বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

মানুষের নাফসের প্রকারভেদ

জাফর আহমাদ :   |   বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

মানুষের নাফসের প্রকারভেদ

নাফস: আরবী শব্দ। শাব্দিক অর্থ আত্ম, মন, প্রবৃত্তি, স্বয়ং ইত্যাদি। মানব দেহের একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বস্তুু। যা কখনো চুখে দেখার বস্তু নয়, অনুভবেই তার অস্তিত্ব, যাহা মানব দেহে ‘আমি’ রূপে পরিচিত। ফারসীতে যাকে খুদী বলা হয়।

আল্লাহ তা’আলা বলেন,“নি:সন্দেহে সফল হয়ে গেছে সেই ব্যক্তি যে তার নফসপরিশুদ্ধ করেছে এবং যে তাকে দাবিয়ে দিয়েছে সে ব্যর্থ হয়েছে।”(সুরা আশ শামস:৯-১০)আল কুরআনুল কারীমে মানুষের নফসের তিনটি রূপ উল্লেখ করা হয়েছে। ১, “নাফসে আম্মারা” ২. “নাফসে লাউয়ামাহ” ও ৩, “নাফসে মুতমাইন্না”। নীচে প্রতিটি নাফসের বিস্তারিত বর্ণনা প্রদান করা হলো:

এক, “নাফসে আম্বারা”: এটি এমন একটি “নফস” যা মানুষকে সর্বদা মন্দ কাজে প্ররোচিত করে এবং মানুষকে কামনা-বাসনার দিকে ধাবিত করে। এক কথায় একে ‘প্রতারক আত্মা’ বলে অভিহিত করা যায়।যে নফস মানুষকে কুপ্রবৃত্তি ও জৈবিক কামনার দিকে আকৃষ্ট করে। এটি শয়তানের প্ররোচনার একটি উৎস। কারণ এটি মানুষকে কুপ্রবৃত্তি ও পাপের দিকে পরিচালিত করে। এই নফনের কারণে মানুষ তার কামনা-বাসনা ও প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয় এবং উসলামে নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে। আখিরাতের শাস্তি সম্পর্কে কোন পরোয়া সে করে না। নাফসে আম্মারা এর উল্লেখ রয়েছে সুরা ইউসুফে। আল্লাহ তা’আলা বলেন.“আমি নিজের নফসকে দোষমুক্ত করছি না। নফস তো খারাপ করতে প্ররোচিত করে,তবে যদি কারোর প্রতি আমার রবের অনুগ্রহ হয় সে ছাড়া। অবশ্যি আমার রব বড়ই ক্ষমাশীল ও মেহেরবান।”(সুরা ইউসুফ: ৫৩)

নফসে আম্মারার আরো কথা হলো, এই নফস ব্যক্তিকে এমনভাবে বশীভূত করে যে ব্যক্তির নিজের ওপর কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তার প্রবৃত্তি যা আদেশ করে সে তাই-ই সম্পাদন করে,এর ওপর শয়তানের প্রবল প্রভাব বিরাজমান থাকে। নফস তাকে নাকে বরশী লাগিয়ে যেদিকে মন চায় তাকে ঘুরিয়ে আনতে পারে।

ফলে এ নফস ব্যক্তিসত্তার দ্বারা সব ধরনের অন্যায়,অপকর্ম ও মন্দ কাজ করিয়ে নেয়। এগুলো যে যে খারাপ কাজ তা কখনো তার উপলব্ধিতে আসে না। সত্যিকারার্থে তার উপলব্ধি ক্ষমতাকে শয়তান নষ্ট করে দেয়। সোজা কথায় নফসে আম্মারায় আবেষ্টিত ব্যক্তিসত্তার মধ্যে এমন একটা মনোভাব থাকে যে, পাপ আবার কি? নফসে আম্মারাধারী ব্যক্তি মৃত্যুর পর যে পুনরুত্থিত হয়ে শেষ বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, তা যেন সম্পুর্ণ বিস্মৃত হয়ে থাকে। খাও-দাও ফূর্তি ও মাস্তিই হলো, তার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। ভালো-মন্দ যাচাই-বাচাই করার সময় নেই, দুহাতের সামনে যা পাও তাই লুটে নাও। এতে কে মরলো কে বাঁচলো, পরিবেশের কি ক্ষতি হলো তা দেখার সময় নেই।

দুই,“নাফসে লাউয়ামাহ”: এটি এমন একটি “নাফস” যা ভুল বা অন্যায় করলে অথবা ভুল বা অন্যায় বিষয়ে চিন্তা করলে কিংবা খারাপ নিয়ত রাখলে লজ্জিত হয় এবং সে জন্য নিজেকে তিরস্কার ও ভৎর্সনা করে। আধুনিক পরিভাষায় যাকে আমরা বিবেক বলে থাকি। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আর না, আমি শপথ করছি তিরস্কারকারী নফসের।”(সুরা কিয়ামাহ:২) নাফসে লাউয়ামাহ আরবী শব্দ, যার অর্থ ‘তিরস্কারকারী আত্মা’ বা ‘অনুশোচনাকারী আত্ম’। এই আত্মাটি নিজের মন্দ কাজের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং নিজেকে তিরস্কার করে। এটি ভালো ও মন্দ কাজের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং মানুষের মধ্যে বিবেকের ভূমিকা পালন করে। এটি নফসে আম্মারার একটি উন্নত রূপ, যা মানুষকে উন্নতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ এটি নিজের ভুল বা গোনাহের জন্য নিজেকে তিরস্কার করে এবং অনুতপ্ত হয়। যার ফলে সঠিক পথ চিনিয়ে দিতে সকায়ক ভুমিকা পালন করে।

আল্লাহ এই তিরস্কারকারী নাফসের কসম করেছেন। কারণ মানুষের মৃত্যুর পর আল্লাহ তা’আলা পুনরায় তাকে অবশ্যই সৃষ্টি করবেন। তা করতে তিনি সক্ষম। এখন প্রশ্ন হলো, তার জন্য নাফসে লাউয়ামাহ-এর কসম করার পেছনে কি যুক্তিকতা থাকতে পারে? আগেই বলা হয়েছে যে, নাফসে লাউয়ামাহ-এর আধুনিক পরিভাষা হচ্ছে বিবেক। মানুষ যখন গোনাহ করে তখন তার বিবেক তাকে ক্রমাগত দংশন করতে থাকে। সেই অনিবার্য যুক্তি হচ্ছে, যিনি প্রথমবার মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, কিয়ামতের পর বা মানুষের মৃত্যুর পর আবার তাকে সৃষ্টি করতে সক্ষম। বিবেকের আরো দাবী হচ্ছে, কিয়ামতের আগমন নিশ্চিত ও অনিবার্য। গোটা বিশ্ব-জাহানের ব্যবস্থাপনাই প্রমাণ করছে যে, এ ব্যবস্থাপনা অনাদী ও অন্তহীন নয়। এর বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতিই বলে দিচ্ছে এটা চিরদিন ছিল না এবং চিরদিন থাকতেও পারে না। মানুষের বিবেক এ ভিত্তিহীন ধ্যান-ধারণার সপক্ষে ইতিপূর্বেও কোন মজবুত যুক্তি প্রমাণ খুঁজে পায়নি যে, প্রতি মহুর্তে পরিবর্তনশীল এ পৃথিবী কখনো অনাদি ও অবিনশ্বর হতে পারে।

নাফসে লাউয়ামাহ বা বিবেকের কসম খাওয়ার আরেক বিষয় হলো, মানুষকে পুনরায় জীবিত করা হবে। মানুষের কৃতকর্মেও ভাল বা মন্দেও ফলাফল দেয়া বিবেকের দাবী। এজন্য নাফসে লাউয়ামাহ-এর কসম করা হয়েছে। পুথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যার বিবেক বলতে কিছু নেই। এ বিবেকের মধ্যে অনিবার্যরূপে ভাল এবং মন্দের একটি অনুভূতি বিদ্যমান। মানুষ ভাল এবং মন্দ যাচায়ের যে মানদণ্ডই স্থির করে থাকুক না কেন এবং তা ভুল হোক বা নির্ভুল হোক, চরম অধ:পতিত ও বিভান্ত মানুষের বিবেকও মন্দ কাজ করলে কিংবা ভাল কাজ না করলে তাকে তিরস্কার করে। এটিই প্রমাণ করে যে, মানুষ নিছক একটি জীব নয়, বরং একটি নৈতিক সত্ত¦াও বটে। প্রকৃতিগতভাবেই তার মধ্যে ভাল এবং মন্দের উপলব্ধি বিদ্যমান। সে নিজেই ভাল এবং মন্দ কাজের জন্য নিজেকে দায়ী মনে করে।

এখন কথা হলো, মানুষের নিজ সত্তার মধ্যেই যদি এ ধরনের একটি “নাফসে লাউয়ামাহ” বা তিরস্কারকারী বিবেকের উপস্থিতি একটি অনস্বীকার্য সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এ সত্যটিও অনস্বীকার্য যে, এ “নাফসে লাউয়ামা”ই মৃত্যুও পরের জীবনের এমন একটি প্রমাণ যা মানুষের আপন সত্তার মধ্যে বিদ্যমান। কেননা যেসব ভাল এবং মন্দ কাজের জন্য মানুষ দায়ী সেসব কাজের পুরস্কার বা শাস্তি তার অবশ্যই পাওয়া উচিত। এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক দাবী। কিন্তু মৃত্যুর পরের জীবন ছাড়া আর কোনভাবেই তার এ দাবী পূরণ হতে পারে না। মৃত্যুর পরে মানুষের সত্তা যদি বিলনি ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তাহলে তার অনেক ভাল কাজের পুরস্কার থেকে সে নিশ্চিতরূপে বঞ্চিত থেকে যাবে। আবার এমন অনেক মন্দ কাজ আছে যার ন্যায্য শাস্তি থেকে সে অবশ্যই নিস্কৃতি পেয়ে যাবে। বিবেক-বুদ্ধি বা নাফসে লাউয়ামাহ সম্পন্ন কোন মানুষই এ সত্য অস্বীকার করতে পারে না।

তিন, “নাফসে মুতমাইন্না”: যে নফসটি সঠিক পথে চললে এবং ভুল ও অন্যায়ের পথ পরিত্যাগ করলে তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে। “(অন্য দিকে বলা হবে) হে প্রশান্ত আত্মা! চলো তোমার রবের দিকে, এমন অবস্থায় যে তুমি সন্তুষ্ট চিত্তে।”(সুরা ফযর:২৭-২৮) নাফসে মুতমাইন্ন মানে প্রশান্ত আত্ম। প্রশান্ত আত্মা এমন মানুষকে বুঝানো হয়েছে যে, কোন প্রকার সন্দেহ সংশয় ছাড়াই পুর্ণ নিশ্চিন্ততা সহকারে ঠাণ্ডা মাথায় এক ও লা-শরীক আল্লাহকে নিজের রব এবং নবীগণ যে সত্য এনেছিলেন তাকে নিজের দীন ও জীবন বিধান হিসাবে গণ্য করেছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছ থেকে যে বিশ্বাস ও বিধানই পাওয়া গেছে তাকে সে পুরোপুরি সত্য বলে মেনে নিয়েছে। আল্লাহর দীন যে জিনিসটি নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছে তাকে সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নয় বরং এই বিশ্বাস সহকারে বর্জন করেছে যে, সত্যিই তা খারাপ।

সত্য প্রীতির পথে যে কোন ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে সে নির্দ্ধিধায় তা করেছে। এই পথে যেসব সংকট, সমস্যা, কষ্ট ও বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে হাসি মুখে সেগুলো সহ্য করেছে। অন্যায় পথে চলে লোকদের দুনিয়ায় নানান ধরনের স্বার্থ, ঐশ্বর্য ও সুখ-সম্ভার লাভ করর যেসব দুশ্য সে দেখছে তা থেকে বঞ্চিত থাকার জন্য তার নিজের মধ্যে কোন ক্ষোভ বা আক্ষেপ জাগেনি। বরং সত্য দীন অনুসরণ করার ফলে সে যে এই সমস্ত আবর্জনা থেকে মুক্ত থেকেছে, এ জন্য সে নিজের মধ্যে পূর্ণ নিশ্চিন্ততা অনুভব করেছে। কুরআনের অন্যত্র এই অবস্থাটিকে “শরহে সদর” বা “উন্মুক্ত হৃদয়” অর্থে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ যাকে সত্যপথ দেখাবার সংকল্প করেন তার বক্ষদেশ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।”( সুরা আন’আম:১২৫) মানে ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে হৃদয়ে পূর্ণ নিসংশয়তা ও নিশ্চিন্ততা সৃষ্টি করে দেন এবং যাবতীয় সন্দেহ সংশয় ও দোদুল্যমানতা দূর করে দেয়া।

নাফসে মুতমাইন্নরাই সফলকাম। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“সে সফলকাম হয়েছে, যে পবিত্রতা অবলম্বন করেছে এবং নিজের রবের নাম স্মরণ করেছে তারপর সালাত পড়েছে।”(সুরা আ‘লা:১৪-১৫) মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আকুল আবেদন, আমরা যেন নাফসে মুতমাইন্না নিয়ে তাঁর দরবারে হাজির হতে পারি। হে রব তুমি কবুল করো।

Posted ৩:৩৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.