বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

প্রত্যন্ত গ্রামের নারীদের তৈরি জুতা আসছে ইউরোপ-আমেরিকায়

ঢাকা :   |   শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রত্যন্ত গ্রামের নারীদের তৈরি জুতা আসছে ইউরোপ-আমেরিকায়

ব্লিং লেদার প্রোডাক্টসের কারখানায় রপ্তানির জুতা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পারছেন নারী শ্রমিকেরা। কারখানাটির শ্রমিকের ৮০ শতাংশই গ্রামীণ নারী। সম্প্রতি রংপুরের তারাগঞ্জের ঘনিরামপুর গ্রামে কারখানা থেকে তোলা। ছবি : সংগৃহীত

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোঃ হাসানুজ্জামান

একসময় দারিদ্র্য ও অভাব ছিল রংপুরের তারাগঞ্জের ঘনিরামপুর গ্রামের মানুষের নিত্যসঙ্গী। দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্ত হতে এই গ্রামের পুরুষেরা ঘর ছেড়ে যেতেন কাজের খোঁজে। আর নারীরা ছিলেন ঘরের চারদেয়ালে বন্দি। সেই দৃশ্য এখন বদলে গেছে।

রাষ্ট্রীয় নানা উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতের নানা উদ্যোগে বদলে গেছে মঙ্গাকবলিত একসময়কার রংপুরের মানুষের জীবন। কয়েক বছর ধরে জেলার তারাগঞ্জের ঘনিরামপুর গ্রামের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছে ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস নামের রপ্তানিমুখী একটি জুতার কারখানা। এই গ্রামের হাজারো নারীর জীবন বদলে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ঘনিরামপুর গ্রামের নারীদের তৈরি জুতা এখন রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ–আমেরিকায়।

তাতেই গ্রামের এসব নারীর জীবনযাত্রা বদলাতে শুরু করেছে। তারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের পাশে ঘনিরামপুর গ্রামে সাড়ে ৯ একর জমির ওপর জুতার এই কারখানা গড়ে তোলেন দুই ভাই মো. হাসানুজ্জামান ও মো. সেলিম। মো. সেলিম এরই মধ্যে প্রয়াত হয়েছেন। কারখানাটিতে দুই ভাই মিলে বিনিয়োগ করেন প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা। উত্তরের জেলা নীলফামারী সদরের বাবুপাড়ায় তাঁদের বাড়ি। দুই ভাই–ই ছিলেন একসময় প্রবাসী। আশির দশকে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। সেখানে তাঁরা গড়ে তোলেন আবাসন ব্যবসা। সফলও হন। এরপর দেশে বিনিয়োগের চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকেই ২০০৯ সালে নীলফামারীতে এবং ২০১২ সালে রংপুরের মিঠাপুকুরে স্থাপন করেন হিমাগার। এরপর ২০১৭ সালে তারাগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেন রপ্তানিমুখী জুতার কারখানা ব্লিং লেদার।

ব্লিং লেদার প্রোডাক্টসের কারখানায় রপ্তানির জুতা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পারছেন নারী শ্রমিকেরা। কারখানাটির শ্রমিকের ৮০ শতাংশই গ্রামীণ নারী। সম্প্রতি রংপুরের তারাগঞ্জের ঘনিরামপুর গ্রামে কারখানা থেকে তোলা। ছবি : সংগৃহীত

এ কারখানায় ইতিমধ্যে প্রায় তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। দুই ভাইয়ের উদ্যোগে কারখানাটি গড়ে তোলার দশক না পেরোতেই ২০২৩ সালে বড় ভাই মো. সেলিম বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। বর্তমানে হাসানুজ্জামান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি সরেজমিনে কারখানা পরিদর্শনকালে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকলেও বড় ভাইয়ের ইচ্ছা ছিল দেশে কিছু করবেন। সেই ইচ্ছা থেকে দেশে ব্যবসার পাশাপাশি শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তাঁরা।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ব্লিং লেদারের তিনটি ইউনিটে পুরোদমে চলছে জুতা তৈরির কাজ। মেশিন ও সেলাইযন্ত্রের শব্দে পুরো এলাকা মুখর। মেশিনের সঙ্গে সমানতালে চলছে কর্মীদের হাত। কারখানার প্রতিটি সারিতে সুপারভাইজাররা ঘুরে ঘুরে কাজের মান তদারক করছেন। এই কারখানার শ্রমিকদের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। তাই নারীদের কাজ তদারকির জন্য নারী সুপারভাইজার নিয়োগ দিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিক কল্যাণ কর্মকর্তা জেসমিন আরা জানান, কারখানার বেশির ভাগ শ্রমিক স্থানীয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নারী। কারখানাটি গড়ে ওঠার পর এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ বেকারত্ব দূর হয়েছে। শ্রমিকদের বেশির ভাগ নারী হওয়ায় নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।

কারখানার কাটিং ইউনিটের শ্রমিক ভানু রানী বলেন, ‘শুরুতে মনে হতো কারখানার কাজ কঠিন হবে; কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই দেখলাম কাজে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। গ্রামে বসেই এখন আয় করছি। এই আয় শুধু নিজের জন্য নয়, ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করি।’ কারখানাটির প্যাকেজিং ইউনিটের শ্রমিক রংপুরের শাহবাজপুর এলাকার বাসিন্দা আদুরি রানী বলেন, ‘আগে ঢাকায় কাজ করতাম। সকালে বের হয়ে রাতে বাড়ি ফিরতাম। যা আয় করতাম, তা বাসাভাড়া আর খাওয়াদাওয়াতেই শেষ। এখন নিজের গ্রামে ফিরে এসেছি। কাজ শেষে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ঘরের কাজও করতে পারি। পরিবারকে সময় দিতে পারি। আয়ের একটা অংশ দিয়ে বাড়িতে গরু–ছাগল পালন শুরু করেছি।’ সরেজমিনে আলাপকালে কারখানাটিতে কর্মরত ঘনিরামপুর গ্রামের শ্রমিক লাভলী বেগম বলেন, ‘এই কারখানা হওয়ার আগে ধারদেনা, এনজিওর ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হতো। এরপর প্রথম এখানে প্রশিক্ষণ নিতে আসি, সেখান থেকে কাজ শুরু।

এখন ধারদেনা তো করতেই হয় না, বরং প্রতি মাসে কিছু সঞ্চয়ও করছি। শুধু আমি না, এলাকার নারীরা এখন কমবেশি সবাই আয় করছে এই কারখানার বদৌলতে। তাতে পরিবারে নারীদের সম্মানও বেড়েছে। এটাই আমাদের বড় পাওয়া।’ কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে অন্তত ৫১০ জন আগে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করতেন। কারখানাটি চালু হওয়ার পর তাঁরা সেসব কাজ ছেড়ে নিজ এলাকায় ফিরে এসেছেন। শুরু থেকে ন্যূনতম মজুরিকাঠামো মেনেই শ্রমিকদের বেতন–ভাতা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। নারী শ্রমিকদের জন্য রয়েছে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা। নতুন কর্মীদের নির্দিষ্ট মেয়াদের প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণকালীন ভাতা প্রদান করা হয়, যার মাধ্যমে অদক্ষ শ্রমিকেরা ধীরে ধীরে দক্ষ কর্মী হয়ে উঠছেন। কারখানাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রতিষ্ঠানটি মূলত সিনথেটিক জুতা উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করছে। বর্তমানে দুটি ইউনিটে পুরোদমে উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। নতুন আরেকটি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা করছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

রপ্তানি কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পর দেশের বাজারে জুতা সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি রূপালী ব্যাংকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সম্প্রতি কারখানাটি পরিদর্শন করেন প্রধান উপদেষ্টার অর্থনৈতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী। ব্লিং লেদারের নির্বাহী পরিচালক মো. রেহান বখত জানান, কারখানাটি শতভাগ রপ্তানিমুখী। তারাগঞ্জে উৎপাদিত জুতা বর্তমানে রপ্তানি হচ্ছে পোল্যান্ড, তুরস্ক, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। গুণগত মান নিশ্চিত করতে এই কারখানায় বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল্লাহ আল ফারুক সরকার বলেন, ‘কারখানাটির বর্তমান দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১০ হাজার জোড়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী কারখানাটির সম্প্রসারণ হলে ৩৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে, যার ৮০ শতাংশই হবে নারী।’ ঘনিরামপুর বেলতলী বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আল-আমিন বলেন, ব্লিং লেদারের কারখানা চালুর পর থেকে বাজারটি সব সময় জমজমাট থাকে।

এলাকার মানুষের আয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারের বিভিন্ন দোকানপাটের বেচাকেনাও কয়েক গুণ বেড়েছে। জানতে চাইলে স্থানীয় কুশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল হক বলেন, ব্লিং লেদার কারখানাটি প্রমাণ করেছে—সঠিক বিনিয়োগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে গ্রামেও শিল্পায়ন সম্ভব। ব্লিং লেদার শুধু জুতা তৈরি করছে না, এই এলাকার মানুষের আত্মমর্যাদা, স্বপ্ন আর সম্ভাবনার নতুন অধ্যায় রচনা করছে। কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘বিদেশে থেকেও গ্রামের মানুষের কথা ভাবতেন আমার ভাই। নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। সে জন্য গ্রামে এই কারখানা গড়ে তুলেছেন। আমরা কারখানাটিকে আরও বড় করতে চায়। দৈনিক ৫০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। রপ্তানির পাশাপাশি দেশের বাজারেও ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’

Posted ৯:৫৮ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.