বাংলাদেশ ডেস্ক : | বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
জোহরান মামদানি। ছবি : সংগৃহীত
নিউইয়র্ক সিটির ভাড়াটিয়াদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, হয়রানি ও আবাসন সংকট মোকাবিলায় একগুচ্ছ যুগান্তকারী উদ্যোগ ঘোষণা করেছেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান কওয়ামে মামদানি। ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার লোয়ার ম্যানহাটনের ঐতিহাসিক টেনেমেন্ট মিউজিয়ামে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম ‘রেন্টাল রিপঅফ রিপোর্ট (আরআরআর)’ প্রকাশ করেন।
হাজারো ভাড়াটিয়ার সাক্ষ্য, অভিযোগ ও মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তুত এই প্রতিবেদনে আবাসন খাতে ব্যাপক সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। নিউইয়র্কে ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রথম ‘রেন্টাল রিপঅফ রিপোর্ট’ প্রকাশ করলেন মেয়র মামদানি। খারাপ বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, প্রতিটি হিট কমপ্লেইন্টে বাধ্যতামূলক তদন্ত, ভাড়াটিয়া ইউনিয়নের আইনি স্বীকৃতি ও ভাড়া বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ঘোষণা দিয়েছেন।
মেয়র মামদানি বলেন, একটি শহরের মর্যাদা নির্ভর করে তার নাগরিকদের নিরাপদ ও সম্মানজনক বাসস্থানের ওপর। কিন্তু এখনও বহু নিউইয়র্কবাসী উচ্চ ভাড়া পরিশোধ করেও তেলাপোকা, ছত্রাক, ভাঙা লিফট, ফুটো পাইপ, শীতকালে পর্যাপ্ত তাপের অভাব এবং অবহেলিত ভবনে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতেই তার প্রশাসন এই নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
ভাড়াটিয়াদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি রিপোর্ট করা হয়, মেয়র জানান, ক্ষমতায় আসার পর গত চার মাসে নিউইয়র্ক সিটির পাঁচটি বরোতে প্রথমবারের মতো রেন্টাল রিপঅফ হিয়ারিংস অনুষ্ঠিত হয়। এসব শুনানিতে ২,৩০০-এরও বেশি ভাড়াটিয়া অংশ নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ ও পরামর্শ তুলে ধরেন। সেই সব সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই বর্তমান ‘রেন্টাল রিপঅফ রিপোর্ট’ তৈরি হয়েছে।তিনি বলেন, এই রিপোর্ট কোনো আনুষ্ঠানিক নথি নয়; এটি হাজারো নিউইয়র্কবাসীর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
যারা নিজেদের কষ্টের কথা বলেছেন, তাদের কণ্ঠস্বরই আমাদের নীতিনির্ধারণের ভিত্তি।চারটি প্রধান কর্মসূচি-মেয়র মামদানি জানান, নতুন পরিকল্পনা চারটি প্রধান ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।আবাসনের মানোন্নয়ন এর ব্যাপারে বলা হয়, প্রথমবারের মতো নিউইয়র্ক সিটিতে জমা পড়া প্রতিটি হিট কমপ্লেইন্ট (গরমের ব্যবস্থা না থাকা সংক্রান্ত অভিযোগ) তদন্ত করবেন হাউজিং ইন্সপেক্টররা।
এছাড়া বাসিন্দারা নির্ধারিত সময়ে ইন্সপেক্টর না পেলে নিজের সুবিধামতো সময়ে পুনরায় পরিদর্শনের সময় নির্ধারণ করতে পারবেন। মোল্ড, তেলাপোকা, ইঁদুর, ভাঙা লিফট এবং অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যার বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
শুধু দেয়ালে রং করে ছত্রাক ঢেকে দেওয়া আর চলবে না; সমস্যার মূল কারণ দূর করতেই বাড়িওয়ালাদের বাধ্য করা হবে।খারাপ বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়। প্রশাসন ফিক্স দ্য সিটি নামে নতুন একটি অভিযান শুরু করবে। এর আওতায় দীর্ঘদিন ধরে আইন লঙ্ঘনকারী ও অবহেলাকারী বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে কাগজে-কলমে পরিচালিত ভবন নিবন্ধন, অভিযোগ ও জরিমানার পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা হবে, যাতে পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যায় এবং সৎ বাড়িওয়ালারাও সুবিধা পান।
ভাড়াটিয়াদের ক্ষমতায়ন এর উপর জোর দেয়া হয়েছে। মেয়র ঘোষণা দেন, নিউইয়র্ক সিটিতে ট্যানেন্ট ইউইনয়ন -কে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ফলে ভাড়াটিয়ারা সংগঠিত হয়ে বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে হয়রানি বা উচ্ছেদের ভয় দেখানো যাবে না। সংগঠিত ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে সিটি প্রশাসন সরাসরি কাজ করবে এবং প্রয়োজনে সমস্যাগ্রস্ত ভবনের মালিকানা দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগও নেওয়া হবে।
ভাড়া বাজারে স্বচ্ছতা আনার উপর জোর দেয়া হয়েছে। অনলাইনে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর ভাড়ার বিজ্ঞাপন বন্ধে নতুন নিয়ম আনা হবে।যদি কোনো অ্যাপার্টমেন্টের ছবি বা ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা ডিজিটালি পরিবর্তন করা হয়, তাহলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এতে ভাড়াটিয়ারা প্রতারণার শিকার হবেন না এবং বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে আগেই জানতে পারবেন।
ফিক্স দ্য সিটি ও এনফোর্সমেন্ট ডেস-হাউজিং প্রিজারভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এইচপিডি)-এর কমিশনার ডিনা লেভি জানান, ফিক্স দ্য সিটি কর্মসূচির পাশাপাশি এনফোর্সমেন্ট ডেস নামে আরেকটি নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।এর আওতায় সংগঠিত ভাড়াটিয়া সমিতির অভিযোগের ভিত্তিতে একটি ভবনের ছাদ থেকে বেজমেন্ট পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন করা হবে। এতে দীর্ঘদিনের আইন লঙ্ঘন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
সরকারের নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ভাড়াটিয়ার কথা বলা হয়েছে। মেয়রের অফিস টু প্রোটেক্ট টেন্যান্টস-এর নির্বাহী পরিচালক সিয়া উইভার বলেন, এই রিপোর্ট শুধু একটি নীতিপত্র নয়; এটি হাজারো ভাড়াটিয়ার অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। তিনি জানান, রিপোর্টে যেসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য আইন পরিবর্তনের প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে সিটি কাউন্সিলের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে।বাড়িওয়ালাদের জন্যও সহায়তার পরিকল্পনাও রয়েছে। মেয়র মামদানি বলেন, সব বাড়িওয়ালাই খারাপ নন।
বিশেষ করে সাশ্রয়ী আবাসনের অনেক মালিক ক্রমবর্ধমান বীমা ব্যয়ের কারণে সমস্যায় পড়েছেন। তাই প্রশাসন তিন বছরে ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি সিটি-সমর্থিত বীমা তহবিল গঠন করছে, যাতে সৎ বাড়িওয়ালারা কম খরচে বীমা সুবিধা পেয়ে ভবনের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন।
দাবানলের ধোঁয়া নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন মেয়র। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই মেয়র কানাডার দাবানলের ধোঁয়ায় নিউইয়র্কের বায়ুদূষণ বেড়ে যাওয়ায় নাগরিকদের সতর্ক করেন।
তিনি জানান, বায়ুর মান অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই সবাইকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে না যাওয়া, কষ্টসাধ্য শারীরিক কাজ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে কঘ৯৫ মাস্ক ব্যবহার করার আহ্বান জানান। শহরের লাইব্রেরি, পুলিশ প্রিসিঙ্কট ও ফায়ারহাউসে বিনামূল্যে কঘ৯৫ মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।আবাসন নীতিতে নতুন অধ্যায় হিসাবে এটিকে অ্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রেন্টাল রিপঅফ রিপোর্ট নিউইয়র্ক সিটির আবাসন নীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
ভাড়াটিয়াদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন, বাড়িওয়ালাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভাড়াটিয়াদের আইনি সুরক্ষা—সব মিলিয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শহরের আবাসন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
মেয়র মামদানি বলেন, “নিউইয়র্কের প্রতিটি মানুষের অধিকার একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বাসযোগ্য ঘরে বসবাস করা। সেই অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের সরকারের দায়িত্ব, এবং আমরা সেই দায়িত্ব পালন করব।”
মামদানি ২০২৯ পুনর্নির্বাচন যুদ্ধে আগেভাগেই মাঠে
মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ২০২৯ সালের পুনর্নির্বাচনকে সামনে রেখে শক্তিশালী নির্বাচনী তহবিল গঠন শুরু করেছেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি। সর্বশেষ প্রচার তহবিল প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তিনি প্রায় ৬ হাজার দাতার কাছ থেকে প্রায় ৩ লাখ ৪ হাজার ডলার সংগ্রহ করেছেন।নিউইয়র্ক সিটি ক্যাম্পেইন ফাইন্যান্স বোর্ডে গত ১৫ জুলাই জমা দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থের প্রায় সবটুকুই এসেছে গত এক মাসে। যদিও প্রতিবেদনে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাসের আর্থিক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মামদানির এই তহবিলের ৬১ শতাংশ এসেছে নিউইয়র্ক সিটির বাইরে থাকা দাতাদের কাছ থেকে। ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস ও ভার্জিনিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সমর্থকেরাও সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত অনুদান দিয়েছেন।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, মামদানির রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা এখন কেবল নিউইয়র্কেই সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় পর্যায়েও তিনি একটি পরিচিত রাজনৈতিক মুখে পরিণত হয়েছেন।২০২৫ সালের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারির সময়ও মামদানি ক্ষুদ্র অনুদানভিত্তিক তহবিল সংগ্রহে ব্যাপক সফলতা পেয়েছিলেন। এবারও সেই কৌশলই অনুসরণ করেছেন তিনি। গত এক মাসে প্রতিটি অনুদানের গড় পরিমাণ ছিল মাত্র ৫২ ডলার। তার প্রচার শিবিরের ভাষ্য, এটি বড় করপোরেট অর্থ নয়, বরং সাধারণ মানুষের সমর্থনের প্রতিফলন।
তবে এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। মামদানি এখন পর্যন্ত নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক ম্যাচিং ফান্ডস কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার আবেদন করেননি। এই কর্মসূচির আওতায় ছোট অনুদানের বিপরীতে সরকারি অর্থ সহায়তা দেয়া হয়। তার প্রচার ব্যবস্থাপক সেলিয়া কাস্তেলান জানিয়েছেন, তারা এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করছেন না।এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মামদানি বলেন, ম্যাচিং ফান্ডস কর্মসূচি তাকে মেয়র হতে সাহায্য করলেও এর ব্যয়ের সীমা তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপুল অর্থব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।তার ভাষায়, ‘আমরা জানি ভবিষ্যতে আমাদের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হবে। তাই আমাদেরও সেই ব্যবধান কমানোর জন্য নতুন কৌশল নিতে হয়েছে।’
তার দাখিল করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৩৩টি অনুদান ম্যাচিং ফান্ডস কর্মসূচির নির্ধারিত ২,৫০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ২৯ জন দাতা ৪,৩৫০ ডলার করে অনুদান দিয়েছেন, যাদের অনেকেই নিউইয়র্ক সিটির বাইরের বাসিন্দা। প্রচার ব্যবস্থাপক সেলিয়া কাস্তেলান এক বিবৃতিতে বলেন, ৬ হাজার দাতা, একটি অভিন্ন লক্ষ্য। গড়ে মাত্র ৪৫ ডলারের অনুদান দিয়েই সাধারণ মানুষ মেয়রের পুনর্নির্বাচন প্রচারণাকে এগিয়ে নিচ্ছেন। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক প্রচারণা নয়, এটি একটি আন্দোলন।
মামদানি গত জুন মাস থেকেই সমর্থকদের কাছে টেক্সট মেসেজ পাঠিয়ে অনুদান চাওয়া শুরু করেন। এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মাঠে নামেননি। সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক এনওয়াইপিডি কর্মকর্তা জন চেল, সাবেক রিপাবলিকান মেয়র প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া, বারস্টুল স্পোর্টসের প্রতিষ্ঠাতা ডেভ পোর্টনয় এবং অভিনেতা মাইকেল রাপাপোর্ট। তবে এদের কেউই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী কমিটি নিবন্ধন করেননি।
Posted ১:৪৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh