জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
মানব সভ্যতা বিকাশে নারীর অবদান ও কৃতিত্বকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। কারণ মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। তাদের বাদ দিয়ে সামাজিক কাঠামো ও সামাজিক উন্নয়ন তথামানব উন্নয়নের কল্পনা করা যায় না। তাই তাদের অবহেলা করার প্রশ্নই উঠে না। একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘নারীর হাতে সভ্যতার দুর্গ।’ অতি কষ্টে তারা মানবজাতিকে ধারণকরেন। তাদের এই পরিশ্রম ও কষ্টকে অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায়না। ইসলামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মহিলাদের অংশগ্রহণ কিংবা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে বাড়ির বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে। বাড়ির বাইরে যেতে হবে বলেই হিজাবের বিধান দেয়া হয়েছে। তবে পশ্চিমাদের মতো নারী উন্নয়নের মোড়কে নারীকে পণ্যে পরিণত করা মোটেও কোন সভ্য মানুষের কাম্য হতে পারেনা। যে সভ্যতা নারীকে লাল পানিয়ের মতই ভোগের উপকরণ হিসাবে জমকালো ডাইনিং টেবিলের পাত্রে সাজিয়ে রাখে। যারা নারীকে জোর করে প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে।
ব্যাপারটি অনেকটা সুসভ্য সুশ্রী কোন মানুষকে বিকৃত অসভ্য জংলীদের আখড়ায় ঠেলে দেয়ার মত। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। ভাঙ্গছে ঘর, ভাঙ্গছে পরিবার, আরো ভাঙ্গছে সমাজব্যবস্থা আর ভবিষ্যত বংশধারা। চিলির নোবেল বিজয়ী কবি গেব্রিয়েলা মিল্ট্রালের কন্ঠে আমরা এরই প্রতিধ্বনি শুনতে পাইঃ “আমরা অনেক দোষেই দোষী। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় দোষ হচ্ছে শিশুদের ত্যাগ করা, তাদের জীবনের স্রোতধারাকে অস্বীকার করা। অনেক কিছুর জন্যই অপেক্ষা করা যায়, কিন্তু শিশুর জন্য নয়। এখনই তার গড়ে ওঠার সময়। তার কাছে আগামীকাল বলে কিছু বলা যাবেনা। বর্তমানই তার নাম।”
লসএঞ্জেলস ্টাইমস ্এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে ঠিক একই আশংকা ব্যক্ত করেছিলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ চিকিৎসক ও খ্যাতিমান শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. টি বেবী ব্রাজেলটনঃ “আমার নিজের অনুভূতি, আমরা মেয়েদের অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছি। দু’কুল রক্ষার জন্য আমরা তাদের কিছুই দেইনি। আমি মনে করি, আমাদের দেশ গভীর থেকে গভীর সংকটে নিপতিত হয়েছে।”
ডাঃ ব্রাজেলটন ৮০ বছর বয়সী একজন প্রধান শিশু চিকিৎসক। তিনি অত্যন্ত কাছে থেকে দেখেছেন মায়েদের অবহেলা কিভাবে শিশুদের জীবনী শক্তিকে তিলেতিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিনি আরো দেখেছেন কিভাবে মার্কিন মহিলারা জীবিকার জন্য শ্রমবাজারের দিকে দৌড়াচ্ছে এবং পরিবারের ভাঙ্গন মার্কিন শিশুদের কি ক্ষতি করছে। সত্যিই সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তির নামে তারা মেয়েদের মায়ের দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে, যেমন মুক্তি মার্কিন মহিলারা পেয়েছেন এবং তাদের সন্তানেরা আস্তাকুঁড়ের কীটে পরিণত হচ্ছে। ‘নদীবিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারীহচ্ছে, নদীনিয়ে খেলবেননা, আপনিজানেননা, এক দিকেনদীবাঁধদিয়ে এক হাজারএকরউদ্ধারকরলেঅন্যস্থানে সে পাঁচহাজারএকরনিয়ে যেতেপারে। নদী থেকে সহস্র গুণ জটিলসমাজ ও সামাজিকপ্রক্রিয়া। সমাজনিয়ে খেলেপাশ্চাত্য এখনডুকরে কেঁদে মরে।’
মূলত মানবসভ্যতার কারিগর নারীকে তার উপযুক্ত জায়গায় স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়ার নামই নারীর অধিকার। মনে রাখা প্রয়োজন, এটি এমন একটি জায়গা যেটিকে পরিচালনা করার বিকল্প হিসাবে পুরুষ বা অন্য কোন কৃত্রিম কিছুর চিন্তা করা বোকামী। নারীকে জোর করে এমন এক অন্ধকার, অচেনা, অজানা কর্মক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয়েছে, যেখানকার পরিবেশ নারীর প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিরোধী। ফলে বিশ্বের মানবসভ্যতা আজ চরম হুমকীর সম্মুখীন।
মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে উদ্ধারের লক্ষ্যে নারীকে তার নিজস্ব কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনতে হবে। নারীর আর্থিক দিকটি পাশ্চাত্যের মতো চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। বরং আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাদের জন্য নিশ্চিত আর্থিক ব্যবস্থা করে রেখেছেন, সেটিই অতীব উত্তম পন্থা। প্রথমত: তিনি স্বামীর ওপর মোহরানা ফরয করেছেন, যা স্থায়ী আমানত হিসাবে স্ত্রীর কাছে থাকবে। এটি ব্যয় করার জন্য তাকে কেউ বাধ্য করতে পারেনা। তার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্বামীকে ভরণ-পোষণে বাধ্য করা হয়েছে। স্বামীর সম্পত্তি হেফাজতের সাথে সাথে তা ভোগ-ব্যবহারের অধিকার তো আছেই। দ্বিতীয়ত, নারীমাত্রই মৃত পিতা-মাতা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে ও স্বামীরসম্পত্তির অংশ পায়। আমাদের সমাজ সংসারে নারীর সার্বিক অধিকারের সুফল দেখতে হলেই নারীর অর্থ সম্পর্কিত আইন ও অধিকার বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ একাš Íজরুরী। এছাড়া নারী অধিকার নিয়ে বিশ্ব যতই হইহুল্লোড় হোক না কেন, নারী তার সুষম শান্তিদায়ক সার্বিক অধিকার কখনো ফিরে পাবেনা। নারী যদি কোন অর্থনৈতিক কাজে জড়িত হতেই হয়, তবে পরিবার রক্ষার জন্য তার কর্মক্ষেত্রের কর্মঘন্টা কমিয়ে দেয়া উচিত। যে কয় ঘন্টা সংশ্লিষ্ট সংস্থার ক্ষতি হবে তার ভর্তুকি দিবে সরকার।
‘নারী অধিকার’বিষয়টি নিয়েপৃথিবী বেশকিছুদিন থেকে সরবহয়ে উঠেছে। সভা-সমিতি ও সেমিনার-সিম্পোজিয়ামসহ বিভিন্ন লেখায়‘নারী অধিকার’আজএকটি গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় বিষয়। নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক অধিকারের ক্ষেত্রে জ্ঞানগর্ভ আলোচনার কোন কমতি নেই। এ সব আলোচনায় সমালোচিত হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মের অধিকারের আওতার বিষয়টিও। যারা আজমিডিয়ায় অত্যন্ত শক্তিশালী তারা এ ব্যাপারে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। সন্দেহ নেইসারা পৃথিবীতেই সলামী মিডিয়া এতটাই দূর্বল যে ইসলামে নারী অধিকারের অনন্য অতুলনীয় বিষয়গুলো অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে উচ্চারিত হয়।
ইসলামে নারীঅধিকার বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব মিডিয়া যতটুকুনা হৈ চৈ করছে, তার চেয়েও বেশী বিভ্রান্তিতে আছে মুসলামান। এর প্রকৃত কারণ পর্যাপ্তইসলামীজ্ঞানের অভাব। বিশেষ করে বিশ্ববাসী পরিপূর্ণ ইসলামী আইনের বাস্তবপ্রয়োগ দেখে নিবিধায় এ ব্যাপারে জানার আগ্রহ উদ্দীপনা খুবইসীমিত। তাই হীনমন্যতা ও অবনতিশীল মানসিকতা আমাদেরকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে যে, আধুনিকজ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ পশ্চিমাবিশ্বের সাথে স্বর মিলিয়ে মুসলমানরাও কথা বলে। অত্যন্ত দু:খের সাথে লক্ষ্য করাযাচ্ছে যে, বিশ্বের মুসলিমশাসকগণ মুসলমান হওয়ার পরও নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দেয়ার নাম করে তারা আল্লাহর দেয়া সীমারেখা ভেঙ্গে নিজেদের খেয়ালখুশিমত আইন-কানুন তৈয়ার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে ‘নারী অধিকার’ বিষয়ে ইসলামের সাথে পৃথিবীর অন্যান্য মতবাদের তুলনাই চলেনা। কেউ মানুক আর না মানুক ইসলাম নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক অধিকার প্রদান করে যতটুকু আবর্জনাপুর্ণ গভীর খাদ থেকে তাকে উদ্ধার করেছে এবং তাকে মর্যাদার সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আসীন করেছে, ভোগবাদী পৃথিবীর বিভিন্ন মতবাদ নারীঅধিকারের নাম করে নারীকে ঠিক ততটুকুইবা ক্ষেত্র বিশেষে তার চেয়েও বেশী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। ইসলামের উত্তরাধিকার আইনটির সফল বাস্তবায়ন হলে নারীর অধিকারের সুফল আমরা স্বচক্ষে দেখতে পেতাম। আল্লাহর এ বিধানটির সঠিক প্রয়োগ ঘটুক এবং মুসলিম নারী সমাজ আর্থ-সমাজিক পথে স্বয়ংসম্পুর্ণ হয়ে উঠুক। সারা বিশ্বের নারী সমাজ খুঁজে পাক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ মর্যাদা।
Posted ৩:১৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh