জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন ২০২৫
দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আখিরাতে মুক্তির জন্য মানুষকে অবশ্যই ভালোবাসতে হবে। আপনার জন্মের স্বার্থকতা মানবতার কল্যাণে নিহিত। কারণ আপনাকে সৃষ্টিই করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তোমরাই কল্যাণকামী জাতি, তোমাদের (দুনিয়ায়) আনা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য।”(সুরা আলে ইমরান:১১০) ভালবাসা আল্লাহর দেয়া এক বিশেষ দান। দুনিয়াতে মানুষকে ভালবাসা মানুষের মানবিকতা থেকে উদগত হয়। এই মানবিকতা সৃষ্টি হয় মানবিক মূল্যবোধ থেকে। যার বিবেক মানবিক মূল্যবোধে উদ্ভুদ্ধ হয় না মনে করতে হবে আল্লাহ তাকে ভালবাসেন না। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“অনুগ্রহ প্রদর্শনের পথ অবলম্বন করো, কেননা আল্লাহ অনুগ্রহ প্রদর্শনকারীদেরকে ভালোবাসেন।(সুরা বাকারা:১৯৫) ইসলাম মানুষের ভালবাসাকে ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত করে দিয়েছে।
অর্থাৎ যিনি মানুষকে ভালবাসেন ন্ াতার ঈমানের মধ্যে ত্রুটি রয়েছ্। ঈমানের পরিপূর্ণতার জন্য অবশ্যই মানুষকে ভালবাসতে হবে। যেমন: আনাস রা: থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সা: বলেছেন: তিনটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে রয়েছে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করবে। (১) অন্য সবার তুলনায় যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অধিক প্রিয়। (২) যে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তার বান্দাকে ভালোবাসে। (৩) এবং যাকে আল্লাহ কুফর থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তারপর সে কুফরের দিকে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করে যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে । (মুসলিম:৬৯, আন্ত. নাম্বার:৪৩, কিতাবুল ঈমান, ইফা:৭১, ই.সে.৭৩) সুতরাং ঈমানের পরিপূর্ণতার জন্য মানুষকে ভালবাসতে হবে। কারণ সকল মু’মিনগণ একটা দেহের মতো। যেমন: ন’ুমান ইবনে বশীর রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: সমস্ত মুসলিম এক ব্যক্তির মত। যদি তার চক্ষু পীড়িত হয় তবে তার সমগ্র দেহ অসুস্থ হয়ে পড়ে। যদি তার মাথা অসুস্থ হয় তাহলে সমগ্র শরীরই অসুস্থ হয়ে পড়ে।(মুসলিম:৬৩৫৩ ই.ফা, কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাহ ওয়াল আদাব, বাবু তারাহুমিল মু’মিনিন……..) আবু ইমামাহ রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কাউকে ভালবাসে, আর আল্লাহর জন্য কারও সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে এবং আল্লাহর জন্যই দান-খয়রাত করে আবার আল্লাহর জন্যই দান-খয়রাত থেকে বিরত থাকে সে যেন ঈমান পুর্ণ করল।(আবু দাউদ, মিশকাত ও সহীহাহ)
সব মানুষের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা ইসলামের দাবী। কারণ সকলেই এক আদমের সন্তান। তাই সকলের প্রতি উদার মনোভাব, মানবীয় আচরণ প্রদর্শন করা ইসলামের শিক্ষা। জারীর ইবনে আবদুল্লাহ রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সা: বলেছেন, যে (সৃষ্টির প্রতি) দয়া কওে না, (আল্লাহর পক্ষ থেকে) তার প্রতি দয়া করা হয় না।। (বুখারী:৬০১৩, কিতাবুল আদাব, বাবু রাহমাতিন নাসি ওয়াল বাহায়িম, বুখারী:৭৩৭৬, মুসলিম:২৩১৯, আ.প্র:৫৫৭৯, ইফা:৫৪৭৫) কোন মুসলমানকে ভালবাসার কারণে তার সাথে দেখা-সাক্ষাতের ফলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। আবু হুরাইরা রা: হতে বর্ণিত যে, নবী সা: বলেছেন, এক ব্যক্তি তার ভাইয়ের সাক্ষাতের জন্য অন্য এক গ্রামে গেল।
আল্লাহ তা’আলা তার জন্য পথিমধ্যে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করলেন। সে ব্যক্তি যখন ফেরেশতার কাছে পৌঁছল, তখন ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছো? সে বলল, আমি এ গ্রামে আমার এক ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য যেতে চাই। ফেরেশতা বললেন, তার কাছে কি তোমার কোন অবদান আছে, যা তুমি আরো প্রবৃদ্ধি করতে চাও? সে বলল, না। আমি তো শুধু আল্লাহর জন্যই তাকে ভালবাসি। ফেরেশতা বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার কাছে অবহিত করার জন্য এসেছি যে,আল্লাহ তোমাকে ভালবাসেন, যেমন তুমি তোমার ভাইকে তারই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ভালবেসেছো।(মুসলিম:৬৪৪৪৩, আন্ত. নাম্বার:২৫৬৭, কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাহ ওয়াল আদাব, বাবু ফি ফাদলিল হুব্বে ফি’আল্লাহ, ইফা: ৬৩১৬, ই.সে:৬৩৬৬)
মু’মিনদের ভালবাসার দ্বারা আল্লাহর সাহায্য লাভ করা যায়। মু’মিনদের ভালবেসে তার কোন সাহায্যে এগিয়ে এলে আল্লাহ তার জন্য অনুরূপ সাহায্য নিয়ে হাযির হন। আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: যে ব্যক্তি কোন মু’মিনের দুনিয়ার বিপদসমূহের কোন বিপদ দূর করে ;িবেন। যে ব্যক্তি কোন অভাবগ্রস্থ লোকের অভাব সহজ করে দিবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার অভাব সহজ করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন করে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ততক্ষণ পর্যন্ত সহযোগীতা করেন যতক্ষণ সে তার অপর ভাইয়ের সাহায্য রত থাকে।(মুসলিম: ৬৭৪৬, আন্ত. নাম্বার: ২৬৯৯, কিতাবুয যিকরে ওয়াল ইসতেগফার ওয়াত তাওবা ওয়াদ দুয়া, বাবু ফাযলিল ইযতিমা….. ইফা:৬৬০৮, ই.সে: ৬৬৬১)
একে অপরের প্রতি ভালবাসা আল্লাহর একটি বড় ধরনের নিয়ামত। পরস্পর শত্রুতা হলো জাহেলিয়াতের বৈশিষ্ট্য। কেউ যদি কারো প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, তাহলে তার মধ্যে জাহেলিয়াতের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান বলে ধরে নেয়া হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রুজ্জু মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পারস্পরিক বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে নিয়ামত দান করেছেন সে কথা স্মরণ রেখো। তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্রু। তিনি তোমাদের হৃদয়গুলো জুড়ে দিয়েছেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহ ও মেহেরবানীতে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেছো। তোমরা একটি অগ্নীকুণ্ডের কিনারে দাঁড়িয়ে ছিলে। আল্লাহ সেখান থেকে তোমাদের বাঁচিয়ে নিয়েছেন।
এভাবেই আল্লাহ তাঁর নিদর্শনসমূহ তোমাদের সামনে সুস্পষ্ট করে তুলেন। হয়তো এই নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে তোমরা নিজেদের কল্যাণের সোজা সরল পথ দেখতে পাবে।”(সুরা আলে ইমরান:১০৩) ইসলামের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো, একতা ও ঐক্য। আর এই একতা ও ঐক্য সৃষ্টি হয় পারস্পরিক ভালোবাসা থেকে। আয়াতে শেষে বল্ াহয়েছে যে, “ হয়তো এই নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে তোমরা নিজেদের কল্যাণের সোজা সরল পথ দেখতে পাবে।” এই কল্যাণ পথ শতভাগ নির্ভর করে মু’মিনদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা থেকে। যে সমাজে মু’মিনগণ পারস্পরিক অনৈক্যে জর্জড়িত এবং শতধা বিভক্ত, সে সমাজ কখনো কল্যাণের পথ পায় না। বর্তমান পৃথিবীর মুসলমানদের দুর্দশা ও লাঞ্জনা শুধুমাত্র অনৈক্যের কারণে। এ থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো, পারস্পরিক ভালবাসা ও নিজেদের বুনিয়ানুম মানচুচ গড়ে তোলা।
মু’মিনদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা আল্লাহ তা’আলাই সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। ভ্রাতুত্ব, স্নেহ, প্রীতি ভালবাসা সৃষ্টি করে মহান আল্লাহ মু’মিনদেরকে একটি শক্তিশালী দলে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা: এর পরবর্তি তাঁর উম্মতগণ সেই ভালোবাসা ছিন্ন করে পরস্পর দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়। মুসলিম শাসকগণ তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কুফফার শক্তির দ্বারস্থ হয়। ফলে সারা দুনিযায় এখন তারা করুণার পাত্রে পরিণত হয়ে পড়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“এবং মু’মিনদের অন্তর পরস্পরের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। তুমি সারা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ ব্যয় করলেও এদের অন্তর জোড়া দিতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাদের অন্তর জুড়ে দিয়েছেন। অবশ্যি তিনি বড়ই পরাক্রমশালী ও জ্ঞানী।”(সুরা আনফাল:৬৩) এই ঐক্যে কে ফাটল ধরালো? এই ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে শয়তান।
মু’মিনদের মধ্যে ভালবাসা যাতে চির না ধরে সে জন্য ভালোবাসা বিনষ্টকারী বিষয়সমুহকে কবীরাহ গুনাহের অন্তরভূক্ত করা হয়েছে। যেমন: ঝগড়া-ফাসাদ, গালি-গালাজ, গিবত, হিংসা-বিদ্বেষ ও কুটনামী সবগুলো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি বলা হয়েছে মু’মিনদের মাঝে কোন কারণে ফাটল ধরে, তাহলে তা জুড়ে দেয়ার জন্য তাগিদ করা হয়েছে। এটি আল্লাহর নির্দেশিত ফরয বিধান। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ঈমানদারদের মধ্যকার দু’টি দল যদি পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।”(সুরা হুজরাত: ৯) কোন অজুহাতেই মু’মিনদের পরস্পরের মধ্যে বিভাজন করা যাবে না এবং পরস্পরের ভালবাসা নষ্ট করা যাবে না। তাদেও মধ্যে শত্রতা বা ঘৃণা সৃষ্টি করা যাবে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ: বলেন,‘ মু’মিনের জানা দরকার যে, মু’মিনকে ভালোবাসা ওয়াজিব, যদিও সে তোমার প্রতি জুলুম-অবিচার করে। পক্ষান্তরে কাফেরের সাথে সম্পর্কহীতা বজায় রেখে চলা ওয়াজিব যদি সে তোমাকে কিছু দেয় ও তোমার প্রতি দয়া অটুট রাখার জন্য করে।’
Posted ১২:৫৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh