জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
মানুষের মধ্যে ঈমানের বন্ধনই প্রকৃত বন্ধন। এছাড়া পৃথিবীতে আর যত বন্ধন পরিলক্ষিত হয় তা অত্যন্ত ভঙ্গুর ও ক্ষণস্থায়ী। ঈমানের ভিত্তিতে গঠিত সম্পর্ক খাঁটি যা নিখাদ ভালবাসায় পরিপূর্ণ থাকে। এছাড়া পৃথিবীতে অন্যান্য সম্পর্কের ভিত্তিতে রচিত বন্ধন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ফলে তা অত্যন্ত ঢিলা হয়ে থাকে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“(তা সেই সব লোকের জন্যও) যারা এসব অগ্রবর্তী লোকদের পরে এসেছে। যারা বলে: হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং সেই সব ভাইকে মাফ করে দাও যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর আমাদের মনে ঈমানদারদের জন্য কোন হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের রব! তুমি অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু।”(সুরা হাশর:১০)
এই আয়াতটি “ফাই”-এর সম্পদ শুধুমাত্র উপস্থিত ও বর্তমান কালের লোকই পাবে না বরং অনাগত কালের মুসলমানদেরএবং তাদের ভবিষ্যত বংশধরদেরও অংশ আছে। এ আয়াতের মূল প্রতিপাদ্য এ বিষয়টি ধরা হলেও একই সাথে এর মধ্যে মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষাও দেয়া হয়েছে। তাহলো, মু’মিনদের মধ্যে কোন মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃনা-বিদ্বেষ ও শুত্রুতা থাকা উচিত নয়। আর মুসলমানদের জন্য সঠিক জীবনাচার হলো, তারা তাদের পূর্ববর্তী মুসলমানভাইদের লা’নত বা অভিশাপ দেবে না কিংবা তাদের সাথে সম্পর্কহীনতার কথা বলবে না। বরং তাদের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করতে থাকবে।
যে বন্ধন মুসলমানদের পরস্পর সম্পর্কিত করেছে তাহলো ঈমানের বন্ধন। কোন ব্যক্তির অন্তরে অন্য সব জিনিসের চেয়ে ঈমানের গুরুত্ব যদি অধিক হয় তাহলে যারা ঈমানের বন্ধনের ভিত্তিতে তার ভাই, সে অনিবার্যভাবেই তাদের কল্যাণকামী হবে। তাদের জন্য অকল্যাণ, হিয়সা-বিদ্বেষ এবং ঘৃণা কেবল তখনই তার অন্তরে স্থান পেতে পারে যখন ঈমানের মূল্য ও মর্যাদা তার দৃষ্টিতে কমে যাবে এবং অন্য কোন জিনিসকে তার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে শুরু করবে। তাই ঈমানের সরাসরি দাবী, একজন মু’মিনের অন্তরে অন্য কোন মু’মিনের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না।
হযরত আনাস ইবনে মালিক রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমরা একবার রাসুলুল্লাহ সা: এর দরবাওে বসা ছিলাম। তখন তিনি বললেন, এখন তোমাদের কাছে একজন জান্নাতি মানুষ আগমন করবেন। তারপর একজন সাহাবি আগমন করলেন। তার দাড়ি থেকে অজুর পানি ঝড়ে পড়ছিল। তিনি বাম হাতে জুতা নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন। তার পরদিনও রাসুলুল্লাহ সা: আমাদের আগের দিনের মতোই বললেন এবং প্রথম দিনের মতো সেই সাহাবী আগমন করলেন।
রাসুল সা: যখন আলোচনা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা: সেই আগন্তুক সাহাবির অনুগামী হলেন এবং কাছে গিয়ে বললেন আমি আমার বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে শপথ করেছি, তিনদিন পর্যন্ত তার ঘরে যাব না। এই তিনদিন আমাকে যদি আপনার ঘরে থাকার সুযোগ দিতেন , তবে আমি সেখানে থাকতাম। তিনি সম্মতি জানিয়ে বললেন হ্যাঁ, থাকতে পারেন। হযরত আনাস রা: বলেন, হরত আবদুল্লাহ রা: বলতেন, তিনি তার সঙ্গে সেখানে তিন রাত অতিবাহিত করলেন। তিনি তাকে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ সালাত পড়তেও দেখলেন না। তবে, তিনি যখন ঘুমাতেন, বিছানায় পার্শ্ব পরিবর্তন করতেন তখন আল্লাহর যিকর করতেন। হযরত আবদুল্øাহ রা: বলেন, তার মুখ থেকে কিন্তু ভালো কথা ছাড়া কোনো মন্দ কথা শুনেনি। যখন তিনদিন অতিবাহিত হয়ে গেল এবং তার আমলকে খুব সাধারণ ও সাদামাটা মনে হলো, তখন তাকে বললাম, হে আল্লাহর বান্দা! আমি রাসুলুল্লাহ সা: কে আপনার সম্পর্কে তিনবার এ কথা বলতে শুনেছি যে, এখনই তোমাদের নিকট একজন জান্নাতি মানুষ আগমন করবে। উক্ত তিনবারই আপনি আগমন করেছেন। তাই আমি ইচ্ছা করেছিলাম আপনি কি আমল করেন তা দেখতে আপনার নিকট থাকব। যাতে আমিও তা করতে পারি।
কিন্তু আপনাকে তো বেশী আমল করতে দেখলাম না। তাহলে কোন গুণ আপনাকে এই মহান মর্যাদার উপনীথ করেছে, যা রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন? তিনি বললেন, আপনি দেখছেন ওই অতটুকুই। হযরত আবদুল্লাহ রা: বলেন, যখন আমি ফিরে আসছিলাম তখন তিনি আমাকে ডাকলেন। তারপর বললেন, আমার আমল বলতে ওই অতটুকুই, যা আপনি দেখেছেন। তবে আমি আমার অন্তওে কোন মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি না এবং আল্লাহ কাউকে কোন নিয়ামত দান করলে সে জন্য তার প্রতি হিংসা রাখি না। হযরত আবদুল্লাহ রা: বলেন এ গুণই আপনাকে এতবড় মর্যাদায় উপনীত করেছে। আর সেটাই আমরা করতে পারি না।(মুসনাদে আহমাদ: ১২৬৯৭, মুসনাদে বাযযার:১৯১৮, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া:৮/৭৪, আততারগীব ওয়াত তারহীব:৫/১৭৮) উল্লেখ্য হাদীসে আগন্তুক সাহাবীর নাম উল্লেখ না থাকলেও হাদিস বিশারদবিভিন্ন পর্যালোচনা করে বলেছেন, তিনি বিখ্যাত সাহাবী হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা:।
হযরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে।(বুখারী:১২, কিতাবুল ঈমান, বাবু মিনাল ঈমানে…….., আন্ত. নাম্বার:১৩)
তবে কোন মুসলমান যদি কথা ও কাজে ত্রুটি করে তাহলে অবশ্যই তাকে তা বলতে হবে। মনে রাখতে হবে, এটি এক মু’মিনের জন্য সবচেয়ে বড় কল্যাণকর কাজ। কোন ঈমানদার ভুল করলেও সেটাকে ভুল না বলে শুদ্ধ বলতে হবে কিংবা ভ্রান্ত কথাকে ভ্রান্ত বলা যাবে না, ঈমানের দাবী কখনো তা নয়। কিন্তু কোন জিনিসকে প্রমাণের ভিত্তিতে ভুল বলা এবং ভদ্রতা রক্ষা করে তা প্রকাশ করা এক কথা আর শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করা, নিন্দাবান ও কুৎসা রটনা করা এবং গালমন্দ করা আরেক কথা। সমসাময়িক জীবিত লোকদের বেলায়ও এরূপ আচরণ করা হলে তা একটি বড় অন্যায়। কিন্তু পূর্বের মৃত লোকদের সাথে এরূপ আচরণ করলে তা আরো বড় অন্যায়। কারণ, এরূপ মন ও মানসিকতা এমনই নোংরা যে, তা মৃতদেরও ক্ষমা করতে প্রস্তুত নয়। এর চেয়েও বড় অন্যায় হলো সেই সব মহান ব্যক্তি সম্পর্কে কটুক্তি করা যারা অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষার সময়ে রাসুলুল্লাহ সা: এর বন্ধুত্ব ও সাহচর্যের হক আদায় করেছিলেন এবং নিজেদের জীবন বিপন্ন করে পৃথিবীতে উসলামের আলোর বিস্তার ঘটিয়েছিলেন যার বদৌলতে আজ আমরা ঈমানের নিয়ামত লাভ করেছি।
তাদের মাঝে যেসব মতানৈক্য হয়েছে সে ক্ষেত্রে কেউ যদি এক পক্ষকে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করে এবং অপর পক্ষের ভ’মিকা তার মতে সঠিক না হয় তাহলে সে ্ওরূপ মত পোষণ করতে পারে এবং যুক্তির সীমার মধ্যে থেকে তা প্রকাশ করতে বা বলতেও পারে। কিন্তু এক পক্ষের সমর্থনের এতটা বাড়াবাড়ি করা যে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষে মন পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং কথা লেখনীর মাধ্যমে গালি দিতে ও নিন্দাবাদ ছড়াতে থাকা এটা এমন একটা আচরণ যা কোন আল্লাহভীরু মানুষের দ্বারা হতে পারে না। কুরআনের স্পষ্ট শিক্ষার পরিপন্থী এ আচরণ যারা করে তারা তাদের এ আচরণের সমর্থনে যুক্তি পেশ করে যে,কুরআন মু’মিনের প্রতি শত্রুতা ও ঘৃণা পোষণ করতে নিষেধ করে কিন্তু আমরা যাদেও প্রতি শত্রুতা ও ঘৃণা পোষণ করি তারা মু’মিন নয় বরং মুনাফিক। কিন্তু যে গুনাহের সপক্ষে সাফাই ও ওযর হিসাবে এ অপবাদ পেশ করা হয়ে থাকে তা ঐ গুনাহের চেয়েও জঘন্য। কুরআন মাজীদের এ আয়াতগুলোই তাদের এ অপবাদ খণ্ডন ও প্রত্যাখ্যানের জন্য যতেষ্ট। কারণ এ আয়াতগুলোর বর্ণনাধারার মধ্যেই আল্লাহ তা’আলা পরবর্তীকালের মুসলমানদেরকে তাদের পুর্ববর্তী ঈমানদারদের সাথে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ না রাখতে এবং তাদের জন্য মাগফিরাতের দু’আ করতে শিক্ষা দিয়েছেন।
Posted ২:৪৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh