জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৫
মৃত্যুর পর প্রথম ষ্টেশন হলো, কবর। কবর জীবনে প্রবেশের সাথে সাথে তিনটি প্রশ্নের সম্মুখীনহতে হবে। প্রিলিমিনারি এই প্রশ্নের উত্তর থেকেই নির্ধারিত হয়ে যাবে, সামনের স্টেশনগুলো সুগম হবে না কি কন্টকাকির্ণ। অর্থাৎ এখানেই ফয়সালা হয়ে যাবে আখিরাতের বাকি ষ্টেশনগুলো পারাপারের সফলতা আর বিফলতা।
উসমান রা: এর মুক্তদাস হানী বলেন, উসমান রা: কোন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এত কাঁদতেন যে, তাঁর দাঁড়ি ভিজে যেতো। তাকে প্রশ্ন করা হলো, জান্নাত জাহান্নামের আলোচনা করা হলে তো আপনি কাঁদেন না, অথচ এই কবর দর্শনে এত বেশী কাঁদেন কেন? তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: আখিরাতের মানযিলসমূহের মধ্যে কবর হলো প্রথম মনযিল। এখান হতে কেউ মুক্তি পেয়ে গেলে তবে তার জন্য পরবর্তি মানুযিলগুলোতে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ হয়ে যাবে। আর সে এখান হতে মুক্তি না পেলে তবে তার জন্য পরবর্তী মানযিলগুলো আরো বেশী কঠিন হবে। তিনি (উসমান) বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: আরো বলেছেন, আমি কবরের দৃশ্যের চাইতে অধিক ভয়ংকর দৃশ্য আর কখনো দেখিনি। আবু ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান গরীব। তিরমিযি: ২৩০৮, কিতাবুল জুহদি আন রাসুলিল্লাহ সা:, পরিচ্ছদ: কবরের শাস্তিকে ভয় করো)
আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন, মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরে রাখা হয় তখন দুইজন কৃষ্ণবর্ণের ও নীল চক্ষু বিশিষ্ট ফিরিশতা তার কাছে আসেন, একজনকে বলা হয় ‘আল মুনকার’ আর অপরজনকে বলা হয় ‘আন নাকীর’। তারা বলেন, এই ব্যক্তি (নবী সা:) সম্পর্কে তুমি কি বলতে? সে তখন তাঁকে যা বলতো, তা-ই বলবে যে, ইনি হলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। তারপর তারা বলবেন আমরা জানতাম যে তুমি এই কথা বলবে।
এরপর তার কবর সত্তর গজ প্রশস্ত করে দেওয়া হবে এবং তার জন্য এটি আলোকিত করে দেওয়া হবে। এরপর তাকে বলা হবে, তুমি ঘুমিয়ে যাও। ঐ ব্যক্তি বলবে, আমি আমার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে যেতে চাই। যাতে এই খবরটি তাদের দিতে পারি। তখন ফিরিশতা দুইজন বলবেন, নয়া দুলহার মত তুমি ঘুমিয়ে থাক। যাকে তার পরিবারের সবচাইতে প্রিয় ব্যক্তি ছাড়া জাগায় না। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা তাকে তার এই শয্যা থেকে উত্থিত করবেন। আর মৃত ব্যক্তি যদি মুনাফিক হয় তবে সে বলবে, আমি তো জানিনা, তবে লোকদের যা বলতে শুনেছি আমিও তাই বলেছি।
ফিরিশতারা বলবে আমরা জানতাম তুমি এই ধরনেরই কথা বলবে। এরপর যমীনকে বলা হবে একে চাপ দাও। তখন যমীন তাকে চাপ দিবে। ফলে তার পিঞ্জরের অস্থিসমূহ একটার ভিতর অন্য ঢুকে পড়বে। এভাবে সে আযাব ভোগ করতে থাকবে, অবশেষে তাকে আল্লাহ তা’আলা তার এ শয্যা থেকে উত্থিত করবেন।(তিরমিযি: ১০৭১, কিতাবুল জানায়েজ আন রাসুলিল্লাহ, পরিচ্ছদ: কবরের আযাব, মিশকাত:১৩০)
কবরের প্রশ্ন তিনটি নিম্নরূপ: ১. তোমার রব কে? ২. তোমার দীন কি?৩. এই ব্যক্তি কে? প্রশ্ন তিনটি অত্যন্ত সহজই মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর উত্তরগুলো সকলের জন্য সহজ হবে না। আপনি যদিসারাজীবন এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্ত করতে থাকেন, তথাপি তার উত্তর আপনি দিতে পারবেন না। সত্যিকারার্থে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হলে আপনাকে রব, দীন ও মুহাম্মদ সা: এই তিনটি পরিভাষার তাৎপর্য জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী নিজের কর্মপন্থা ও কর্মনীতি ঠিক করে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলার নির্দেশিত ও রাসুলুল্লাহ সা: এর প্রদর্শিত পন্থায় দীনকে নিজের জন্য খালিছভাবে গ্রহণ করতে হবে।
প্রথম প্রশ্ন: তোমার রব কে? রব হলো সামগ্রীকভাবে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি। আল্লাহ তা’আলাকে রব হিসাবে মানতে হবে। আল কুরআনের চারটি পরিভাষা তথা ররু-বিয়াত, উলুহিয়াত, উবুদিয়াত ও দীনিয়াত। এই চারটির মধ্যে রুবুবিয়াত পরিভাষাটি ঈমানের মৌলিকত্বকে সবচেয়ে বেশী বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। এটি আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে বিশালাকারে প্রকাশ করে। এ শব্দটি আরবী ভাষায় তিনটি অর্থে ব্যবহার করা হয়। এক, মালিক ও প্রভু। দুই, অভিভাবক, প্রতিপালনকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী ও সংরক্ষণকারী। তিন, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, শাসনকর্তা পরিচালক ও সংগঠক। সুরা ফাতিহার প্রথম আয়াতে এ শব্দটি উপস্থাপনার ভঙ্গিমায় আমরা উল্লেখিত তিনটি অর্থই মেনে নিতে পারি। আয়াতটির অর্থ হচ্ছেঃ“প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি নিখিল বিশ্ব জাহানের রব।” প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য, কারণ তিনিই বিশ্ব-জাহানের মালিক। প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য, কারণ তিনিই বিশ্ব-জাহানসহ সকল সৃষ্টির অভিভাবক, প্রতিপালনকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী ও সংরক্ষণকারী। প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য, কারণ তিনিই বিশ্ব-জাহানের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, শাসনকর্তা পরিচালক ও সংগঠক।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব, যিনি আকাশ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি নিজের কর্তত্বের আসনে সমাসীন হন। তিনি রাত দিয়ে দিনকে ঢেকে দেন তারপর রাতের পেছনে দিন দৌড়িয়ে চলে আসে। তিনি সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজী সৃষ্টি করেন। সবাই তাঁর নির্দেশের অনুগত। জেনে রাখো, সৃষ্টি তারই এবং নির্দেশও তাঁরই। আল্লাহ বড়ই বরকতের অধিকারী তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক ও প্রতিপালক।”(সুরা আরাফ:৫৪)
আয়াতের শুরুতে বলা হয়েছে “প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব” আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে “তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক ও প্রতিপালক।” আয়াতের মধ্যোংশে রবের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ এ বিশ্ব-জগতের নিছক স্রষ্টাই নন বরং এর পরিচালক ও ব্যবস্থাপকও তিনি। তিনি এ দুনিয়াকে অস্তিত্বশীল করার পর এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে কোথাও বসে যাননি। বরং কার্যত তিনিই সারা বিশ্ব-জাহানের ছোট বড় প্রত্যেকটি বস্তুর ওপর কর্তৃত্ব ও লালন-পালন করছেন।
পরিচালনা ও শাসন কর্তৃত্বের যাবতীয় ক্ষমতা কার্যত তাঁরই হাতে নিবদ্ধ। প্রতিটি বস্তু তাঁর নির্দেশের অনুগত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণাও তাঁর নির্দেশ মেনে চলে। প্রতিটি বস্তু ও প্রাণীর ভাগ্যই চিরন্তনভাবে তাঁর নির্দেশের সাথে যুক্ত। কুরআন শাশ্বত ও অনাদি-অনন্ত সত্য উপস্থাপন করছে যে, ভুমণ্ডলে ও নভোমণ্ডলে একমাত্র আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত।
সার্বভৌমত্ব(ঝড়াবৎবরমহঃু) বলতে যা বুঝায় তা একমাত্র তাঁরই সত্তার একচেটিয়া অধিকার ও বৈশিষ্ট্য। আর বিশ্ব-জাহানের এ ব্যবস্থাপনা একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বিশেষ, যেখানে ঐ একক সত্তা, সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের পূর্ণ অধিকারী। কাজেই এ ব্যবস্থার মধ্যে যে ব্যক্তি বা দল নিজের বা অন্য কারোর আংশিক বা পূর্ণ কর্তৃত্বের দাবীদার হয়, সে নিজেকে নিছক প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে রেখেছে। তার পক্ষে তার রব কে, সে উত্তর সে দিতে পারবে না।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: তোমার দীন কি? দীন হলো, মানুষের সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থার নাম। আল্লাহর মনোনীত জীবন ব্যবস্থার নাম ইসলাম। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ইসলাম আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন-জীবনবিধান।”(সুরা আলে ইমরান:১৯) অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলার কাছে মানুষের জন্য একটিমাত্র জীবন ব্যবস্থা ও একটি মাত্র জীবন বিধান সঠিক ও নির্ভুল বলে গৃহীত। সেটি হচ্ছে, মানুষ আল্লাহকে নিজের মালিক ও মাবুদ বলে স্বীকার করে নিবে এবং তার ইবাদাত, বন্দেগী ও দাসত্বের মধ্যে নিজেকে সম্পুর্ণরূপে সোপর্দ করে দিবে। আর তাঁর বন্দেগী করার পদ্ধতি নিজে আবিস্কার করবে না। বরং তিনি নিজের নবী-রাসুলগণের মাধ্যমে যে হিদায়াত ও বিধান পাঠিয়েছেন কোন প্রকার কমবেশী না করে তার অনুসরণ করবে। এই্ চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির নাম ‘ইসলাম’। নিজের সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থা আল্লাহর দেয়া ইসলামের আলোকে পরিচালনা করা হলেই কেবল দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে। মনে রাখতে হবে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন মত পথ গ্রহণ করা হলে, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আরো মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে যত নবী রাসুল এসেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের জীবন ব্যবস্থা ছিল ইসলাম।
তৃতীয় প্রশ্ন: তোমার নবী কে?হাদীসের পরিভাষায় প্রশ্নটির ধরণ হবে এভাবে যে, ‘মুনকির ও নাকীর ফেরেশতাদ্বয় বলবেন, এই ব্যক্তি (নবী সা:) সম্পর্কে তুমি কি বলতে? এই প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিতে হলে, দুনিয়াতে আল্লাহর রাসুলকে নিচের আয়াতের আলোকে মানতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রাসুলকে হিদায়াত এবং ’দীনে হক’ দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি এ দীনকে অন্য সকল দীনের ওপর বিজয়ী করেন, চাই তা মুশরিকদের কাছে যতই অসহনীয় হোক না কেন।”(সুরা সফ:৯) কিন্তু যারা আল্লাহর দাসত্বের সাথে অন্যদের দাসত্বও করে থাকে এবং আল্লাহর দীনের সাথে অন্য সব দীন ও বিধানকে সংমিশ্রণ করে, তাদের পক্ষেতৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়া আদৌ সম্ভব হবে না। বরং রাসুলকে যেই জীবন বিধান দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে সেই জীবন ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে হবে এবং এটিকে রাসুলের প্রদর্শিত পন্থায় অন্যান্য সকল অসত্য জীবন ব্যবস্থার ওপর বিজয়ী করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে।
Posted ১২:০২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh