জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৪
মাজলুম যেনো জালিম না হয় আর জালিম যেনো মাজলুম না হয়। মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি, পদ-পদবী ও চেহেরা কারো কাছে চীর জীবন থাকে না। এটি প্রকৃতির মতো রং বদলায়। শরতের প্রকৃতি সবদিক যেমন সবুজ-শ্যামল দেখা যায় তেমনি কখনো দেখা যায় যে সবুজের সমারোহ তিরোহিত হয়ে পাতা ঝরার মওসুমও আসে। কিন্তু যারা হঠাৎ দু:খ-বেদনা ও মাজলুম অবস্থা থেকে উন্নতি লাভ করে এবং ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক হয়ে অহংকার শুরু করে দেয় ও নিজেকে জালিমের ভুমিকায় নিয়ে যায়। সে যে একদিন মাজলুম ছিল সে কথা বেমালুম ভুলে যায়।
এ সমস্ত লোকের জীবনে আবার পাতা ঝরার মওসুম খুব দ্রুত চলে আসে। যারা সত্যিকারের মুসলিম তারা উভয় অবস্থায় সৎকাজ করে এবং ধৈর্যধারণ করে। উভয় অবস্থায় তারা কখনো হতাশ হয় না এবং অহংকারও করে না। এদের জন্যই রয়েছে ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আমি মানুষকে নিজের অনুগ্রহভাজন করার পর আবার কখনো যদি তাকে তা থেকে বঞ্চিত করি তাহলে সে হতাশ হয়ে পড়ে এবং অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ ঘটাতে থাকে। আর যদি তার ওপর যে বিপদ এসেছিল; তারপর আমি তাকে নিয়ামতের স্বাদ আস্বাদন করাই তাহলে সে বলে, আমার সব বিপদ কেটে গেছে। তখন সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে এবং অহংকার করতে থাকে। এ দোষ থেকে একমাত্র তারাই মুক্ত যারা সবর করে এবং সৎকাজ করে আর তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদানও।”(সুরা হুদ:৯-১১)
আজ আমি মাজলুম,কাল যদি মহান আল্লাহ আমার এই অবস্থা থেকে মুক্তি দেন আর সাথে সাথে জালিমের ভুমিকায় অবতীর্ণ হই, তাহলে এতদিন যারা জুলুম করেছে, তাদেরকে আবার ক্ষমতায় নিয়ে আসতে পারেন। কারণ ‘নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের ওপর শক্তিশালী।” ক্ষমতার প্রকৃত মালিক আল্লাহ তা’আলা। তিনি যাকে চান ক্ষমতার সামান্য দান করেন। কিন্তু মানুষের ক্ষমতা অস্থায়ী একটি বিষয়। এটি কারো মধ্যে স্থায়ীভাবে অবস্থান করে না। আজ আপনি বিশাল ক্ষমতার অধিকারী, কাল ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “বলো: হে আল্লাহ! বিশ্বজাহানের মালিক! তুমি যাকে চাও রাষ্ট্রক্ষমতা দান করো এবং যার থেকে চাও রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নাও। যাকে চাও মর্যাদা ও ইজ্জত দান করো এবং যাকে চাও লাঞ্জিত ও হেয় করো। কল্যাণ তোমার হাতেই নিহিত। নিসন্দেহে তুমি সবকিছুর ওপর শক্তিশালী।”(সুরা: আলে ইমরান:২৬) ক্ষমতা স্থায়ীভাবে একমাত্র আল্লাহ তা’আলার মধ্যে অবস্থান করে। আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহ হলো, তিনি ‘কাদির’ সর্বশক্তিমান। “নিশ্চয়ই আল্লাহ সব জিনিসের ওপর শক্তিমান।”(সুরা ফাতির:১) তিনি ‘আজিজ’ মহাপরাক্রমশালী,“তিনি মহাপরাক্রমশালী ও অতিশয় বিজ্ঞ।”(সুরা হাদীদ:১) তিনি ‘জব্বার’ মহাশক্তিধর,“আল্ল¬াহকে ভয় করো। আল্ল¬াহ কঠোর শাস্তি দাতা।”(সুরা হাশরঃ ৭) তিনি ‘আযিম’ মহান, “মুলত তিনিই এক মহান ও শ্রেষ্ট সত্তা।”(সুরা বাকারাঃ২৫৫) তিনি ‘কাবির’ অতীব মহান,“তোমার রবের শ্রেষ্টত্ব ঘোষনা করো।”(সুরা মুদ্দাস্সির:৩) তিনি ‘কাবিয়্যু’ মহা শক্তিধর,“প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মহাশক্তি ও পরাক্রমশালী।”(সুরা মুজাদালাহঃ২১) তিনি ‘মাতীন’ দৃঢ় শক্তির অধিকারী,“আল্লাহ নিজেই রিযিকদাতা এবং অত্যন্ত শক্তিধর ও পরাক্রমশালী।”(সুরা যারিয়াতঃ ৫৮) তিনি ‘মুকতাদির মহাক্ষমতাবান,“অবশেষে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম। যেভাবে কোন মহা-পরাক্রমশালী পাকড়াও করে।”(সুরা ক্বামারঃ৪২) “আর হে নবী! দুনিয়ার জীবনের তাৎপর্য তাদেরকে উপমার মাধ্যমে বুঝাও যে, আজ আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করলাম, ফলে ভূ-পৃষ্ঠের উদ্ভিদ খুব ঘন হয়ে গেলো আবার কাল এ উদ্ভিদগুলোই শুকনো ভূষিতে পরিণত হলো, যাকে বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়।
আল্লাহ সব জিনিসের ওপর শক্তিশালী।”(সুরা আল কাহ্ফঃ৪৫)।
মহান আল্লাহ তা’আলা দুনিয়াতে সবাইকে কিছু কিছু ক্ষমতা দান করেন। এই ক্ষমতা কিছু লোকের জন্য আল্লাহর রহমত হিসাবে আবির্ভুত হয় আবার কিছু লোকের জন্য ধ্বংসের কারণ হয়। যারা ক্ষমতার যথার্থ ব্যবহার করে, ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে, অধিনস্ত মানবতার প্রতি সুবিচার ও ন্যায্য আচরণ করে সর্বোপুরি মানবতার কল্যাণের নিমিত্তে ক্ষমতাকে ব্যবহার করে তাদের জন্য ক্ষমতা আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসাবে দেখা দেয়। দুনিয়া ও আখিরাতে এদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সীমাহীন মর্যাদা ও সম্মান। কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে যখন আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া কোন ছায়া থাকবে না, সেই দিন সাত ব্যক্তি আরশের ছায়াতলে স্থান পাবেন, হাদীসের ভাষায় তাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হলেন, ‘ন্যায়পরায়ণ শাসক’। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার কোন জালিমকে আল্লাহ তা’আলা কখনো পছন্দ করেন না। আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এ ধরনের জালিমকে না পছন্দের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রকার হলো, যারা একটু ক্ষমতার অধিকারী হয়ে অহংকার শুরু করে, মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করে, যেখানে সেখানে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে, ক্ষমতার দাপুটে মানুষ অতিষ্ট হয়ে উঠে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্ষমতার একটি বলয় তৈরী করে। এই বলয়ের প্রভাবে সুখে দু:খে মানুষ তাদের অবস্থার কথা ব্যক্ত করতে পারে না। চারদিকে জুলম আর জুলুম চলতে থাকে। তখন তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে। আবু সাঈদ রা: থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সা: বলেন, ন্যায়পরায়ণ শাসক তথা ক্ষমতার যথার্থ ব্যবহারকারী কিয়ামতের দিন আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় এবং সর্বাধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত হবেন। আর অত্যাচারী শাসক আল্লাহর কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত ও সর্বাধিক শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। অধিকন্তু সে আল্লাহর দরবার থেকেও বহুদূরে অবস্থান করবে।(তিরমিযি:১৩৭৯)
সুতরাং কেউ শাসন ক্ষমতা বা অন্য কোন দায়িত্ব পেলে অহংকার বা বড়াই না করে পূর্ণ আমানতদারিতার সাথে ক্ষমতার প্রয়োগ করতে হবে। কেউ যাতে জুলুমের শিকার না হয় সে দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। যার যা প্রাপ্য তাকে তা বুঝিয়ে দিতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কারো অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে পরকালে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। ক্ষমতার সুযোগ গ্রহণ করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বা প্রভাব খাটিয়ে অন্যায়ভাবে স্বার্থ হাসিল করা ক্ষমতার সুস্পষ্ট অপব্যবহার। ক্ষমতা বা পদ-পদবী ব্যবহার করে অন্যায়ভাবে জনগণ ও রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করে সম্পদের পাহাড় গড়া অন্যায় ও জুলুম। বুখারীর এক দীর্ঘ হাদীসে রাসুলুল্লাহ সা: এ ধরণের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির অন্যায় উপার্জন সম্পর্কে বলেছেন, যে, “সে তার পিতার বা মাতার ঘরে বসে থেকে দেখে না কেন, তাকে উপহার দেয়া হয় কি না?”
মহান আল্লাহ তা’আলা অনেককে কিছু না কিছু ক্ষমতা দান করে থাকেন। যারা বুদ্ধিমান তারা এই ক্ষমতাকে মানবতার কল্যাণের নিমিত্তেই ব্যয় ও ব্যবহার করেন। আর যারা নির্বোধ কেবলমাত্র তারাই ক্ষমতার অপব্যবহার করে। ক্ষমতার অপব্যবহার করা সুস্পষ্ট জুলুম। ক্ষমতা আর শক্তি চিরকাল থাকে না। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং সময় থাকতে নিজেদেরকে শুধরে নেয়া। সময়ের আবর্তে পৃথিবীর কত দুর্দণ্ড প্রতাপশালী স্বৈরাচার ও লৌহমানবকে দেখেছি, শুনেছি, তাদের ইতিহাস পড়েছি, তারা আজ কোথায়? পৃথিবীর ইতিহাস তাদের সাথে কি আচরণ করছে তাও দৈনন্দিন আমরা প্রত্যক্ষ করে চলেছি। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন,আবু মুসা আশআরী রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্ল¬াহ তা’আলা জালিমকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন।
অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেন না। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেনঃ তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি জুলুমরত জনপদ সমুহকে পাকড়াও করেন। তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রনাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য।” সুরা হুদ:১০২।(বুখারী:৪৬৮৬,কিতাবুত তাফসীর, বাবু কাউলি তা’আলা সুরা হুদ:১০২…….আ.প্র:৪৩২৫, ইফা:৪৩২৬ মুসলিম, তিরমিযি) আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেন,“কেউ যদি তার কোন ভাই-এর সম্মানহানি কিংবা কোন জিনিসের ক্ষতি করে থাকে, তবে আজই তার কাছ থেকে তা বৈধ করে নেয়া উচিত এবং সেই ভয়াবহ দিন আসার আগেই এটা করা উচিত, যে দিন টাকাকড়ি দিয়ে কোন প্রতিকার করা যাবে না, বরংতার কাছে কোন নেক আমল থাকলে তার জুলুমের পরিমাণ হিসাবে মজলুমকে সেই নেক আমল দিয়ে দেয়া হবে এবং অসৎ কাজনা থাকলেও উক্ত মজলুমের অসৎ কাজ তার ওপর বর্তাবে।” (বুখারী:২৪৪৯,কিতাবুল মাজালিম, বাবু মান কানাত লাহু মাজলামাতুন……আ.প্র.২২৭০,ইফা:২২৮৭, তিরমিযি) আবু যার গিফারী রা: থেকে বর্ণিত। একটি হাদিসে কুদসীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,“আল্ল¬াহ তা’আলা বলেছেন,“হে আমার বান্দারা ! আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পরের ওপর জুলুম করোনা।”(মুসলিম:৬৩৩৮ (ইফা), কিতাবুল বির্রি ওয়াস সিলাহ ওয়াল আদাব, বাবুত তাহরিমিজ জুলমি)
Posted ১:৪৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh