জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
প্রগতি অর্থ ১. জ্ঞানে বা কর্মে অগ্রগতি, উন্নতি; ২. ক্রমোন্নতি ৩. (গণিতে) নিয়মিতভাবে ক্রমবর্ধমান সংখ্যা শ্রেনী। প্রগতিবাদী উন্নতিকামী। প্রগতিশীল উন্নতিশীল; উন্নতি বা অগ্রগতি করতে চায় বা করছে এমন। আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি সুশীল দাবীদাররা ও সাংস্কৃতিক জগতের লোকেরা এ শব্দটি বেশী প্রয়োগ করে এবং বরাবরই তারা প্রগতিকে ইসলাম ও ইসলামী জীবন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। তারা বলতে চায় ইসলাম সেকেলে ও পশ্চাদমুখী ধর্ম এবং এর অনুসারীদেরকে তারা ধর্মান্ধ বলে আখ্যায়িত করতে চায়। তারা সামাজিক পরিবর্তনকে এমনভাবে উপস্থাপনা করে যে, ইসলাম এই পরিবর্তনকে সমর্থন করে না। তাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের মস্তিস্কে এ ধারণা ঘোরপাক খেতেই পারে? কারণ তারা মনে করে যে, প্রগতির ধারণা উদ্ভব হয়েছে সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপে এবং পরিপূর্ণ রূপ লক্ষ্য করা যায় পরবর্তি শতাব্দিতে। উনবিংশ শতাব্দীর নৃবিজ্ঞানী ও সমাজ বিজ্ঞানীরা প্রগতির ধারণাকে পরিশীলিত আকারে প্রথম ব্যবহার করেন।
সে ইতিহাসে লেখা হয় যে, সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সাহিত্য এবং দর্শনে প্রচাীনপন্থী এবং নতুনদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। প্রাচীনপন্থীরা জ্ঞান এবং পান্ডিত্যের চরম উৎকর্ষ লক্ষ্য করেছিল অতীতের দিকে। অধুনাবাদী নতুনরা দৃষ্টি প্রসারিত করেছিল ভবিষ্যতের দিকে।
প্রগতির ধারণার মূল বক্তব্য হলো, জ্ঞান, বুদ্ধি এবং মানব জীবনযাত্রার ক্রমাগত উৎকর্ষ ও সমাজে নিরন্তর অগ্রগতি সাধন। আধুনিক প্রগতির ধারকরা সামাজিক পরিবর্তন বলতে বোঝায় সমাজব্যবস্থা, সমাজ কাঠামো বা সামাজিক আচরণে মৌলিক বা পুনরাবৃত্ত পরিবর্তন। সামাজিক পরিবর্তনকে বোঝার জন্য প্রয়োজন প্রগতি বিবর্তন ও উন্নয়নের অভিমত সম্পর্কে পরিচয় থাকা। প্রগতির শাব্দিক ও পারিভার্ষিক অর্থের দিক থেকে ইসলামের সাথে প্রগতির কোন দ্বন্ধ বা বৈরিতা নেই। ইসলামের সামাজিক পরিবর্তন ও উন্নতির ধারণা ও চিন্তা আরো উন্নত ও উচ্চ মানের। কারণ ইসলাম তা অনুসারীদের এই চিন্তা করতে বলে যে, মানুষকে শুধুমাত্র খাওয়া, পান করা, অর্থ সঞ্চয় করা ও জীবনের ভালো জিনিস উপভোগ করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। বরং এই অস্থায়ী বা ক্ষণস্থায়ী জীবনের পেছনে একটি চীরস্থায়ী ও অনন্ত জীবন রয়েছে। ঐ জীবনের বিধি ব্যবস্থা এখানে করে যেতে হবে। সেখানকার সুখের আসবাপত্র এখান থেকে এখনই সরবরাহ করতে হবে। এ জন্য তাকওয়াভিত্তিক জীবন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তাকওয়াভিত্তিক জীবনের জন্য চারিত্রিক সংশোধন একান্ত প্রয়োজন। চারিত্রিক সংশোধনের জন্য নিজেকে ক্রমাগত উন্নয়নের পথে অগ্রসর করতে হবে। এবং দৈনিক নিজেকে জান্নাতের কাছাকাছি আল্লাহর নৈকট্য লাভের কজাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। আল্লাহর দেয়া বাধ্যতামূলক কাজগুলোতে (ফরয) অবহেলা থাকলে অবিলম্বে সে ত্রুটি দুর করতে হবে। ফরযগুলো নিয়মিত করা হলে তাকে অতিরিক্ত স্বেচ্ছামূলক কাজ (নফল) ক্রমাগত যোগ করবেন। এভাবে সামাজিক অন্যান্য ভালো কাজ করে নিজের উন্নয়ন করে যেতে থাকবেন। এটিই ইসলামের প্রগতি। অর্থাৎ সরল পথে আলোর পথে তিনি নিজেকে ক্রমাগত উন্নয়নের উচ্চ শিখরে নিয়ে যাবেন।
রহমানের বান্দা যারা, সচেতন মুসলিম হিসাবে যারা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তারা ক্রমাগত উন্নতির দিকে অগ্রসর হয় এবং স্থবিরতা, থেমে যাওয়া বা পিছিয়ে পড়াকে মেনে নেয় না। সে সর্বদা সামনের দিকে তাকায়, পিছনের দিকে তাকায় না এবং তাদের আত্মা সর্বদা সর্বোচ্চের আকাঙ্খা করে, নিচের দিকে ফিরে আসে না। তারা অগ্রগতিকে পছন্দ করে, ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা একে অন্বেষণ করেন। তাদের বৃদ্ধিবৃত্তিক জীবনে প্রতিদিন নতুন নতুন জ্ঞানে অর্জন করতে আগ্রহী এবং এটি তাদের ব্যবসার মতো চলতে থাকে।
যখন তারা অধ্যয়ন করে, শিখে এবং জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। সারাজীবন তার শিরা-উপশিরায় এ জ্ঞানের প্রবাহ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ জ্ঞানের আলোকে তাদের চারিত্রিক সৌন্দর্য দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে অন্যের অধিকারের বিরুদ্ধে কঠোরতা, লোভ বা আগ্রাসন ছাড়াই তার আয় বাড়াতে এবং তাদের সমস্ত সামাজিক অবস্থার উন্নতি করতে থাকে। এ ছাড়াও মানুষের সাথে সামাজিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে এবং তাদের সাথে তাদের আচরণের উন্নতি করে।
এভাবে তারা উন্নতির ক্ষেত্রে পরিশীলিত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরিশীলিত ব্যক্তি হিসাবে তার যুগে শ্রেষ্ট ব্যক্তিতে পরিণত। পৃথিবীর সাধরণ প্রগতিশীল সমাজবিজ্ঞানীরদের ধারণা সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপে প্রগতির ধারণার উদ্ভদ হয়েছে এবং এর পরিপূর্ণ রূপ লক্ষ করা যায় পরবর্তী শতাব্দীতে। কিন্তু প্রকৃতিপক্ষে প্রগতির উন্নতি হয়েছে ১৫শত বৎসর পূর্বে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সা: শ্রেষ্ট প্রগতির সূচনা করেন। তিনি ২৩ বৎসরের অক্লান্ত পরিশ্রমে পৃথিবীর শ্রেষ্ট প্রগতিশীল সমাজ কায়েম করেন। তিনি মানুষের মন-মননে ‘আল্লাহ ও আখিরাতের ভয়’ জাগ্রত করার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। এ জন্য তিনি নেতিবাচক তথা উদ্যতভাব, খরগহস্ত ও কর্কষভাষী হননি। বরং তাঁর মনের সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে, একান্ত অকৃত্রিম হিতাকাংঙী সেজে ও অত্যন্ত কোমলভাবে মানুষকে বুঝিয়েছেন। যার স্বীকৃতি স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা এভাবে দিয়েছেনঃ “আপনি যে, কোমল হৃদয় হতে পেরেছেন, সে আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহেরই ফল।
কিন্তু আপনি যদি কঠিণ হৃদয় ও কর্কশভাষী হতেন তাহলে তারা সকলে আপনাকে ছেড়ে চলে যেত।” (সুরা আলে ইমরানঃ১৬) আল্লাহর পক্ষ থেকেও এ কৌশলই তাঁর প্রিয় বান্দাহকে অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “হে নবী, ভালো ও মন্দ কখনো সমান হতে পারে না। মন্দকে ভালো পন্থায় প্রতিরোধ করো। তখন দেখবে, তোমার সাথে যার শুত্রুতা, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে।(সুরা হা-মীম আস সেজদা-১৮) তাঁর প্রিয় রাসুলের প্রতি অবতীর্ণ প্রথম প্রথম আসমানী ফরমানগুলোর অধিকাংশই ছিল ‘আল্লাহ ও আখিরাতের ভয়’ সম্বলিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কী জীবনের আয়াতগুলো তার বাস্তব প্রমাণ। এ সমস্ত ফরমানের আলোকে তিনি বিশ্ববাসীকে প্রথমতঃ নৈতিকতা ও মানবতার চতুঃসীমার মধ্যে আবদ্ধ করার চেষ্ঠা করেন।
তিনি মানুষদেরকে তাওহীদ, রেসালাত, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং সমাজ কায়েমের আহবান জানাতেন।
আল কুরআনে অঙ্কিত আখিরাতের ভয়াবহ দৃশ্য উপস্থাপণ করতেন। পাশাপাশি চুরি, ব্যভিচার, সন্তান হত্যা. মিথ্যা বলা, রাহাজানি করা, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরানো প্রভৃতি কাজ থেকে বিরত রাখা ও তাদের মনে ঘৃণা জন্মানোর চেষ্টা করেন। তার লক্ষ্য ছিল আত্মার পবিত্রতা সাধন, মন মানসে মলিনতা, শোষণ এবং জৈবিক ও পাশবিক পংকিলতা সমুহ প্রক্ষালন করে মানুষের শ্রেষ্টত্বের মর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করা। এ লক্ষ অর্জনে প্রথমেই তিনি তরবারীর কাছে নয় বরং হেদায়াতের আলোর প্রয়োজনীয়তাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হাত, পা ও মাথাকে নত করার আগে মানুষের মনের ব্যকুলতার প্রয়োজনীয়তার অনুভব করেছেন। শারীরিক বশ্যতার আগে আত্মার আনুগত্যশীলতাকে উজ্জীবিত করেছেন। কারণ আল্লাহর ভয় যার মনকে বিচলিত করে না, মানুষের ভয় তাকে কিভাবে বিচলিত করবে? এভাবে তিনি পুরো সমাজকে প্রগতির উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত করেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে উন্নত চিন্তা, পবিত্র চরিত্র, পরিশীলিত আচরণ, নিরলস প্রয়াস, নিঃস্বার্থক, ত্যাগ-তিতিক্ষা, নিভীর্ক ও জ্ঞানের স্বচ্ছতা সম্পন্ন একদল মানুষ। ফলে অমানিশার ঘনঘোর অন্ধকারে উদিত হলো আদশের সুর্য। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠলো এক নতুন প্রগতিশীল সমাজ ও সভ্যতা।
প্রতিষ্ঠিত হলো মদীনা নামক ইসলামী রাষ্ট্র। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গড়া সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে গভীরভাবে মনোযোগ নিবদ্ধ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলোকিত মানুষ গড়ার কাজে মন দিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সা: প্রগতির মূর্ত প্রতীক, যিনি শান্তি, মুক্তি, ন্যায়বিচার ও সামগ্রীক কল্যাণের বার্তা নিয়ে এসেছিলেন; তিনি শুধু একজ ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং একজন রাষ্ট্রনায়ক, সমরনায়ক ও সমাজ সংস্কারক হিসেবেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের এনেছিল, কুসংস্কার ভেঙেছিল এবং একটি উন্নত ও সুশৃংখল সমাজ গঠন করেছিল, যা বিশ্ব প্রগতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
Posted ১:১৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh