, সওম, যাকাত ও হজ্জ কোনটিই তার কবুল হয়নি।
ইসলামের মূল দর্শন হচ্ছে, মানুষ মানুষের কল্যাণের তরে কাজ করবে, যে কোন প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তোমরাই শ্রেষ্টজাতি, মানবতার কল্যাণের নিমিত্তে তোমাদের প্রেরণ করা হয়েছে।”(সুরা আলে ইমরান:১১০) তাদের কাজে-কর্মে, আচার-আচরণে সদায় সুষম আচরণ করবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হে মানব জাতি! তোমাদের রবকে ভয় করো।
তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি প্রাণ থেকে। আর সেই একই প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন তার জোড়া। তারপর তাদের দু’জনার থেকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। সেই আল্লাহকে ভয় করো যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের কাছ থেকে নিজেদের হক আদায় করে থাকো এবং আত্মীয়তা ও নিকট সম্পর্ক বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকে। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের ওপর কড়া নজর রেখেছেন।”(সুরা নিসা:১) এ আয়াতের মাধ্যমে মু’মিনদের মধ্যে শ্রেনী-বৈষম্য দুর করা হয়েছে। শ্রেনী বৈষম্যের দ্বারা অন্যের অধিকারকে হরণ করা হয়। এ ধরনের আচরণ একটি বড় ধরনের জুলুমও বটে।
বৈষম্যমূলক আচরণের মাধ্যমে যার অধিকারকে হরণ করা সে মাজলুম। আর মাজলুমের ফরিয়াদ আল্লাহ সরাসরি শোনেন। ফলে এ ধরনের জালিম অচিরেই আল্লাহর গযবে নিপতিত হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হে মানব জাতি! তোমাদের আগের জাতিকে(যারা তাদের নিজেদের যুগে উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহন করেছিল) আমি ধ্বংস করে দিয়েছি-যখন তারা জুলুমের নীতি অবলম্বন করলো।”(সুরা ইউনুস:১৩) ইসলামে সব শ্রেনীর মানুষ মর্যাদাশীল। জাতি, বর্ণ ধর্মের কোন ভেদাভেদ নেই। যদি থেকে থাকে সেটি নিরূপিত হবে ‘তাকওয়ার’ ভিত্তিতে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশী মর্যাদাবান সেই, যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়ার নীতি অবলম্বনকারী।”(সুরা হুজরাত:১৩)
ইসলাম বৈষম্যমূলক আচরণকে অসভ্যতা ও জাহেলী রীতি বলে আখ্যায়িত করেছে। মারূর ইবনে সুওয়ায়েদ রা: থেকে বর্ণিত। হাদীসের শেষাংশ: আবু যর রা: বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে গালি দেই। যার মা ছিল আজমী, আর আমি তার মায়ের নাম নিয়ে গাল মন্দ করি। তখন সে আমার বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা: এর কাছে অভিযোগ করে। তখন নবী সা: বলেন: হে আবু যর! তুমি এমন ব্যক্তি, যার থেকে জাহেলী যুগের গন্ধ আসছে। এরপর তিনি বলেন: এরা তোমাদের ভাই।
আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের উপর ফযীলত দান করেছেন। কাজেই এদের মাঝে যাদের সাথে তোমাদের বনিবনা না হয়, তাদের বিক্রি করে দাও। তোমরা আল্লাহর সুষ্টিকে কষ্ট দিবে না।” (বুখারী:৩০, কিতাবুল ঈমান, পরিচ্ছদ: পাপ কাজ জাহেলী যুগের অভ্যাস। আর শিরক ব্যতীত অন্য কোন গুনাহে লিপ্ত হওয়াতে ঐ পাপীকে কাফের বলা যাবে না, আবু দাউদ:৫১৫৭, কিতাবুস সুনান, ইসলামী শিষ্টাচারের অধ্যায়)
Posted ১:৩২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh